kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


‘কোটি মানুষের জীবন প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল’

অস্কার পুরস্কারের ২৪টি বিভাগের একটি ‘ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট’। এক্স-মেশিনা ছবির জন্য এবার বিভাগটিতে পুরস্কার জিতেছে অটোডেস্ক। ক্যামেরার পেছনের এই কারিগরদের দলে ছিলেন বাংলাদেশি আশরাফুল আলমও। কালের কণ্ঠ’র জন্য লিখেছেন তিনি

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘কোটি মানুষের জীবন প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল’

অস্কার হাতে ভিজু্যুয়াল আর্টিস্ট মার্ক উইলিয়াম

অ্যাভাটার তৈরি করতে গিয়ে পরিচালক জেমস ক্যামেরন ‘ভার্চুয়াল মুভিমেকিং’ নামে নতুন এক ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে এসে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রটি আরো বছর পনেরো আগেই করতে চেয়েছিলেন ক্যামেরন সাহেব। কিন্তু প্রযুক্তি তখনো প্রস্তুত ছিল না বলে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়।

এই সিনেমার অনবদ্য প্রযুক্তির পেছনে ছিল অটোডেস্কের কয়েকটি সফটওয়্যার। বাস্তব মানুষের শরীরে কল্পিত চরিত্রগুলো পর্দায় ফুটে উঠেছে অটোডেস্কের মোশনবিল্ডার সফটওয়্যারের কল্যাণে। আর চরিত্র ও তার পারিপার্শ্বিক আবহ তৈরি করেছে মায়া সফটওয়্যার। ডিজিটাল স্কাল্পিংয়ের জন্য ছিল অটোডেস্কের মাডবক্স।

বিশ্বখ্যাত মুভি সিরিজ হ্যারি পটারে ফ্লুয়িড সিমুলেশন আর কৃত্রিম জনারণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে মায়া ও ইনফার্নো সফটওয়্যার।

ডিজাইন সফটওয়্যার দিয়ে হলিউডসহ সারা পৃথিবীতেই একচ্ছত্র আধিপত্য করছে অটোডেস্ক। অস্কারের ইতিহাসের সঙ্গে গত প্রায় ২০ বছর জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটির নাম। গত ২০ বছরে হলিউডের প্রায় সব সেরা মুভির ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের নেপথ্যের কারিগর ছিল প্রতিষ্ঠানটির সফটয়্যার।

এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি হলিউডের ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় অস্কারের আসর। ২৪টি ক্যাটাগরিতে ঘোষিত এই পুরস্কারের অন্যতম ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট। আরো চার হাই প্রোফাইল প্রতিদ্বন্দ্বী স্টার ওয়ার্স, দ্য মার্সিয়ান, দ্য রেভেন্যান্ট ও ম্যাড ম্যাক্সকে হটিয়ে এই ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে নেয় এক্স-মেশিনা। এক্স-মেশিনাসহ ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ক্যাটাগরির মনোনীত সবগুলো চলচ্চিত্রেই অনবদ্য কারুকাজের নেপথ্যে ছিল অটোডেস্কের বিভিন্ন সফটওয়্যার।

এত দিন প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক চলচ্চিত্র অস্কার জিতে নিলেও অটোডেস্ক এ বছর অস্কারের আসরে পেয়েছে সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। শটগান নামে ক্লাউডভিত্তিক একটি সফটওয়্যার কয়েক বছর ধরেই হলিউডসহ বিশ্বের নানা দেশের চলচ্চিত্র তৈরিতে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রোডাকশন ট্র্যাকিং, রিভিউ, অ্যাসেট ব্যবস্থাপনাসহ নানা সুবিধার কারণে সফটওয়্যারটি চলচ্চিত্র তৈরির জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া অনেকাংশে সহজ করে দিয়েছে। তারই স্বীকৃতি মিলল এবারের অস্কারে। প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মের সদস্য হিসেবে এই সম্মাননা আমিসহ আমার সব সহকর্মীর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

শুধু ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের জন্যই নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি পাইওনিয়ার। গত কয়েক দশকে পৃথিবীতে যত দালান তৈরি হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে অটোডেস্কের সফটওয়্যার অটোক্যাডের ছোঁয়া।

থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের বৈপ্লবিক প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সারা পৃথিবী। সাধারণ খেলনা থেকে শুরু করে জটিল কারখানার যন্ত্রপাতি, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রাস্তায় চালানোর গাড়ি—সব কিছুই অতিসহজে তৈরি করা সম্ভব এই প্রযুক্তি দিয়ে। সবচেয়ে চমকপ্রদ হচ্ছে মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করার মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তৈরি করা সম্ভব হবে অচিরেই। মানুষের সুস্থতা ও গড় আয়ু বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এই প্রযুক্তি। থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের বৈপ্লবিক প্রযুক্তির অন্যতম অংশীদার অটোডেস্ক।

আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল, কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা। সুযোগটা পাওয়া গিয়েছে এখানে কাজ করতে এসে। বড় আকারের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। স্টার্টআপ সাইজের প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সযোগ থাকে, সেটা বড় পরিসরে প্রয়োগ করার সুযোগটা পাওয়া গেছে এখানে এসে।

ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট প্রযুক্তিতে নিত্যনতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে প্রতিবছর। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার কম্পিউটিং ও স্টোরেজের ব্যবহার এর সাম্প্রতিক সংযুক্তি। ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে গেলে ভুল করার সুযোগ নেই। কারণ একে ইন্টারনেটে বসে থাকা দানবীয় একটা কম্পিউটারের মতো তুলনা করা যায়, যেখানে কোটি কোটি মানুষের শত কোটি অর্থ ও স্বার্থ জড়িত থাকে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির প্রতিটি অংশে কয়েক ধাপের রক্ষাকবচ রাখা হয়। অটোডেস্কের মতো প্রতিষ্ঠান এসবের প্রয়োজনীয় সব কিছুই জোগান দেয়। মূলত এ জন্যই এখানে যোগ দেওয়া।

এখানে আসার পর প্রথম প্রথম কিছুটা ভয় কাজ করলেও প্রতিষ্ঠানটির অসাধারণ কাজের পরিবেশ আর বন্ধুত্বপূর্ণ সহকর্মীদের সাহায্যে খুব দ্রুতই খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি। কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন অনেক মজাও করি। সবার জন্মদিন পালন করা হয় ঘটা করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাউকে কাউকে আবার দেখা যায় ম্যাসাজ চেয়ারে আরাম নিতে। কেউ কেউ হয়তো খেলছে টেবিল টেনিস। কয়েক দিন পর পর আমরা টিম আউটিংয়ে বেরিয়ে পড়ি। কোনো দিন হয়তো ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে গিয়ে চলে হইচই কিংবা দুর্গম জঙ্গলের অ্যাডভেঞ্চার। সেরা কাজের পরিবেশ বজায় রাখার জন্যও এ বছর পৃথিবীর সেরা ২৫টি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম হয়েছে অটোডেস্ক।

পৃথিবীর অনেক দেশের মেধাবী মানুষদের সঙ্গে কাজ করে মনে হয়েছে, মেধার দিকে পৃথিবীর যেকোনো দেশের মানুষদের থেকে আমরা বাংলাদেশিরা কোনো অংশে পিছিয়ে নেই, শুধু আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারির মনোভাব বজায় রাখতে পারলে পুরো পৃথিবীকে আমরা তাক লাগিয়ে দিতে পারি। পেশাদারি বলতে প্রথম যে বিষয়টা চলে আসে তা হলো, কমিটমেন্ট রক্ষা করা। বিষয়টা আমাদের খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে, সেটা ১০০ ডলারের ফ্রিল্যান্সিং কাজ হোক কিংবা মিলিয়ন ডলারের বিড ডেটা প্রজেক্ট হোক।

অটোডেস্কের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরো বেশি বাংলাদেশির যোগ দেওয়া উচিত। বিশ্বমানের প্রকল্পে কাজ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা যদি দেশে ফিরে এসে তাঁদের দক্ষতা ব্যবহার করেন, তাহলে দেশে এ খাতটিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।


মন্তব্য