kalerkantho


সিলেটে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সিলেটে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা

অফুরন্ত সম্ভাবনার ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও নানা অব্যবস্থাপনা ও সঠিক নীতিমালার অভাবে সিলেট পর্যটনশিল্পে সফলতা দেখাতে পারছে না। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে বাধাগুলো সিলেটের জন্য প্রযোজ্য হলেও এ অঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও এর মাধ্যমে সরকারের আয়ের পথ সুগম হওয়া সহজ ও সাবলীল ছিল এবং আছে। বাংলাদেশে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা খুব বেশি নয়। পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য নিত্যনতুন এলাকা তৈরি হচ্ছে, তবে যোগাযোগ সমস্যার কারণে সঠিক বিকাশ লাভে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আবার অচেনা-অজানা অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে হতে পারে অবকাশ যাপনের নিরিবিলি কেন্দ্র। আমাদের দুর্ভাগ্য, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সিলেটের পর্যটনশিল্প যেমন বিকশিত হচ্ছে না তেমনি বিদ্যমান পর্যটনকেন্দ্রগুলো তাদের নান্দনিকতা ও সৌন্দর্য হারাতে বসেছে।

প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ সিলেটে আসে। এর অন্যতম একটি উদ্দেশ্য ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি এই সিলেটে হজরত শাহজালাল ও শাহ পরানের মাজার জিয়ারত করা। সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা। সিলেটের জাফলং, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, লালাখান ও মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এ ছাড়া মৌলভীবাজারের চা বাগান সত্যিই ঘুরে দেখার মতো। সিলেট এমন এক জায়গা, যেখানে বর্ষা ও শীত দুই সময়েই ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক। বর্ষার সময়ে যেমন ঝরনাগুলো দেখতে ভালো লাগে তেমনি শীতের সময়ে লালাখালের নীল পানিতে নৌকা ভ্রমণ আরামদায়ক। প্রাকৃতিক এমন পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি রাত্রিযাপন ও একত্রে সময় কাটানোর জন্য গত কয়েক বছর এখানে গড়ে উঠেছে উন্নতমানের হোটেল। উন্নত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এমন হোটেল যেমন—গ্র্যান্ড সুলতান ও প্যালেস অ্যান্ড স্পা দর্শক ও ভ্রমণপিপাসুদের মনকে নাড়া দেয়। বারবার কাছে টানে। এ ছাড়া এ অঞ্চলে অসংখ্য রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে আপনি ইচ্ছা করলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অবকাশ যাপন করতে পারেন। জাফলংকে সিলেটের এক বড় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নানা অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে এটি একটি পরিত্যক্ত পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে চলছে। ক্রমাগত পাথর উত্তোলন এর সৌন্দর্যহানি ঘটাচ্ছে।

মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড আরেক পর্যটনকেন্দ্র। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর পর্যটক এখানে আসেন মূলত প্রাকৃতিক ঝরনা দেখতে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না থাকায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এখানে পর্যটন করপোরেশনের একটি হোটেল রয়েছে কিন্তু থাকার জন্য কোনো ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। অন্যদিকে লাউয়াছড়া উদ্যান বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য এক বড় কেন্দ্র। আগের তুলনায় এখানে পর্যটকদের আনাগোনা এখন অনেক বেড়েছে। শুধু ভ্রমণের জন্যই নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও তা নিয়ে গবেষণার বড় জায়গা হতে পারে লাউয়াছড়া উদ্যান। কিন্তু পর্যটকদের অবাধ বিচরণ ও যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এখানে আরো দরকার বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ। পর্যটকদের আগ্রহ ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একমাত্র নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা উদ্যানের ভেতরে যেতে স্বস্তিবোধ করে না। মৌলভীবাজার ও সিলেটে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের রয়েছে নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব।

সিলেট বিভাগে পর্যটনশিল্পের বিকাশের নতুন দ্বার উন্মোচনের ক্ষেত্র হতে পারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ, হাকালুকি হাওর, হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। ভোলাগঞ্জ পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান কিন্তু এখানেও নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে পরিবেশকে ধ্বংস করা হচ্ছে। ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলে ভোলাগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত রোপওয়ে ছিল। এখনো এর চিহ্ন রয়েছে। আমরা এটাকে আবার চালু করতে পারি। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ দরকার। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর জীববৈচিত্র্যের জন্য অন্যতম। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে টাঙ্গুয়ার হাওরের নাম রয়েছে। শুকনা মৌসুমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পাখির কলতানে হাওর মুখরিত হয়। প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক এখানে আসে। মূলত শীতের সময় হাওর ও পাখি দেখার জন্য পর্যটকদের আগ্রহ বেশি থাকে। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পর্যটকদের সমস্যা হয়। এখানে নেই পর্যটন করপোরেশনের কোনো হোটেল বা থাকার ব্যবস্থা। পর্যটকদের দিনে গিয়ে দিনেই আসতে হয়। এমনকি শীতের সময় এখানে পিকনিক করার জন্য ভালো জায়গাও নেই। সরকারি প্রচেষ্টায় পরিকল্পিত উপায়ে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করলে ভালো। তবে মনে রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন তা পরিবেশের হুমকির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। পাহাড়, হাওর, সমতল, চা বাগান, আদিবাসী নিয়ে নান্দনিকতায় পূর্ণ সিলেট অঞ্চল নিঃসন্দেহে অবকাশ যাপনের ভালো জায়গা। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পূর্ণ সিলেটের প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ। এমনটিই আশা করছি আমরা সবাই।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com

 



মন্তব্য