kalerkantho

আসলে ছিল গণহত্যা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আসলে ছিল গণহত্যা

আজ থেকে ৭৫-৭৬ বছর আগে একটি দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বাংলায়। পঞ্চাশের মন্বন্তর। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে এসে পঞ্চাশের সেই মন্বন্তরকে কি ভুলে গেছি আমরা? গেছেন অনেকেই। যাঁরা দেখেছেন; অনেকে তো দেখেনইনি।

দেখলেও যে ভুলে যাওয়া তার কারণ আছে। একটা কারণ হলো, দুঃখকে ভুলে থাকার মানবিক আগ্রহ। আরো কারণ এই যে পঞ্চাশের পরে ঘটনা অনেক ঘটেছে। নানা রকম। সেগুলোও কম দুঃখের নয়। দাঙ্গা হয়েছে সাম্প্রদায়িক, বহু মানুষের গৃহ ও হূিপণ্ডের ওপর দিয়ে ভাগ হয়েছে সেদিনের বঙ্গদেশ; তার পরেও দাঙ্গা থামেনি; সবশেষে পূর্ববঙ্গের বাঙালির জন্য ঘটল একাত্তরের গণহত্যা।

পঞ্চাশেরটিও একটি গণহত্যাই। ভিন্ন পটভূমিতে, ভিন্নজনের হাতে। কিন্তু তার নির্মমতা কম ছিল না। সরকারি তদন্ত কমিটি বলেছিল মারা গেছে ১৫ লাখ নর-নারী। এখনকার গবেষণা বলছে ১৫ নয়, ৩৫ থেকে ৪০ লাখ হবে মৃতের সংখ্যা। একাত্তরের লাশেরা এখন পঞ্চাশের লাশদের ওপর শায়িত। তা একাত্তরকেই তো আমরা ভুলতে বসেছি, ৫০ তো অনেক দূরে। একাত্তরের সঙ্গে আমাদের গৌরব জড়িত, পঞ্চাশে তো সবটাই পরাজয়। পঞ্চাশকে মনে রাখা সত্যি কঠিন।

তবু পরাজয়টাও স্মরণীয় বটে। জানা দরকার কেন ঘটেছিল ওই ঘটনা, এবং কারা ঘটিয়েছিল, যাতে চিনে নিতে পারি শত্রুকে, যাতে স্মরণ করতে পারি বাঙালি জীবনের মূল্য কত অল্প; সেদিন ছিল, আজও তেমনি রয়েছে।

২.

কী ঘটেছিল আসলে—সে প্রশ্নটাই প্রথম।

দুর্ভিক্ষ কেন ঘটে? খুব সোজা এটা বলা, সে দুর্ভিক্ষের কারণ হলো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা। ফসলের ফলন ভালো হয়নি, প্রকৃতি বিরূপ ছিল, আকাল পড়েছিল, তাই দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। এটা বলা হতে পারে; কিন্তু ১৯৪৩-এর (বাংলা ৫০), দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে এটা মোটেই সত্য নয়। হ্যাঁ, ১৯৪২-এর অক্টোবর মাসে প্রচণ্ড ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল বাংলার পশ্চিমাংশে। তাতে মেদিনীপুর অঞ্চলে খুব ক্ষতি হয়েছিল ফসলের। তবে ১৯৪২-এ সারা বাংলায়ই ফসলের ফলন হয়েছিল খুব ভালো। ১৯৪৩-এর শুরুতে ধান আগের বছরের তুলনায় কম উঠেছে, কিন্তু এত কম নয় যে দুর্ভিক্ষ হবে। বছরে বছরে বাংলার জনসংখ্যা যে তুলনায় বাড়ছিল খাদ্যের উৎপাদন সে তুলনায় যে বাড়েনি তাও সত্য বটে; কিন্তু তার জন্যও ১৯৪৩-এ হঠাৎ এত বড় একটা দুর্ভিক্ষ হওয়ার কথা নয়। এখন তো বরঞ্চ জানা যাচ্ছে যে দুর্ভিক্ষের সময়ে বাংলায় খাদ্য ঠিকই ছিল। খাদ্যের অভাবে লোকের মরার কথা নয়; যা ঘটেছিল তা হলো খাদ্য ক্ষুধার্তের কাছে পৌঁছেনি, ত্রুটি ছিল বিতরণে।

