kalerkantho


সাম্প্রতিক সময়ের উন্নয়ন ভাবনা

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সাম্প্রতিক সময়ের উন্নয়ন ভাবনা

উন্নয়নের ভাবনা আজকের দিনে খুব বেশি প্রাসঙ্গিক। এই উন্নয়ন শুধু একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষ ও রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে না; বরং অনেক বিষয়ই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো চিহ্নিত করা ও সেগুলো কিভাবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, সেই বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিককালে মানব উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। এই মানব উন্নয়ন বলতে এখন শুধু দক্ষতা বৃদ্ধিকে বোঝায় না, বরং বর্তমান সময়ে মানুষের মন ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যও বোঝায়। যেমন—অর্থনীতিতে তিনজন নোবেলজয়ী একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মানুষের মানসিকতার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের এই বিশ্লেষণ ও অর্থনীতির মডেল ভিন্নমুখী হলেও এই একটি বিষয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পারস্পরিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক উন্নয়ন একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কারণ মানবিক প্রগতি ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে মানবিক প্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চেয়ে মানবিক প্রগতি রাষ্ট্রের সমৃদ্ধিতে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে। জন স্টেসি অ্যাডামসের ইক্যুইটি বা সমতাকরণ প্রণোদনা থিওরি থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এখানে বলা হয়েছে যে শুধু মানুষের চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে তার মধ্যে প্রণোদনা তৈরি করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে এই চাহিদা মৌলিক চাহিদার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হলেও তা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সক্ষম হয় না। আর সেখানেই মানুষে মানুষে চাহিদার বৈষম্য নিরসন করে যখন সমতাভিত্তিক বা ইক্যুইটি ধারণা সৃষ্টি করা যায়, তখন মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক মনোভাব ও প্রণোদনা তৈরি হয়। মার্কিন অর্থনীতিবিদ রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনৈতিক আচরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান ঘোচানোর কৌশল নির্ধারণের কথা বলেছেন। তিনি অর্থনীতিকে অনেক বেশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। এখানে একটি বিষয় ভাবা যেতে পারে, তা হলো কিভাবে অর্থনীতি ও মানবিক আচরণের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। মানুষের আচরণ ও মন কিভাবে পরিবর্তন করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত করা যায়—এ কথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন—পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি এখানে দৃষ্টান্ত হিসেবে আনা যেতে পারে। বিদেশি অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে দাতাগোষ্ঠী সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের অপারগতা প্রকাশ করে। বিষয়টি নিশ্চিতভাবে সে সময় রাষ্ট্রের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান। বিষয়টি সে সময় কেউ কেউ অবাস্তব ধারণা বলে বিশ্লেষণ করলেও তা সাধারণ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এর কারণ হলো, এটি মানুষের মনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে তাদের মধ্যে যেমন দেশপ্রেমের মূল্যবোধ জাগ্রত করেছে, তেমনি ‘আমরা নিজেরাও পারি’—এই বিশ্বাস মানুষের মনোবল বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এখন পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যা মানুষের দ্বিধাগ্রস্ত মনকে পরিবর্তন করে তার মধ্যে ইতিবাচক আচরণগত মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক এফ ডাব্লিউ টেইলর বিজ্ঞানকে উৎপাদন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে ‘মেন্টাল রেভ্ল্যুশন’ বা মানসিক বিপ্লবের কথা বলেছেন। এর মূল বিষয় হলো, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও প্রযুক্তি অনুসরণ না করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখে। শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যৌক্তিক ধারণা গড়ে তুলে তার মন ও মানসিকতা প্রভাবিত করা সম্ভব। এই প্রভাব মানুষকে কাজের প্রতি আগ্রহী করে তোলে ও মানুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। আবার দর্শনের সঙ্গে উন্নয়নের একটি বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় বলা হয়ে থাকে, বিজ্ঞান হচ্ছে সাধারণ অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা আর বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা হলো দর্শন। প্রকৃতপক্ষে এই দর্শনগত পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত, আর দর্শনের মাধ্যমে উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য মৌলিক উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করা সম্ভব। দর্শনের একটি উপাদান হলো সত্যের অন্বেষণ। এই সত্যের সঙ্গে সততার বিষয়টি সম্পর্কিত। আবার সততার সঙ্গে ন্যায়, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যার ভিত্তি যুক্তিবাদী মনোভাবের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও মানবিক উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে দর্শন ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলোও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ এই দুটি প্রভাবক শক্তি যদি ইতিবাচকভাবে মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়, তবেই মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এখানে একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক তা হলো, কিভাবে একজন মানুষ কোনো একটি কাজে তাকে সম্পৃক্ত করবে। যেমন—বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সিং কাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রেখে সত্ভাবে আয়ের পথ বেছে নিয়েছে। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের (ওআইআই)’ একটি গবেষণায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে যে বিশ্বে আউটসোর্সিং করা দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। আর তিন নম্বরে অবস্থান করছে আমেরিকা। বিশ্বের মোট আউটসোর্সিং কাজের ২৪ শতাংশ কাজ হয়ে থাকে ভারতে। আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশে হয়ে থাকে ১৬ শতাংশ কাজ। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা আমেরিকায় হয় ১২ শতাংশ কাজ। এ ক্ষেত্রে দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের ইতিবাচক ব্যবহার তরুণদের প্রভাবিত করেছে। উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব। তবে শিক্ষাপদ্ধতি কিভাবে প্রণীত হলে তা মানুষের মানবিক প্রগতি ও আচরণ প্রভাবিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে, সে বিষয় ভেবে দেখতে হবে।

আবার শিক্ষার বিশুদ্ধতা কিভাবে সুরক্ষিত করা যাবে, তা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে। শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব কি না তা-ও বিশ্লেষণ করা দরকার। কারণ যেভাবে সময়ের সঙ্গে মানুষের আচরণগত মানবিক বৈশিষ্ট্যের অবনতি ঘটেছে, তার উন্নয়ন ছাড়া আর অন্য কোনোভাবে এটি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এখন দরকার মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ মনোভাব গড়ে তোলা। আর এটি মানুষের মানসিকতা ইতিবাচকভাবে পরিবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ প্রত্যেকেই আমরা কোনো না কোনোভাবে এর জন্য দায়ী। কখনো মানুষের মধ্যে অন্যায়ের মনোভাব কাজ করছে, আবার কখনো মানুষ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে অন্যায়কে মেনে নিয়েছে। যে দুটিই সমপরিমাণ অপরাধ। এখান থেকে বেরিয়ে এসে উন্নত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিবাচক জীবনাচরণের মাধ্যমে আমরা আবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারি। তা না হলে আমাদের নিজেদের খোঁড়া গর্তে আমাদের সবাইকে পড়তে হবে, যা কোনোভাবেই কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

asadzmn2014@yahoo.com


মন্তব্য