kalerkantho


মানবিকতা মূল্য পাক দেশে, বিদেশে

গোলাম কবির

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মানবিকতা মূল্য পাক দেশে, বিদেশে

সম্প্রতি লোভনীয় কর্মসংস্থানের মরীচিকায় বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের দেশের কিছু সক্ষম মহিলা বহির্বিশ্বে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে। সেখানে তারা নিয়োগকর্তা গৃহস্বামীদের অনৈতিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিষয়টি পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে আসছে।

মানবসভ্যতার ধারা বলছে, গৃহবাসী মানুষ নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অপরের সাহায্য নিয়েছে। আর গৃহকর্মে সাহায্যের ক্ষেত্রে মহিলারা প্রাধান্য পেয়েছে। আগেকার দিনে গৃহকর্তারা গৃহকর্মী মহিলাদের কতখানি সম্মান রক্ষা করেছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও জীবনসংস্কৃতির কোনো কোনো মাধ্যমে তার আংশিক স্বাক্ষর রয়ে গেছে।

বাদশাহরা বাঁদিদের কিভাবে দেখতেন তা বোধ করি সচেতন পাঠকের অজানা নয়। বাঁদি কখনো কখনো মহিষীর সম্মান পেয়েছে, তবে প্রায় সবার জীবন অকালে শুকিয়ে গেছে। নিকট-অতীতের বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা, ঋষিখ্যাত জমিদারতনয় তলস্তয় সুদর্শনা গৃহকর্মীকে বিছানায় নিয়ে গেছেন। একালের প্রবল প্রতাপ শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পুরুষ ক্লিনটন-মনিকা অধ্যায় কম উপভোগ্য হয়নি। তাঁদের মূল্যবোধে হয়তো বিবেকের তাড়া কম ছিল অথবা যদ্দেশ যদাচার বলে আমরা হালকা হতে চেয়ে ঘটনাগুলোকে সমঝোতা হিসেবে বোঝাতে চেষ্টা করি, সে সমঝোতা কি সবল-দুর্বলের সঙ্গে, নাকি গৃহকর্তার সঙ্গে গৃহকর্মীর? সে প্রশ্ন থেকে যায়। আসলে সুদীর্ঘকাল ধরে যে সামাজিক নৈতিকতা প্রচলিত তার সঙ্গে এবংবিধ ঘটনা সাংঘর্ষিক। কে জানে, নেপথ্যে আরো কত ঘটনা পুঞ্জীভূত হয়ে আছে এবং ঘটমান!

আমাদের দেশে একসময় গৃহকর্মীর অভাব কম ছিল বললেই চলে। থাকা-খাওয়ার নিরাপত্তা পেলে অনেকে যেচে এসে অবস্থাপন্ন মানুষের বাসায় সহায়তা করত। মাঝেমধ্যে অঘটন যে ঘটত না, তা নয়। মিডিয়া সুলভ ছিল না বলে তা ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে আসত না। তবে সাহিত্যের পাতায় সেগুলোর কিছু পরিচয় পরিদৃশ্যমান। কারণ সাহিত্য তো সমাজজীবনেরই প্রতিফলন।

আজকের দিনে মিডিয়া দেশের এবং দেশের বাইরের খবরের চিত্র মুহূর্তের মধ্যে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো মাধ্যমে গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর আসছে। মানুষ অবহিত হচ্ছে। ফলে প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে বেশি।

দাসত্বপ্রথা আজও নির্মূল হয়নি। হবেও না কোনো দিন হয়তো। নানা প্রক্রিয়ায় তা চালু থাকবে। মতবাদের দাসত্ব, দলের দাসত্ব, প্রবলের কাছে দুর্বলের সমর্পণের দাসত্ব। সর্বত্রই যেন দাসখত লিখে দিতে হয়।

একদা ক্রীতদাসীদের বিবাহিত স্ত্রীর মতো ব্যবহার করা হতো। তখন নৈতিকতা বা সামাজিক বিধি-নিষেধ বড় রকমের বাধা হয়ে দেখা দিত না। সেসব আরব্য রজনীর যুগ বাসি হলেও নারীর প্রতি পুরুষের সহজাত লোলুপতার তো অবসান হয়নি। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মানুষ মহিলা গৃহকর্মীকে ক্রীতদাসী বা গনিমতের মাল হিসেবে গণ্য করে। নৈতিকতা তাদের বিরত থাকতে সাহায্য করে না। ধর্মীয় কঠিন আইন কার্যকর থাকলেও তা প্রয়োগ হয় না। হবে কেন? চিরকালই ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’! ‘ত্যাগ নয় ভোগ, ভোগ তারিলাগি, যেই জন বলীয়ান।’

এত সব বাস্তবতার মধ্যেও একটুখানি সুখের মুখ দেখার জন্য আমাদের দেশের তরুণী ও মাঝবয়সী মহিলারা গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছেন। অঘটনের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অনেকে নিঃস্ব হয়ে ফিরছেন। প্রতিকার হয় না। যাওয়ারও বিরতি নেই। এ যেন ‘জেনে শুনে বিষ’ পান করা। এবংবিধ ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধ’ অবশ্যই খর্ব করতে হবে। এ জন্য দেশে কিংবা দেশের বাইরে যেখানেই হোক, মহিলা গৃহকর্মী নিয়োগের আগে আটঘাট বেঁধে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অপকর্মকারীরা যেন যথাযথ আইনের আওতায় আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টি দেশের নিয়োগকর্তাদের জন্যও প্রযোজ্য।

কোনো দেশে যদি তাদের অপকর্মকারীদের শাস্তি দিতে গড়িমসি অথবা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, তবে সেখানে মহিলা গৃহকর্মীদের পাঠানো সমীচীন কি না, তা নতুন করে ভেবে দেখা দরকার।

এবার একটু দেশের দিকে তাকাই। জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ আমাদের দেশের অভাবী মানুষের কন্যাসন্তান দুর্বহ ছিল একদা। সে অবস্থা কমে এলেও এখনো কিছু মানুষ তাদের কন্যাসন্তানকে গৃহকর্মের জন্য রাখতে বাধ্য হয়। দেখা যায়, যাদের পরিচর্যা পাওয়ার বয়স তারাই অবোধ পরিচারিকা। কী অমানবিক নির্মমতা! পত্রপত্রিকায় তাদের প্রতি নানা অত্যাচারের খবর আসে।

আমরা মনে করি, বিদেশে পাঠানো তো বটেই, দেশে নিযুক্ত সব বয়সী মহিলা গৃহকর্মীদের অভাব-অভিযোগ দেখভালের জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সজাগ থাকা, যেন মানবিকতার সামান্য হলেও মূল্য দেওয়া যায়।

 

লেখক : সাবেক শিক্ষক

রাজশাহী কলেজ



মন্তব্য