এ জন্য এখন বলা হয় যে ওই দুর্ভিক্ষটা প্রকৃতির কারণে ঘটেনি, ঘটেছে মানুষের কারণে; বলা হয় যে মানুষই দায়ী এর জন্য। কিন্তু এই কথাটা বিভ্রান্তিকর আসলে। মানুষ তো অবশ্যই দায়ী, কিন্তু কোন মানুষ? নিশ্চয়ই তারা নয়, যারা প্রাণ হারিয়েছে লাখে লাখে। দায়ী বিশেষ ধরনের মানুষ, যাদের কথা নির্দিষ্ট করে বলা দরকার।

মজুদদার-মুনাফাখোররা ছিল। তারা বিপুল পরিমাণ টাকা করেছে খাদ্যশস্য লুকিয়ে ফেলে এবং তা অতি উচ্চমূল্যে কালোবাজারে বিক্রি করে। তারা সুযোগ পেয়েছিল চমৎকার। ছিল দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মচারীরা। বাংলা প্রদেশে সেই সময়ে প্রথমে হক সাহেবের মন্ত্রিসভা কাজ করছিল, সেটির পদত্যাগের পর নাজিমুদ্দীনের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়; ব্যর্থতা ছিল তাদেরও।

কিন্তু এই মানুষরা কেউই কেন্দ্রের নয়। সবাই পরিধির। কেন্দ্রে এবং কর্তৃত্বে তখন অন্যরা। আসল শাসক ব্রিটিশই। দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী তারাই। ওই মন্বন্তরটি প্রকৃতির দান নয়, যুদ্ধের দান; সে যুদ্ধ বাঙালির নয়, ব্রিটিশের।

ওই যুদ্ধে ভারতবর্ষ জড়িয়ে পড়েছিল, স্বেচ্ছায় জড়ায়নি। যুদ্ধ ভারতবর্ষে হয়নি। বাংলার ভূমিতে কামান-বন্দুক পদাতিক বাহিনীর সংঘর্ষ কিংবা বিমানের মুখোমুখি আক্রমণ—এসব কিছুই ঘটেনি। বাংলা অধিকৃত হয়নি শত্রুদের দ্বারা। কিন্তু মারা গেল বাঙালি। হিটলারের হাতে ইহুদিরা মারা গেছে এই যুদ্ধের সময়ে; তাদের জন্য সারা পৃথিবী শোক করেছে, এখনো করে। বলা হয় সেটি গণহত্যা। কিন্তু ৩৫ থেকে ৪০ লাখ বাঙালি যে সেদিন মারা গেল তাদের জন্য কেউ শোক করল না; বাঙালিরাও নয়, তারা ব্যস্ত ছিল নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা নিয়ে; বাইরের লোক শোক করা দূরের ব্যাপার. খোঁজও করেনি কেউ। শাসক ইংরেজ বলেছে সব কিছু ঠিকমতোই আছে। ভাবনার কোনো কারণ নেই। তখনো এ কথা বলেছে যখন দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে পথে-ঘাটে।

তথ্য গোপনের এই কাজটা দুর্ভিক্ষের আগে থেকেই শুরু করেছে। ওই যে সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস হয়ে গেল  বেয়াল্লিশের শেষে, তার খবর বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। অবিকল ইয়াহিয়া খানের আচরণ, যে ইয়াহিয়া সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের খবর চেপে যাবেন ভেবেছিলেন। তারপর দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি যখন বাংলার সর্বত্র শোনা যাচ্ছে তখনো খবরের ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ বসিয়ে রেখেছিলেন ভারতবর্ষীয় ব্রিটিশ রাষ্ট্রের কর্ণধাররা। ‘দুর্ভিক্ষ’, ‘অনাহার’, ‘মৃতদেহ’—এসব শব্দ সাংবাদিকরা পাঠাতেন বাইরে। তাঁরা কেউ কেউ ছিলেন এখানে। দেখেছেন ঘটনা। কিন্তু তাঁদের লেখার ওই সব শব্দ কেটে বাদ দেওয়া হলো। যেন একাত্তরের ঘটনারই পূর্বাভাস। মানুষ মরছে, কিন্তু বিশ্ব জানছে না কিছুই।

