kalerkantho


মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত

জাফর স্যার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় ভালো কাজে তাঁর আগ্রহ এবং অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। শুরুতে সেমিস্টার পদ্ধতির প্রবর্তন করেন, যার সুফল শিক্ষার্থীরা পেয়ে আসছে। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এ পদ্ধতি চালু ছিল না। ভর্তি পরীক্ষায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি প্রবর্তনের মতো ভালো কাজ তাঁর হাত দিয়েই হয়েছে। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত থাকায় অনেক ঘটনার সাক্ষী আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ভবনের নামকরণ নিয়ে তাঁকে মৃত্যু পরোয়ানা দেওয়া হয়েছিল। জোট সরকারের সময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা প্রকাশ্যে অফিস রুমে গিয়ে তাঁর জিহ্বা কেটে ফেলার হুমকি দেয়। এমন অসংখ্য ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে। জাফর ইকবাল শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, গোটা বাংলাদেশে তাঁর খ্যাতি ও সুনাম বিস্তৃত। একজন প্রগতিশীল লেখক হিসেবে তিনি অনেকের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। চিঠি ও মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি তিনি অনেকবার পেয়েছেন।  সরকার কর্তৃক তাঁকে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। এমন এক পরিবেশেই তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করা হয়। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই ও দায়ী ব্যক্তি এবং ব্যক্তিদের দ্রুত শাস্তি দাবি করছি। আমরা শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থীসহ সবাই ক্ষুব্ধ, পাশাপাশি হতাশ এ কারণে যে এমন নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই স্যারকে আঘাত করা হলো।

বাংলাদেশে প্রগতিশীল আন্দোলনের রূপকার হিসেবে জাফর স্যারকে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে সহায়তা করা, তাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা, শিক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতির প্রয়োগ এবং সৃষ্টিশীল হয়ে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যত লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে জাফর ইকবাল কোনো অংশেই কম নন। তিনি যেমন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মনে আশার আলো জাগাতে সক্ষম হয়েছেন, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় অসংগতি ও দোষ-ত্রুটিও ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করে আসছেন। মানুষকে উজ্জীবিত ও উৎসাহিত করতে তিনি সর্বদা সজাগ ও সচেষ্ট। কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তিনি কথা বলে আসছিলেন। জঙ্গিবাদ নিয়ে তিনি সর্বত্র সোচ্চার ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে তাঁর মতামত চালুর চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। এমন একজন মানুষের ওপর দীর্ঘদিনের ঘোষিত আক্রমণের কথা অবশেষে বাস্তবে রূপ নেয়। দুই দশক ধরে বিভিন্ন সময় তাঁকে যেভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, আমরা কার্যত তার বহিঃপ্রকাশ আজ দেখতে পেয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর হামলার অন্যতম একটি কারণ তাঁদের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও মত প্রকাশের স্বাধীন প্রচেষ্টা। মুক্তমন যা লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সরাসরি বাধ্যবাধকতা এবং মত প্রকাশে বাধা না থাকার কারণে সমাজের অন্যান্য পেশার তুলনায় আমাদের স্বাধীনতা বেশি থাকে। যখন আমাদের নিজস্ব মতামত ও চিন্তা লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন কারো কারো ব্যক্তিগত ও কোনো কোনো গোষ্ঠীর পশ্চাৎপদ চিন্তা ও চরিত্রে আঘাত হানতে পারে। অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষও তাদের মত প্রকাশ করতে পারে এবং করে। তাদের মতামতও কারো চরিত্রে আঘাত হানতে পারে। তবে তুলনামূলকভাবে আমাদের ঝুঁকির পরিমাণ একটু বেশি। আর আমাদের ঝুঁকির পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয় যখন নিরাপত্তার দেখভাল করার অভাব দেখা দেয়। জাফর স্যারের কথাই যদি ধরি, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও তাঁর ওপর হামলা হয়েছে।

শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে, শ্রেণিকক্ষের বাইরে বিভিন্ন মতামত ও বক্তব্য প্রদান করে থাকেন। কখনো কোনো মতামত ও বক্তব্য কারো বিপক্ষে চলে যেতে পারে। আমরা জাফর স্যারের কাছ থেকে সমাজজীবনের বিভিন্ন বিষয়ে ভালো বিশ্লেষণ পেয়ে আসছি। আমরা যাঁরা শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করি এবং লেখালেখিও করি তাঁদের এখন অনেক কিছু ভাবতে শেখাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে সরাসরি মতদ্বৈধতায় যাওয়া ভালো কিন্তু গোপন রেখে এবং তাকে পুঁজি করে কোনো অঘটন ঘটানো কাম্য হতে পারে না। মতামত পছন্দ নাও হতে পারে, কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারে কিন্তু তার প্রকাশ হতে হবে। পছন্দ না হলে বিষয় নিয়ে বিতর্ক হতে পারে এবং পাল্টা মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাও রয়েছে। কিন্তু তা না করে সরাসরি ভিন্নপথ অবলম্বন কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

আমরা দুই ধরনের সমাজ ধারার মধ্যে বসবাস করছি। আমরা মতামত প্রকাশ করছি, যা সঠিক ও যুক্তিযুক্ত, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক আমাদের মতামত কারো কারো পছন্দ হচ্ছে না। যুক্তিতে সঠিক হলেও অন্যরা গ্রহণ করছে না। সঠিক নয় এবং যুক্তিযুক্তও নয় অথচ আমরা সেখানে সমর্থন জানাচ্ছি। কিন্তু বড় ঝুঁকির বিষয় অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে না পারা এবং মেনে নেওয়া। সহজ কথায় কিছু করতে না পারা। অন্যায়কে অন্যায় ও অযৌক্তিক বলার সুযোগ তৈরি না হওয়া। এমন অবস্থা একটি সমাজের জন্য কতটা ভয়াবহ ও ভয়ানক তা আমরা কল্পনা করতে পারি কিন্তু আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে, এমন এক দোদুল্যমানতায় আমরা বসবাস করছি। যদি আমরা অন্যদের বোঝাতে পারতাম ও অন্যায়কে অন্যায় বলতে বাধ্য করতে পারতাম, তাহলে কাজ হতো। সমাজ দেহে এমনভাবে ঘুণে ধরেছে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অন্যায়কারীদের শাস্তি দাবি করা এবং শাস্তি দেওয়া যেন বড় অন্যায়। সমাজ যেন এমনিভাবে চলছে। এমন ডামাডোলের মধ্যে অতীতেও বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদের ওপর হামলা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

আজকে আমাদের বড় প্রশ্ন, আমরা কি মুখ বন্ধ করে থাকব, নাকি আমাদের কথা বলেই যাব। আমরা কি সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব, নাকি সিলেবাসের নির্দিষ্ট কনসেপ্টগুলো একটি ছকে এঁকে দিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ করব। যদি তা-ই হয়, তাহলে আমাদের পথ কোনোভাবেই মসৃণ নয়। অর্থনৈতিক উন্নতি ও শক্তি দিয়েই শুধু নয়, আমাদের আগাতে হবে প্রগতিশীল চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে। অপশক্তি হানা দেবে কিন্তু তার মধ্যেই টিকে থাকতে হবে। শুধু শোভাযাত্রা, সভা-সমাবেশ ও বিবৃতির সময় এখন শেষ। এখন দরকার প্রতিরোধ।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com



মন্তব্য