kalerkantho


‘পদ্মাবত’ নিয়ে রাজনীতি

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘পদ্মাবত’ নিয়ে রাজনীতি

ভারতের বিজেপি শাসিত গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ে ‘পদ্মাবত’ দেখানো নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘পদ্মাবত’ দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আর সেন্সর বোর্ড ছবিটি দেখানোর অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ছবিটি দেখানো হচ্ছে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে। যারা দেখছে তারা বলেছে, ছবিটির মধ্যে আপত্তিকর কিছু নেই। যদি থাকত তাহলে সেন্সর বোর্ডই অনুমোদন দিত না। মহারাষ্ট্র ছাড়া বাকি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে নির্বাচন। তাই গেরুয়া সরকারগুলো এই ঐতিহাসিক ছবিটি দেখানোর অনুমতি দিচ্ছে না। এর ফলে গোটা দেশ বিভক্ত।

অতীত রাজগৌরবের ঝলকানি, নাকি বর্তমান রাজনীতির ঘোলা জল? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘পদ্মাবত’ ছবিটি ঘিরে দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক এবং তা আরো বাড়িয়ে দফায় দফায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং হিংসাত্মক যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, তার পেছনে নিখাদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল প্রকট।

সামনেই দুটি বড় রাজ্যে ভোট। রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ। তার পরেই আগামী বছর রয়েছে লোকসভা নির্বাচন। এমনও শোনা যাচ্ছে, লোকসভা ভোটও হয়তো এগিয়ে আনা হতে পারে। এই নির্বাচনগুলো একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে বিজেপি তাদের শাসনকালের মেয়াদ বাড়াতে পারবে কি না। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস তথা বিরোধী শিবির তাদের হারানো জমি ফিরে পাবে কি না সে প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া যাবে এই নির্বাচনগুলোতে।

ওই দুটি রাজ্যেই রাজপুত ভোট রয়েছে ১০ শতাংশের ওপর। হিন্দি বলয়ের অন্যান্য রাজ্যেও আছে যথেষ্টসংখ্যক রাজপুত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এই বিরাটসংখ্যক রাজপুত ভোট কবজা করতেই কি ‘পদ্মাবত’ নিয়ে দেশজোড়া হাঙ্গামা? সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, মোদি তথা বিজেপির ম্যাজিক দ্রুত লুপ্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যবান রাজপুত ভোট হাতছাড়া করতে চাইবে না বিজেপি।

দেশজুড়ে হাঙ্গামার মুখ হিসেবে সামনে কারনি সেনা থাকলেও পেছনের যাবতীয় কলকাঠি যে বিজেপিই নেড়েছে, তাও জলের মতোই স্পষ্ট। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, বিজেপি শাসিত কোনো রাজ্যেই হাঙ্গামা ঠেকানোর কোনো রকম উদ্যোগ সরকার নেয়নি। চারটি বিজেপি শাসিত রাজ্য ‘পদ্মাবত’ প্রথম সুযোগেই নিষিদ্ধ করে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এই রাজ্যগুলোর প্রশাসন তাণ্ডবের ঘটনাগুলোতে হাত গুটিয়েই বসেছিল। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের সওয়াল-জবাব পর্বে তারা শেষ পর্যন্ত ‘পদ্মাবত’ নিষিদ্ধ করার ওপরই জোর দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দলকেও পদ্ম-শিবিরের মদদপুষ্ট এই হাঙ্গামার বিরুদ্ধে তেমনভাবে সরব হতে দেখা যায়নি।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ‘পদ্মাবত’ বিতর্ক নিয়ে প্রথম দিকে কংগ্রেসের ছোট-মাঝারি নেতাদের দিয়ে দু-চার কথা বলানো হলেও তার সুরও ছিল বেশ নরম। কিন্তু রাহুল গান্ধীসহ কংগ্রেসের বাঘা বাঘা নেতা ‘পদ্মাবত’ নিয়ে সেভাবে মুখ খোলেননি বা এখনো খুলছেন না। ‘পদ্মাবত’ বিতর্কে রাজপুত ঐতিহ্য ও গৌরবহানির প্রসঙ্গটি যে নেহাতই জোলো এবং অর্থহীন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে আরো কয়েকটি ঘটনায়।