১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে, মানুষের লাশে যখন বাংলার ভূমি আকীর্ণ তখন প্রথম খবর বের হয় ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ। খুবই সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিবেদন পত্রিকার ৫১ পৃষ্ঠায়। তিন দিন পরে খবর কিছুটা এগিয়েছে দেখা গেল, এবার সাত পৃষ্ঠায়। ছয় দিন পরে আসতে পারল সে চার পৃষ্ঠায়। অগ্রগতি বটে। আমেরিকা তখন পৃথিবীর নেতা, মিত্রপক্ষের প্রধান ভরসা, তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট অত্যন্ত মানবদরদি; কিন্তু সেই আমেরিকা নানা মাধ্যমে খবর পেয়েও সাড়া দেয়নি। সেই সময়ে ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠিত হয়েছিল। যার দায়িত্ব ছিল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য ও পুনর্বাসন করা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমেরিকাই ছিল সংস্থার প্রধান শক্তি ও নিয়ামক। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে কলকাতা করপোরেশনের বাঙালি কর্মকর্তারা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। আমেরিকায় প্রবাসী ভারতবর্ষীয়রা ধরনা দিয়েছেন, কিন্তু কাজ হয়নি। সাড়া মেলেনি।

যুক্তি ছিল। যুক্তি এই যে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওই সংস্থা তৎপরতা চালাবে শুধু তাদের মধ্যেই, যারা শত্রুবাহিনীর দ্বারা অধিকৃত দেশের বাসিন্দা, অন্যদের মধ্যে নয়। ভারতবর্ষ তো শত্রুদের দখলে পড়েনি, তার অধিবাসীদের জন্য তাই সাহায্য দেওয়া যাবে না। ওই রকম চুক্তিতেই সংস্থা গঠিত হয়েছে; এর অন্যথা করার উপায় নেই। যখন দেখানো হলো সংস্থার গঠনতন্ত্রের অনেক ধারায় এ কথা রয়েছে যে যুদ্ধের দ্বারা যারাই ক্ষতিগ্রস্ত তাদেরই ত্রাণের চেষ্টা সংস্থার কর্তব্য, তখনো কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।

কারণ সহজ। ভারতবর্ষ একটি অধীন দেশ, সেই দেশের এক প্রান্তে বাংলা, তার অধিবাসীরা মরল কী বাঁচল তাতে ইউরোপ-আমেরিকার কী যায় আসে। যায় আসে ইউরোপের মানুষদের কী হচ্ছে তাতে। ইউরোপে ঘোড়াদের কী হলো, শূকরদের কী দশা, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের জন্য লোক পাওয়া গেছে, লোক পাওয়া যায়নি বাংলার লাখ লাখ মৃত ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের জন্য উদ্বেগ প্রকাশের। পরাভূত জার্মানি কি জাপান, কাউকেই অতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি, যতটা পোহাতে হয়েছে বাংলাকে। বাঙালি, তুমি কি মানুষ, নাকি অন্য কিছু?

ভারতবর্ষ তখন ব্রিটেনের অধীন। ‘মূর্খ’ ভারতবাসী তখন ওই যুদ্ধের মধ্যেই স্বাধীনতার জন্য মেজাজ করছে। ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন করছে তারা বেয়াল্লিশে। শাসক ইংরেজ ভয়ংকর চটা ছিল। আমেরিকানরাও চটে গিয়েছিল ভারতীয়দের এই অবিমৃশ্যকারিতা দেখে। রুজভেল্ট চার্চিলের মিত্র, গান্ধীর নন। তিনি চার্চিলের স্বার্থ দেখবেন, গান্ধীর স্বার্থ দেখবেন না। চার্চিল বলেছেন, সব ঠিক আছে; রুজভেল্ট ভান করেছেন, ঠিক তাই; যদিও ভিন্নতর তথ্য তাঁর কাছে ছিল, যদিও তাঁর স্ত্রী কিছুটা শঙ্কিত হচ্ছিলেন। তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সর্বমোট আমেরিকান নিহত হয়েছে কয়জন? তাদের নিজস্ব হিসাবই বলছে সর্বমোট তিন লাখ ৯৬ হাজার ৬৩৭ জন। চার লাখও নয়, তারও কম। অথচ বাঙালি মরল চার নয়, ৪০ লাখ। যুদ্ধে জড়িত নয়, তবু মারা গেল তারা, যুদ্ধের কারণে। এই ৪০ লাখকে শহীদ বলবে না কেউ, ওই চার লাখকে শহীদ বলবে। চার লাখের জন্য বহুবিধ স্মারক আছে, ৪০ লাখকে কে স্মরণ করে?

