kalerkantho


সাদাসিধে কথা

সমাবর্তন এবং সমাবর্তন ভাষণ

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সমাবর্তন এবং সমাবর্তন ভাষণ

জানুয়ারির ৭ তারিখ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমাকে সমাবর্তন ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। প্রায় ১০ হাজার গ্র্যাজুয়েটের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ আমার মতো মানুষের জন্য একটা অনেক বড় সুযোগ। আমি এর আগে যখনই সমাবর্তন ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি ঘুরেফিরে একই কথা বলেছি। এবারও তা-ই। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের নতুন একটি বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়ার সময় হয়েছে। নতুন প্রজন্ম সতর্কবাণীটি কিভাবে নেবে আমি জানি না; কিন্তু তার পরও আমি জোর করে তাদের সেটি শুনিয়ে এসেছি! শুনতে রাজি থাকলে অন্যদেরও ভাষণটি এখানে শুনিয়ে দেওয়া যায়। সেটি ছিল এ রকম :

“আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা :

আজকের দিনটি তোমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি, একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে আনন্দেরও একটি দিন। আমার অনেক বড় সৌভাগ্য যে তোমাদের এই আনন্দের দিনটিতে আমি তোমাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে পেরেছি। আমি মোটামুটি নিশ্চিত আজ থেকে অনেক দিন পরে যখন তোমরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তোমরা সমাজ, জাতি, দেশ কিংবা পৃথিবীকে কিছু দিতে শুরু করবে তখনো তোমাদের এই দিনটির কথা মনে থাকবে। আমি যদি আজকে বক্তব্য দিতে গিয়ে তোমাদের নানা রকম নীতিকথা শুনিয়ে, নানা রকম উপদেশ দিয়ে এবং বড় বড় কথা বলে ভারাক্রান্ত করে না ফেলি, তাহলে হয়তো তোমাদের আমার কথাটিও মনে থাকবে। আমার জন্য সেটি বিশাল একটি সম্মানের ব্যাপার। আমাকে এত বড় সম্মান দেওয়ার জন্য আমি তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কৃতজ্ঞ।

আমি আমার বক্তব্য শুরু করতে চাই একটি দুঃসংবাদ এবং একটি সুসংবাদ দিয়ে (এই জায়গায় আমি ছাত্র-ছাত্রীদের জিজ্ঞাস করেছিলাম তারা কোনটি আগে শুনতে চায়, তারা আগে দুঃসংবাদটিই শুনতে চেয়েছিল)! দুঃসংবাদটি হচ্ছে—তোমরা তোমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়টি কাটিয়ে ফেলেছ, আজকে এখন এই মুহূর্ত থেকে তোমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়টি অতীতের কিছু স্মৃতিতে পাল্টে যাচ্ছে। তোমরা এখন যত চেষ্টাই করো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বাধা-বন্ধনহীন বেহিসাবি স্বপ্নিল উদ্দাম তারুণ্যের জীবনটি আর কোনোভাবেই ফিরে পাবে না। এখন যে জীবনটিতে পা দিতে যাচ্ছ সেটি কঠোর বাস্তবতার জীবন।

সুসংবাদটি হচ্ছে—লেখাপড়া শেষ করে তোমরা যে বাংলাদেশে তোমাদের কর্মজীবনে প্রবেশ করবে সেই বাংলাদেশ দারিদ্র্যপীড়িত ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি দেশ নয়। এই বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে পড়েছে। আমি আমার ছাত্রজীবন শেষ করে যে বাংলাদেশে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলাম সেখানে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১১০ ডলার, বিশ্ববিখ্যাত অর্থনৈতিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট জানিয়েছে, এখন বাংলাদেশে তোমাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৫৩৮ মার্কিন ডলার, পাকিস্তানের চেয়ে ৬৮ মার্কিন ডলার বেশি (বক্তব্যের এই জায়গায় আমি পাকিস্তান নামের অকার্যকর একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করার জন্য শ্রোতাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি)। তখন অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র আট বিলিয়ন ডলার, এখন তার আকার ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছি, আমাদের শিক্ষকরা আমাদের পরিষ্কার করে বলে দিয়েছিলেন, পাস করার পর দেশে আমাদের কোনো চাকরি নেই, এখন গত বছর দেশে-বিদেশে ২৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে আমাদের স্বপ্ন দেখার কোনো সুযোগ ছিল না, তোমাদের এই বাংলাদেশ নিয়ে তোমরা স্বপ্ন দেখতে পারবে। কারণ যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস এক প্রতিবেদনে বলেছে যে সামনের বছরগুলোতে পুরো পৃথিবীতে যে তিনটি দেশ খুবই দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখবে তার একটির নাম বাংলাদেশ (বক্তব্যের এই জায়গায় আমি যে তথ্যগুলো ব্যবহার করেছি সেগুলো পেয়েছি ড. আতিউর রহমানের একটি লেখা থেকে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা)।

তোমরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে জীবনের পরের ধাপে পা দিতে যাচ্ছ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করে তোমাদের ধারণা হতে পারে তোমরা বুঝি খুব অল্প খরচে একটি ডিগ্রি পেয়েছ, সেটি কিন্তু সত্যি নয়। তোমাদের লেখাপড়ার জন্য অনেক টাকা খরচ হয়েছে, তোমরা সেটি টের পাওনি। কারণ তোমাদের পেছনে এই খরচটুকু করেছে সরকার। সরকার এই অর্থটুকু পেয়েছে এ দেশের চাষিদের কাছ থেকে, শ্রমিকদের কাছ থেকে, খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকে। আমি তোমাদের শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই, এ দেশের অনেক দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ হয়তো তার নিজের সন্তানকে স্কুল-কলেজ শেষ করিয়ে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত পাঠাতে পারেনি; কিন্তু তার হাড়ভাঙা খাটুনির অর্থ দিয়ে তোমাদের লেখাপড়া করিয়েছে। এখন তোমরাই ঠিক করো তোমার এই শিক্ষাটুকু দিয়ে তুমি কার জন্য কী করবে! অবশ্যই তুমি তোমার কর্মজীবন গড়ে তুলবে; কিন্তু তার পাশাপাশি যাদের অর্থে তুমি লেখাপড়া করেছ সেই দরিদ্র মানুষের ঋণ তোমাদের শোধ করতে হবে।

আমরা আমাদের দেশকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তোমাদের সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তোমরা কি জানো, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তোমাদের হাতে যে অস্ত্রটি রয়েছে সেটি কোনো হেলাফেলা করার বিষয় নয়। সেটার নাম হচ্ছে মস্তিষ্ক! যেটি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে মূল্যবান, সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে চমকপ্রদ, সবচেয়ে বিস্ময়কর ও সবচেয়ে রহস্যময়। ১০ হাজার কোটি নিউরনের দেড় কেজি ওজনের এই মস্তিষ্ককে আমরা কিভাবে ব্যবহার করব তার ওপর নির্ভর করবে তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার দেশের ভবিষ্যৎ এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তোমরা কি জানো, এই মহামূল্যবান রহস্যময় মস্তিষ্ক নিয়ে এখন সারা পৃথিবীতে একটি অবিশ্বাস্য ষড়যন্ত্র চলছে। আমি নিশ্চিত তোমাদের অনেকেই নিজের অজান্তে সেই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছ। এই ষড়যন্ত্রের নাম সোশ্যাল নেটওয়ার্ক (বক্তব্যের এই জায়গায় সন্দেহের যেন কোনো সুযোগ না থাকে সে জন্য উদাহরণ হিসেবে স্পষ্ট করে ফেসবুক শব্দটি উচ্চারণ করেছি)। শিক্ষক হিসেবে আমি লক্ষ করেছি ২০১৩-১৪ সাল থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের গুণগত অবক্ষয় শুরু হয়েছে, তাদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে এসেছে, তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

পৃথিবীর সব মানুষেরই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে এক ধরনের মোহ রয়েছে। অনেকেরই ধারণা, প্রযুক্তি মানেই ভালো, প্রযুক্তি মানেই গ্রহণযোগ্য। আসলে সেটি পুরোপুরি সত্যি নয়। পৃথিবীতে ভালো প্রযুক্তি যে রকম আছে, ঠিক সে রকম অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, এমনকি খারাপ প্রযুক্তি পর্যন্ত আছে। শুধু তা-ই নয়, সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে একটি প্রযুক্তি কারো কারো কাছে ভালো প্রযুক্তি হতে পারে আবার কারো হাতে সেটি ভয়াবহ রকম বিপজ্জনক প্রযুক্তি হয়ে যেতে পারে। তার জ্বলন্ত একটি উদাহরণ হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক।

