kalerkantho


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের দাবি হীনবল হওয়া সমীচীন হবে না

ড. সা’দত হুসাইন

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের দাবি হীনবল হওয়া সমীচীন হবে না

গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে নির্বাচন। আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সহযোগে গণতান্ত্রিক শাসন সংজ্ঞায়িত হয়। এ নিবন্ধে শুধু নির্বাচন পদ্ধতির ওপর আলোচনা করা হবে। প্রসঙ্গক্রমে হালকা টানে অন্য উপাদানগুলো আলোচনায় এলেও তা নিবন্ধের মূল উপজীব্য নয়। নির্বাচনের মধ্যে আলোচনা সীমিত রাখতে চেষ্টা করা হবে। নির্বাচন বলতে এক ব্যক্তির এক ভোট এবং গোপন ব্যালট বা অন্য কোনোভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করে ভোটদান পদ্ধতিকে বোঝায়। নির্বাচন পদ্ধতির মূল দর্শন হচ্ছে, বেশিসংখ্যক ভোটার যাঁকে ভোট দেবে, অর্থাৎ পছন্দ করবে, তিনি বিজয়ী বলে ঘোষিত হবেন। দলগত নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সন্তোষজনক নাও হতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের গোপন ভোটের মাধ্যমে সরকারপ্রধান বা শাসক নির্বাচিত হওয়ার মূলনীতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার উপযোগিতা নির্ধারণ, ভোটার হওয়ার যোগ্যতা, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার পদ্ধতি দেশভেদে বিভিন্ন রূপ হয়ে থাকে। গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শাসন এবং পার্লামেন্টারি পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা এক নয়। দুই পদ্ধতির শাসনব্যবস্থার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারপ্রধান উভয় পদে আসীন থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তির নির্বাহী ক্ষমতা তাঁর আওতাধীন মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মের মধ্যে সীমিত। প্রেসিডেন্টের মর্জির ওপর প্রধানমন্ত্রীরূপে থাকা না থাকা নির্ভরশীল। এক কথায় রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টই সর্বেসর্বা। তাঁর ক্ষমতা অতুলনীয়। পার্লামেন্টারি পদ্ধতির শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সরকারপ্রধান। রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ দান করলেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হন সরকারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর পরামর্শ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপতি কোনো নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। দেশ শাসনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে গুরুত্বপূণ ব্যক্তি। দু-একটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র বাদ দিলে রাষ্ট্রপতির পদটি বস্তুত আলংকারিক। প্রধানমন্ত্রীর মতের বিপক্ষে রাষ্ট্রপতির বিশেষ কিছু করণীয় নেই।

সরকারপ্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধানের নির্বাচনের ব্যাপারেও বিভিন্ন দেশে পদ্ধতিগত পার্থক্য দেখা যায়। মূল পার্থক্যের একটি হচ্ছে, নির্বাচন কি সরাসরি হবে না পরোক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে হবে। প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু দেশে প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন মোটামুটি সব দেশেই পরোক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে যখন প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতির সরকার ছিল, তখন সারা দেশের ভোটাররা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিত। সরাসরি ভোট গণনা করে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণা করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিন্তু সারা দেশের ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না, ভোটাররা ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ নামে মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করে। তারা পরবর্তীকালে ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। এ নির্বাচন পদ্ধতির সঙ্গে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের অনেকটা মিল রয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তৎকালীন পাকিস্তানে মৌলিক গণতন্ত্র তীব্রভাবে সমালোচিত হলেও আমেরিকার এই পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতির সমালোচনায় বিশ্ববাসীকে তেমন সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। ফেডারেল শাসনব্যবস্থার অজুহাত দেখিয়ে নির্দ্বিধায় গাণিতিকভাবে অযৌক্তিক এরূপ একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা আমেরিকান সরকার চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক গণনায় বহু বেশি ভোট পাওয়া সত্ত্বেও একজন প্রার্থী ইলেকটোরাল কলেজের মারপ্যাঁচে পরাজিত ঘোষিত হচ্ছেন। পক্ষান্তরে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েও অন্য প্রার্থী জয়ী ঘোষিত হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হচ্ছেন।