রুজভেল্ট বলেছিলেন, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কাউকে মারা যেতে দেবেন না। না, দেননি। ইউরোপীয়রা মারা যায়নি। তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা ছিল। বাঙালিরা মরেছে, তাদের জন্য ত্রাণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। মরল তারা না খেয়ে, মরল রোগে, কেউ কেউ মরল পরে খাবার পেয়ে, সহ্য করতে না পেরে।

বাংলায়ও সেদিন বিদেশিরা ছিল। আমেরিকান ও ইংরেজ সৈন্য মিলিয়ে এক লাখ ছিল তারা। না খেয়ে তাদের একজনও মারা যায়নি। কোনো ইউরোপীয়ই মারা যায়নি সেদিন ওই ভয়াবহ মন্বন্তরে। কলকাতায় প্রাণহানি ঘটেছে অজস্র, কিন্তু কলকাতার লোক মরেনি। মরেছে গ্রামের মানুষ, যারা কলকাতায় এসেছিল খাবারের আশায়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান নগর তখন কলকাতা। একে রক্ষা করার জন্য সরকারি উদ্যোগের কোনো অভাব ছিল না। সেখানে নিয়ন্ত্রিত মূল্যে চালের দোকান ছিল। মিল-ফ্যাক্টরির মালিকরা নিজ নিজ শ্রমিকের জন্য কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল। সেই দুর্ভিক্ষে এমনকি জেলের কয়েদিদেরও মরতে হয়নি, মরতে হয়েছে বড় জেলখানার দুর্বল বন্দিদের, গরিব মানুষদের।

কারা মারা গেল প্রধানত? মারা গেল তারা, জীবিকার জন্য যারা নিজের শ্রম বিক্রি করত; মিলে-কারখানায় নয়, পথে-ঘাটে। জমির বড় মালিকরা বাঁচল, তাদের ঘরে প্রচুর ধান ছিল; ছোট মালিকরাও বাঁচল, যা ধান ছিল সেটা ধরে রেখে। মারা পড়ল জেলে, ক্ষেতমজুর, ধানবানার লোক, মাঝি, কুমার, কামার, ছুতার, নাপিত, মুচি, পরিবহন শ্রমিক, ফেরিওয়ালা—এরা। ভিক্ষা বাঙালির জীবনে একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। আগে মানুষ ভিক্ষা দিত। অনেকে ভিক্ষা নিয়ে বাঁচত। ১৯৪৩-এ ভিক্ষা দেওয়ার লোক ছিল না। দাতব্য উঠে গিয়েছিল। ভিক্ষার অভাবই তো দুর্ভিক্ষ—বাঙালির অভিধানে। সে দুর্ভিক্ষ কী বস্তু বোঝা গেছে ৫০ সালে।

মৃতের তালিকায় জেলে, মাঝি, কুমার এদের সংখ্যা ভারী হয়ে উঠেছিল। তারও কারণ ওই রাষ্ট্র। জাপানিরা এগিয়ে আসছে, সিঙ্গাপুর দখল করেছে, পতন ঘটেছে থাইল্যান্ডের, বার্মা তাদের পদানত, চলে এসেছে তারা আসামের কাছাকাছি, বোমা ফেলেছে চট্টগ্রামে এবং খোদ কলকাতায়। ইংরেজের রাষ্ট্র ভয় পেল, জাপানিরা বুঝি সব দখল করে নেয়। তারা তো ঢুকবে নৌকায় করে। তাই ‘নৌকা না দেওয়ার’ নীতি নিল; নৌকা অকেজো করে দেওয়া শুরু করল তারা। হিসাব বলছে, ৬৬ হাজার নৌকা অকেজো করে দেওয়া হয়েছিল।

এর ফলে মাঝিরা মারা পড়ল। জেলেরা হারাল তাদের অবলম্বন। কুমার উপায় পেল না তার হাঁড়ি-পাতিল বহন করার। জেলেদের আরো এক বিপদ ঘটেছিল। তাদের হাতে টাকা ছিল না যে খাজনা দিয়ে জলমহাল ও দিঘিগুলোয় মাছ ধরার অধিকার পাবে। পয়সা ছিল না জাল ভাড়া করার। মৃত্যু তাদের দিকে হাত বাড়াল খুব সহজে।

জাপানিরা এসে যাতে খাবার না পায় সেটা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ওই দিকে অল্প সময়ের জন্য হলেও চাল বেচাকেনার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

সবটাই ব্রিটিশের স্বার্থে, কোনোটাই বাঙালির স্বার্থে নয়।

৩.

