kalerkantho


পাটশিল্পে সমস্যা ও সম্ভাবনা

ড. মো. সহিদুজ্জামান

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পাটশিল্পে সমস্যা ও সম্ভাবনা

পাট আমাদের বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। আমাদের দেশের ভূমি ও জলবায়ু পাট চাষের জন্য খুবই উপযোগী হওয়ায় উৎপাদিত পাটের বাজারকে কেন্দ্র করে ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছিল আদমজী পাটকলের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৬টি সরকারি ও ৭৬টি বেসরকারি পাটকল রয়েছে; যদিও সব কটিতে এখন উৎপাদন হয় না। আবার কলগুলো পুরনো হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় মিলগুলোতে লোকসান হয়ে থাকে। বর্তমানে যেখানে বেসরকারি পাটকলগুলো মুনাফা করছে, সেখানে আমাদের সরকারি পাটকলগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তার কারণ হিসেবে উচ্চমূল্যে পাট ক্রয়, অধিক মজুরি ব্যয়, অতিরিক্ত রূপান্তরিত ব্যয় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পাট ক্রয় করতে না পারাকে অনেকে দায়ী মনে করেন।

একসময় প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে পাট খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। রপ্তানি আয়ের একটি ভালো অংশ এখনো পাট খাত থেকে এসে থাকে। পাট থেকে সুতাসহ অন্যান্য পাটসামগ্রী উৎপাদন হয়ে থাকে। গড়ে বর্তমানে পৃথিবীতে ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করে ৩২ লাখ মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হয়ে থাকে। যার ২৫ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ ৮.৩৩ লাখ মেট্রিক টন বা পৃথিবীর মোট উৎপাদনের ২৬.০২ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদন হয়ে থাকে।

পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের মান ও মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাটের প্রধানত দুটি প্রজাতি, সাদা পাট (Corchorus capsularis) ও তোষা পাট (Corchorus olitorius), যা আঁশ হিসেবে বাংলাদেশে চাষ হয়ে থাকে। পাটগাছের দুটি প্রজাতিই এবং মেস্তা ও শণপাট বিভিন্ন রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। পাট ও বস্ত্র, পরিবেশ ও বন, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে একটি তদারক সংস্থা হওয়া প্রয়োজন।

পাটশিল্পে এক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরেক মন্ত্রণালয় জড়িত। ফলে কাজ করার সময় মন্ত্রণালয়কে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত হয় কিন্তু বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের জন্য কাজ এগোয় না। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পাট খাতের একটি বড় অংশ উন্নত প্রযুক্তির আওতায় ভ্যালু অ্যাডেড প্রডাক্ট উৎপাদন ও রপ্তানি করার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারলে এ খাতের চেহারা পাল্টে যাবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের গবেষণা করা যেতে পারে। এ ছাড়া আমরা কৃষকদের বিভিন্নভাবে প্রণোদনা দেওয়া। পর্যাপ্ত গুণগত মানসম্পন্ন বীজ, কীটনাশক, সার, পাট পরিষ্কারের উপকরণ, বীজ শুকানোর শিট ইত্যাদি দিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

নতুন নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার করতে হবে। শুধু কাঁচামাল রপ্তানি না করে পাটের তৈরি পণ্য উৎপাদন করতে হবে; তাহলে দেশ আর্থিকভাবে অধিক লাভবান হবে এবং রপ্তানি আয়ের বড় একটি অংশ অর্জন করা সম্ভব। পাটজাত দ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ ও উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণা হতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও সিড প্যাথলজি কেন্দ্রের পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল বলেন, ভালো মানের পাটের উৎপাদনের জন্য গুণগত মানের দেশীয় বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে হবে। আমাদের ভালো বীজের অভাব। ভারত থেকে নিম্নমানের বীজ আমদানি বন্ধ করা উচিত। বীজ উৎপাদন পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পাটের বীজের জন্য কৃষকদের ওপর নির্ভরশীল, তাই মানসম্মত বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা বীজ শোধন না করে বীজ বপণ করেন, ফলে ঠিকমতো চারা গজায় না এবং আশানুরূপ উৎপাদন হয় না। তাই কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ভালো মানের বীজ উৎপাদন করা সম্ভব।

পাটের রোগবালাই, যেমন শুকনা ক্ষতরোগ, কাণ্ডপচা রোগ, পাটের কালোপট্টি রোগ, পাটের মোজাইক রোগ ইত্যাদি রোগে পাটের আঁশ আক্রান্ত হয়, ফলে পাটের গুণগত মান কমে যায়। কাণ্ডপচা রোগ হলে বেশির ভাগ পাটগাছ পরিপক্ব হওয়ার আগেই মারা যায়। এ ছাড়া ঢলে পড়া ও চারায় মড়ক রোগের আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়া পাটের বিছা পোকা, ঘোড়া পোকা, চেলে পোকা গাছে ক্ষত সৃষ্টি করে। পাটে মাকড়ের আক্রমণও একটি বড় সমস্যা। দেশে প্রতিবছর কমবেশি ২০ শতাংশ পাট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। খুব বেশি আক্রান্ত হলে ৫০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। গুণগত মানসম্পন্ন উৎপাদন করতে হলে পাটের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য পাট দিয়েই তৈরি করা সম্ভব। পাট থেকে শুধু ছালা, বস্তা, চট এগুলোই উৎপন্ন হয় না। বর্তমানে দেশে নিজস্ব বিনিয়োগকারীরা ১৫০ ধরনের পাটপণ্য উৎপাদন করছে। যদি ফিনিশিং দিয়ে পণ্য তৈরি করতে পারি, তাহলে আমাদের পণ্য বিদেশের বাজারে বিক্রি হবে। পাটের তৈরি জিনিসপত্র পরিবেশবান্ধব। তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও অন্য দ্রব্যাদি ব্যবহার না করে পাটের তৈরি জিনিস ব্যবহার করতে পারি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৫টি দেশের বাইরেও কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ ১২০টি দেশে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে শপিংব্যাগের চাহিদা রয়েছে। তাই পাটজাত শপিং ব্যাগ রপ্তানির ক্ষেত্রে এ দেশের ভালো সুযোগ রয়েছে। পত্রপত্রিকার তথ্য মতে, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলে সাত শর বেশি প্রতিষ্ঠান পাটজাত পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পাটের গতানুগতিক ব্যবহারের ধারণা থেকে বেরিয়ে পাটজাত পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে কাজ করছে ১০টি মাঝারি ও ৩৮ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাটশিল্পের সঙ্গে প্রায় চার কোটি মানুষ জড়িত। অল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, ভালো বীজ সরবরাহ ও কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

পাট ও পাটজাত দ্রব্যের উৎপাদন ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষমতায়িত করতে হবে। পাট খাতের ভবিষ্যত নির্ভর করছে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনার ওপর। এ ক্ষেত্রে সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

লেখক : অধ্যাপক, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

szaman@bau.edu.bd


মন্তব্য