পার্লামেন্টারি পদ্ধতির নির্বাচনব্যবস্থায় সরাসরি ভোটে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান নির্বাচিত হন না। পুরো দেশকে নির্দিষ্টসংখ্যক নির্বাচনী এলাকায় (Constituency) ভাগ করে প্রতিটি এলাকার জন্য একজন প্রতিনিধি বা পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচন করা হয়। নির্বাচন সম্পূর্ণরূপে দলভিত্তিক, দলের প্রতীক নিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচন করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অবশ্য নিজেদের প্রতীকে নির্বাচন করেন। ফল ঘোষিত হওয়ার পর যে দলের নির্বাচিত সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হন, তাঁরাই সাধারণত সরকার গঠন করেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত পার্লামেন্টারিয়ান বা সংসদ সদস্যরা প্রথমে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচন করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হন। রাষ্ট্রপতি তাঁকে বিজয়ী দলের নেতা মেনে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতির অনুরোধে, তথা রাষ্ট্রপতির সম্মতি নিয়ে বিজয়ী দলের নেতা সরকার গঠন করেন। এ ক্ষেত্রেও কোনো কোনো সময় দেখা যায় যে বিজয়ী দল, যারা সরকার গঠন করেছে, তাদের সামগ্রিকভাবে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা (Popular vote) পরাজিত, তথা বিরোধী দলের ভোটসংখ্যার চেয়ে অনেক কম। এখানেও গাণিতিক অসংগতি প্রকটভাবে প্রতিভাসিত হয়। যে পদ্ধতি গাণিতিকভাবে অযৌক্তিক, যুগ যুগ ধরে তা চলতে পারে না। এক কথায়, স্থায়ী পদ্ধতি হিসেবে একে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন না করলেও সংস্কার করে এর যৌক্তিকতা গ্রহণযোগ্য মানে উন্নীত করতে হবে।

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন (Proportional Representation) এ ক্ষেত্রে যথার্থই প্রাসঙ্গিকতার দাবিদার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন মূলত দলীয় ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তাই এ পদ্ধতিতে ব্যক্তিবিশেষ নয়, দলকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হয়। নির্বাচনের আগে প্রত্যাশী দলকে গালাবদ্ধ খামে তাদের বাছাই করা বা মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকা নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হয়। দলগুলো নিজ প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। সারা দেশের গণনায় একটি দল যে সংখ্যক ভোট পায়, আনুপাতিক হারে পার্লামেন্টে সে পরিমাণ আসন সে দলের হিসসায় চলে যায়। অন্ততপক্ষে একটি আসন পেতে যে পরিমাণ ভোটের প্রয়োজন হয়, সে পরিমাণ ভোট না পেলে ওই দলকে আসন বণ্টনের অনুশীলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। এভাবে আসন বণ্টনের পর যে দল সবচেয়ে বেশিসংখ্যক আসন পায়, সে দলকে সরকার গঠনের জন্য অনুরোধ করা হয়। অন্য দলগুলো প্রাপ্ত ভোটসংখ্যার অনুপাতে আসন লাভ করে। দ্বিতীয় বৃহত্তম আসনসংখ্যার অধিকারী দল সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে এবং সে দলের নেতা বিরোধী দলের নেতা হিসেবে আখ্যায়িত হন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা সংসদনেতা হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং সাধারণত তিনি হন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তথা প্রধান নির্বাহী। ভোট গণনা অনুযায়ী যে দল যতসংখ্যক আসন প্রাপ্য হয়, গালাবদ্ধ খামে সংরক্ষিত তালিকা থেকে ক্রমমান অনুযায়ী ততজন ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কোনো দেশের নির্বাচন যদি সম্পূর্ণরূপে সংখ্যানুপাতিক ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সে দেশের নির্বাচনী এলাকা ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির সংসদ সদস্য হওয়ার অবকাশ থাকে না। এক কথায় নির্বাচনী এলাকায় ব্যক্তিবর্গের নির্বাচন হয় না। সারা দেশের ভোটাররা তাদের পছন্দের দল, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোট, এমনকি চরম ব্যতিক্রমী অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকেও ভোট দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন রাজনৈতিক দল অথবা ক্ষুদ্র জোটের মধ্যে সীমিত থাকে। এ পদ্ধতিতে ভোটারদের পক্ষে ব্যক্তিবিশেষকে পছন্দ করে সংসদ সদস্য নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। পুরো নির্বাচন হয়ে পড়ে দল বা জোটের খেলা।

এলাকাভিত্তিক নির্বাচনে একজন ব্যক্তি অন্যান্য ব্যক্তি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। নির্বাচনের ফল ঘোষণায় First past the post নীতি অনুসৃত হয়। এর অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি সব প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এককভাবে সর্বাধিকসংখ্যক ভোট পাবেন, তিনি নির্বাচিত সংসদ সদস্য (MP) হিসেবে ঘোষিত হবেন। বাকিরা সবাই পরাজিত প্রার্থী হিসেবে পরিগণিত হবেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়া একজন এমপির জন্য নানা বৈষয়িক সুবিধার দ্বার উন্মোচন করে। পক্ষান্তরে পরাজিত প্রার্থী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ভাগ্য খারাপ হলে তাঁকে নানারূপ বিপদ বা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। সে কারণে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য ব্যক্তি প্রার্থী মরিয়া হয়ে ওঠেন। যেকোনো মূল্যে তিনি জয়ী হতে চান। এ ব্যাপারে প্রায়ই প্রার্থীর ন্যায়-অন্যায়, হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তাঁরা কালো টাকা, পেশিশক্তি ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে অবদমন করতে এবং জয় ছিনতাই করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সমর্থন পেলে এ প্রচেষ্টায় তাঁরা সফল হন। নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়। এরূপ জোর-জুলুম, কারচুপির নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে না। পুরো নির্বাচনী কর্মকাণ্ড সন্ত্রাসী তৎপরতায় পর্যবসিত হয়। মাঝেমধ্যে প্রাণহানিও ঘটে। নির্বাচন সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়। একে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা যায় না। দুঃখজনক হলেও বাংলাদেশের অনেক নির্বাচনের চিত্র এ ধরনের হয়ে থাকে।