চাল ছিল; লোকের ক্রয়ক্ষমতা ছিল না। পঞ্চাশের মন্বন্তর সম্পর্কে এই সত্য এখন প্রতিষ্ঠিত।

চালের দাম আগুনের শিখার মতো লকলক করে বেড়ে উঠেছে। কলকাতার আশপাশে বেয়াল্লিশ সালে চালের মণ ছিল সাত টাকা ৫০ পয়সা। মধ্য তেতাল্লিশে সেটা উঠেছে ৩০ টাকায়। কিছুদিন পরে পৌঁছে গেছে ৫০ টাকায়। চট্টগ্রামে আরো বেশি, আগস্ট মাসে সেখানে চাল বিক্রি হচ্ছিল ৮০ টাকা মণ দরে।

এই দামে চাল কেনার ক্ষমতা অধিকাংশ মানুষের ছিল না। তাই তারা না খেয়ে মারা গেল। হিসাবটা এমনই সোজা। তবে অনিবার্য প্রশ্ন এটা যে কেন এই ঘটনা ঘটল, কেন এই উচ্চমূল্য, ওই ক্রয়ক্ষমতার অভাব? জবাবও সরল। কারণ ব্রিটিশ ও তার যুদ্ধ।

চাল ছিল, কিন্তু লোকের ধারণা হলো চাল তেমন নেই, এবং অচিরেই একেবারে থাকবে না। এমনকি ভালো ফসল হলেও কিছু চাল আমদানি করতে হতো। ওই বছর চাল আমদানির উপায় ছিল না। চাল আসত বার্মা ও থাইল্যান্ড থেকে; জাপানিদের তৎপরতায় সেই উৎস সে বছর বন্ধ। মজুদদাররা মজুদ করল। দাম বাড়তে থাকল। সরকারের সিভিল সাপ্লাই থেকে বাজারদরের চেয়ে কম দরে চাল সংগ্রহের চেষ্টা হলো। খোলাবাজার থেকে চাল পালাল কালোবাজারে।

ওদিকে মানুষের আয় গেছে কমে। পাটের বাণিজ্য বন্ধ। কলকারখানায় উৎপাদন কম। বহু মানুষ তখন বেকার। তাদের উপার্জন বন্ধ। ওদিকে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নানা রকম ঠিকাদারির কাজ করে অল্প কিছু লোক টাকা উপার্জন করল প্রচুর। উৎপাদন কম, টাকার সরবরাহ বেশি; ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটল। এসব রাষ্ট্রের কীর্তি। ব্রিটিশ শাসনের শেষ অবদান।

৪.

কিন্তু বাঙালি কী করল? কিভাবে গ্রহণ করল সে এই মর্মন্তুদ ঘটনাকে? এই গণহত্যাকে?

প্রথমে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল। একেবারে হতভম্ব। এমনটা দেখেনি কখনো, কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেছে বাস্তবতা; বাঙালি বুঝে উঠতে পারেনি সে কী করবে। সোনার বাংলার যে স্বপ্ন সে লালন করত খুব গভীরে, নিজের ভেতরে, কোথায় সেটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল ক্ষুধা, কঙ্কাল, মৃতদেহ ও হাহাকারের ক্রমাগত আঘাতে।

তারপরে যা করেছে তা বাঁচার চেষ্টা। প্রত্যেকে তার নিজের মতো করে। বিদ্রোহ করেনি। লুটপাটের ঘটনা খুব সামান্য ঘটেছে। কলকাতা শহরে সুসজ্জিত খাবার দোকানের দরজার সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে অনাহারী মানুষ, কিন্তু হাত বাড়িয়ে দেয়নি কাচ ভেঙে খাবার নিয়ে নেবে বলে। এ তার সংস্কৃতিতেই নেই। তার সংস্কৃতিতে প্রাধান্য বিদ্রোহের নয়, প্রাধান্য আত্মসমর্পণের।