বস্তুত ছবিটি তৈরির আগে ‘পদ্মাবত’-এর পরিচালক ও প্রযোজকরা চিতোরের রাজপরিবারকে ছবিটির চিত্রনাট্যটি পড়িয়ে নিয়েছিলেন। তাঁরা চিত্রনাট্যটি পড়ে ছবিটি তৈরি করার ব্যাপারে অনুমোদন দেন। তার পরও ছবিটি নিয়ে আপত্তির কথা ওঠার পর নির্মাতারা ৪০টি রাজপুত সংগঠনের নেতৃত্বকে একত্রে বসিয়ে ছবিটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। তাঁরাও সে সময় ছবিটিতে খারাপ কিছু পাননি।

জয়পুরের মহারানি পদ্মিনী দেবী এবং তাঁর কন্যা বিজেপি বিধায়ক দিয়া কুমারী রাজপরিপারের থেকে প্রথম আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁরা জোর দিয়েছিলেন, ছবিটি রিলিজ করার আগে তাঁদের দেখাতে হবে এবং ছবিটির কোনো রকম ‘ইতিহাস বিকৃতি’ ঘটানো চলবে না। যদিও ইতিহাসবিদদের একটা বড় অংশই মনে করে, ‘পদ্মাবত’ কাব্যটি আদতে ফিকশনই। বাস্তবের সঙ্গে বা ইতিহাসের সঙ্গে এর কোনো রকম সম্পর্কই ছিল না। জয়পুরের রাজপরিবারের আরেক সদস্য রুক্সিনি কুমারীও বলেছিলেন, ছবিটির আপত্তিকর অংশগুলো ছেঁটে ফেলে সেটিকে রিলিজ করতে দেওয়া যেতে পারে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ পুষ্পেশ পন্থ বলেছেন, রানি পদ্মাবতী নামে কোনো চরিত্র থাকতেই পারে, কিন্তু ‘পদ্মাবত’কে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে বর্ণনা করা যায় না।

রাজপুত ভাবাবেগের প্রেক্ষাপটে রয়েছে জহর ব্রতর মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ইতিহাসবিদদের লেখা থেকে পাওয়া যায়. উত্তর-পশ্চিম ভারতের বেশ কিছু জায়গায় জহর ব্রত (সম্মান রক্ষায় মহিলাদের আত্মাহুতি দেওয়া) প্রচলিত ছিল।

আলাউদ্দিন খিলজির সেনাবাহিনীর হাতে রাজা রতন সিংয়ের পর্যুদস্ত হওয়ার পর চিতোরের প্রায় ১৬ হাজার রমণী আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। ‘পদ্মাবত’ কাহিনি অনুসারে জহরকুণ্ডে এই জহর ব্রতের প্রথমেই ছিলেন রানি পদ্মাবতী। রতন সিংয়ের পরাজয়ের খবর আসতেই চিতোর দুর্গের ভেতর এক গোপন জায়গায় রানি পদ্মাবতীর নেতৃত্বে একত্র হন রাজপরিবারের সব মহিলা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সেনাদের স্ত্রীরাও। গোপন একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে দুর্গ থেকে জহরকুণ্ড পৌঁছেন তারা। হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে এরপর একে একে গায়ে আগুন দিয়ে জহরকুণ্ডে ঝাঁপ দেন তাঁরা। কার্যত জনশূন্য চিতোর দুর্গে আসেন বিজয়ী আলাউদ্দিন খিলজি। এ ঘটনার পর থেকেই জহর-ব্রত রাজপুত রমণীদের কাছে এক পরম গর্বের বিষয় বলে চিহ্নিত।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘পদ্মাবত’ নিয়ে এই হাঙ্গামা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং পূর্বপরিকল্পিত বলেই মনে করা হচ্ছে। ছবিটিতে আপত্তিকর কিছু থাক বা না থাক, রাজপুত সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিতে ‘পদ্মাবত ছবিতে রাজপুত রমণীদের খাটো করা’ হয়েছে, এই প্রচার লঘু করে দেওয়া হয়। প্রচারের জেরে চার বিজেপি শাসিত রাজ্যে আগুন ছড়ানো হচ্ছে রাজপুত-মনকে বিষিয়ে দেওয়ার জন্য।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক



মন্তব্য