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন এমন সন্ত্রাসকবলিত হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে ভোটাররা দল বা জোটের সুনাম-দুর্নাম, তাঁদের ম্যানিফেস্টো-কর্মসূচি, নেতাদের মর্যাদা, যোগ্যতা, নাম-সুনাম, বিশ্বাসযোগ্যতা, দলের পূর্ব রেকর্ড ইত্যাদি বিবেচনা করে ভোট দেয়। যেহেতু ব্যক্তির স্বার্থ সরাসরি জড়িত নয়, তাই ছলে-বলে-কৌশলে ব্যক্তিবিশেষ জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে না। সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা তিরোহিত হয়। এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটদান ও ভোট গণনা সম্পন্ন হবে বলে যৌক্তিকভাবে আশা করা যায়। সারা দেশে নৈর্ব্যক্তিকভাবে ভোট পর্ব শেষ হওয়ার পর সুশৃঙ্খলভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন হবে। অতঃপর সারা দেশে বিভিন্ন দল সামগ্রিকভাবে কত ভোট পেয়েছে, তার ওপর পার্লামেন্টে দলের প্রাপ্য আসনসংখ্যা গাণিতিক হিসাবে নির্ধারিত হবে। যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, সে দল সরকার গঠনের সুযোগ পাবে। ছোট ছোট দলও সামগ্রিকভাবে প্রাপ্ত (মোট) ভোটের হিসাবে আসন লাভ করবে। এক কথায় সারা দেশে জনসমর্থনের ভিত্তিতে তাদের প্রাপ্য আসনসংখ্যা নির্ধারিত হবে। পার্লামেন্ট নির্বাচন অধিকতর অংশগ্রহণধর্মী হবে।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের অসুবিধা হলো যে এ ক্ষেত্রে এলাকা নির্দিষ্ট কোনো এমপি থাকেন না। ফলে পার্লামেন্টে বা সরকারের কাছে এলাকার সমস্যা তুলে ধরার জন্য সুনির্দিষ্ট জনপ্রতিনিধি থাকেন না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুনজরে না থাকলে তালিকায় বা তালিকার ওপরের দিকে নাম থাকবে না। এর ফলে দল স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে। তালিকাভুক্তি বাণিজ্যে পরিণত হতে পারে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিরাট অসুবিধায় পড়বেন; সারা দেশে তাঁরা এত ভোট জোগাড় করতে পারবেন না, যার বলে তাঁরা এমপি হতে পারেন। এখন প্রার্থীরা যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে ভোটারের কাছে গিয়ে ভোট চান, সেভাবে কেউ আর হয়তো ভোটারের কাছে যাবেন না। ভোটাররা এতে অবহেলিত ও উপেক্ষিত বোধ করতে পারে।

এ অসুবিধা দূর করার জন্য নেপাল, জাপানের মতো অনেক দেশ ভোটদানের মিশ্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। মোট আসনসংখ্যার একাংশ এলাকাভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ করা হয়, অন্য অংশ পূরণ করা হয় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির মাধ্যমে। এর ফলে জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবী, দক্ষ পেশাজীবী, নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, যাঁরা কালো টাকা, পেশিশক্তি ও মারাত্মক অস্ত্রের দাপটের কারণে নির্বাচনে প্রার্থী হতে ভয় পান বা উৎসাহ বোধ করেন না—এমন প্রদীপ্ত ব্যক্তিরা পার্লামেন্টে আসীন হতে পারবেন। তাঁদের পারদর্শিতা, মন্তব্য, সুপারিশ পেয়ে জাতি উপকৃত হবে। দক্ষ, প্রদীপ্ত, মর্যাদাবান লোক পার্লামেন্টের সদস্য হলে রাজনীতি সমৃদ্ধ হবে। তরুণ প্রজন্মের মেধাবী সদস্যরা রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত হবেন। যেহেতু রাজনীতিবিদরা দেশের শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেন, তাই মেধাবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদান দেশের জন্য বিশেষ কল্যাণকর হবে।

আমার সঙ্গে যত জ্ঞানী-গুণী, বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, চিন্তক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক নেতার আলোচনা হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবাই সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ সত্ত্বেও সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেনি। এ নিয়ে খুব একটা যে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। সীমিতসংখ্যক বা   দু-একটি রাজনৈতিক দল ততোধিক সীমিত পরিসরে দু-একটি আলোচনাসভার আয়োজন করেছে। আমি মনে করি, বিভিন্ন স্তরে বিষয়টি অনেক বেশি আলোচিত হওয়া দরকার। নির্বাচনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু-সুঠাম করে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টায় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সত্যিকার অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বকে আমাদের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে সরানো যাবে না। এ লক্ষ্যে পৌঁছার প্রচেষ্টাকে হীনবল হতে দেওয়া যাবে না।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান



মন্তব্য