মানুষের কোনো ঠিকানা ছিল না। সবাই ছুটেছে খাদ্যের অন্বেষণে। পরিবার ভেঙে গেছে বহু ক্ষেত্রে। স্বামী ফেলে রেখে চলে গেছে স্ত্রীকে। স্ত্রী বিক্রি করে দিয়েছে সন্তান। সন্তান ক্রয়ের লোকও কমে এসেছে। দেহ বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে মেয়েদের। গাছের ছায়া, পুকুর পার সব ভরে গেল মানুষের লাশে। দুর্গন্ধ বের হয়েছে। খাবার পানি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল নদী ও পুকুরে মৃতদেহ ভেসে বেড়ানোর কারণে। মানুষ শহরে রওনা দিয়েছে, খাবার পাবে এই আশায়। বহুজন মারা গেছে পথে। কলকাতা শহর শবের শহরে পরিণত হয়েছিল। শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশনে জীবিত ও মৃত ঠেলাঠেলি করছিল আশ্রয়ের জন্য। যারা এগোতে পেরেছে তারা এসে ভিড় করেছে হোটেলের সামনে, অফিসের দরজায়, বাসাবাড়ির সিঁড়িতে। কলেরা, ডায়রিয়া, জ্বর—কোনো রোগেরই অভাব ছিল না।

কলকাতাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এই আগন্তুকদের ‘যন্ত্রণা’য়। অনেকেই অবশ্য কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিল বোমার আতঙ্কে। যারা ছিল তারা ‘বিড়ম্বিত’ হয়েছে অত্যন্ত অধিক। রোটারি ক্লাবের সভাপতি সাহেব কলকাতার হাসপাতালগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তারা যেন মুমূর্ষুদের ঠেলে বের করে না দেয়। রোটারিয়ানরা সংগতভাবেই বিরক্ত ছিলেন হাসপাতালে না মরে মানুষের রাস্তাঘাটে মরার দৃশ্য দেখে। কিন্তু ক্ষুধার কারণে মরণাপন্ন মানুষকে হাসপাতাল নেবে কেন, ক্ষুধার চিকিৎসা তো হাসপাতালের দায়িত্ব নয়।

বিভাজন ছিল। এই যে এত বড় অভিজ্ঞতা তাও বাঙালিকে এক করেনি। বরঞ্চ আরো দূরে সরিয়ে দিয়েছে পরস্পর থেকে। মৃতদেহের সৎকারের সময়ে কে হিন্দু কে মুসলমান সে প্রশ্ন উঠত। শনাক্তকরণ সহজ ছিল না। অনেক দেহই গলে-পচে থাকত। তা ছাড়া মৃত মেয়েদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় চেনা যাবে কী করে তাও কেউ বলতে পারত না। তবু টানাটানি চলত শ্মশানে ও গোরস্থানে।

জীবিতদের নিয়ে টানাটানিটা ছিল আরো মারাত্মক। হিন্দুর কংগ্রেস ও মুসলমানের মুসলিম লীগ—দুজনের মুখ দুই দিকে। মন্বন্তরের পর পায়ের ওপর মানুষ দাঁড়াতে পেরেছি কি পারেনি অমনি শুরু হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ছেচল্লিশে ঘটল কলকাতার সেই অতি ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম খুনাখুনি। সাতচল্লিশে বঙ্গভূমির রক্তাক্ত বিভাজন। মৃতকে সরিয়ে, জীবিতকে মেরে।

মন্বন্তরের ওপর গল্প, উপন্যাস, কবিতা লেখা হয়েছে। মর্মস্পর্শী ছবি আঁকা হয়েছে। গণনাট্য সংঘের শিল্পীরা মানুষের হাহাকারকে রূপ দিতে চেয়েছেন প্রাণবন্ত সংস্কৃতিকর্মে। ত্রাণ তৎপরতায় এগিয়ে এসেছে অনেক মানুষ। কিন্তু এক হতে পারেনি বাঙালি। তার একাংশ আজ ভারতীয়, অপর অংশ বাংলাদেশি। কেউ ভালো নেই।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



মন্তব্য