আমি অনেক উদাহরণ দিতে পারব, যেখানে একজন সোশ্যাল নেটওয়ার্ককে একটি বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল উদ্যোগের জন্য ব্যবহার করেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি উদাহরণ দিতে পারব, যেখানে আমি তোমাদের দেখাতে পারব এই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক শুধু সময় অপচয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু যদি সময়ের অপচয় হতো, আমরা সেটি প্রতিরোধ করতে পারতাম; কিন্তু সারা পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে আবিষ্কার করেছেন, এটি আমাদের চিন্তা করার প্রক্রিয়াটিই পাল্টে দিয়েছে। আমরা এখন কোনো কিছু মন দিয়ে পড়ি না, সেটি নিয়ে চিন্তা করি না, বিশ্লেষণ করি না। আমরা এখন শুধু কিছু তথ্য দেখি, তাতে চোখ বোলাই এবং নিজেকে অন্য দশজনের সামনে প্রচার করি (বক্তব্যের এই সময় ‘প্রচার’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সেটি পরিষ্কার করার জন্য আমি ‘লাইক দেওয়া’ কথাটি ব্যবহার করেছিলাম)। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা দেখিয়েছেন একজন মানুষ যে রকম কোকেন, হেরোইন কিংবা ইয়াবায় আসক্ত হতে পারে, ঠিক সে রকম সামাজিক নেটওয়ার্কেও আসক্ত হতে পারে। মাদকে নেশাসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে মাদক না পেলে অস্থির হয়ে যায়, তার মস্তিষ্কে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে তার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সময় অপচয় না করতে পারলে সে-ও অস্থির হয়ে যায়, তার মস্তিষ্কেও বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। খুবই সহজ ভাষায় বলা যায়, সত্যিকারের মাদকাসক্তির সঙ্গে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আসক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

যারা এখনো আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না, তাদের ফেসবুকের উদ্যোক্তা প্রেসিডেন্ট শন পার্কারের বক্তব্যটি শোনা উচিত। তিনি বর্তমান ভয়াবহ আসক্তি দেখে আতঙ্কিত হয়ে বলেছেন, ‘শুধু খোদাই বলতে পারবেন, আমরা না জানি পৃথিবীর বাচ্চাদের মস্তিষ্কের কী সর্বনাশ করে বসে আছি।’

আমি তোমাদের মোটেও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আতঙ্কিত করতে চাই না। আমরা অবশ্যই চাইব তোমরা নতুন ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহী হও, সেটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করো। আমি শুধু একটি বিষয় আলাদাভাবে মনে করিয়ে দিতে চাই। যদি আমার এই সমাবর্তন বক্তৃতা থেকে তোমরা একটিমাত্র লাইন মনে রাখতে চাও, তাহলে তোমরা লাইনটি মনে রেখো : তোমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে; কিন্তু প্রযুক্তি যেন কখনোই তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে। মনে রেখো, এসব আধুনিক প্রযুক্তি কিন্তু পরজীবী প্রাণীর মতো, সেগুলো তোমার পুষ্টি খেয়ে বেঁচে থাকে (সমাবর্তন ভাষণ দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একটি স্মার্টফোন নির্মাতা অ্যাপলের বিনিয়োগকারীরা স্মার্টফোন ব্যবহারকারী শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন)!

তোমরা সবাই জানো, এই দেশের অর্থনীতির তিনটি পিলারের একটি হচ্ছে গার্মেন্টকর্মী; যার প্রায় পুরোটাই মহিলা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে চাষি, যাদের আমরা অবহেলার সঙ্গে দেখি এবং তৃতীয়টি হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিক, যারা বিদেশবিভুঁইয়ে নিঃসঙ্গ প্রবাসজীবনে দেশের জন্য রেমিট্যান্স অর্জন করে যাচ্ছে। সবাই কি লক্ষ করেছে এই দেশের অর্থনীতিকে ধরে রাখার জন্য এই তিনটি পিলারই কিন্তু শরীরের ঘাম ফেলে কাজ করে যাচ্ছে। তোমাদের মতো কিংবা আমাদের মতো শিক্ষিত মানুষ, যারা মস্তিষ্ক দিয়ে কাজ করি তারা কিন্তু এখনো অর্থনীতির চতুর্থ পিলার হতে পারিনি। আমাদের চতুর্থ পিলার হতে হবে, আমাদের মেধাকে নিয়ে দেশের শ্রমজীবী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সেটি করতে না পারব ততক্ষণ দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করা হবে না।

কিন্তু আমরা কেন আমাদের মেধা, মস্তিষ্ক, মনন নিয়ে এখনো দেশের শ্রমজীবী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে পারছি না? তার বড় একটি কারণ এই দেশের দরিদ্র মানুষেরা, যারা নিজের সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেনি, তাদের অর্থে পড়াশোনা করে এই দেশের সবচেয়ে সফল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সফল শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রথম স্বপ্ন হচ্ছে বিদেশে পাড়ি দেওয়া। এটি অসাধারণ একটি ব্যাপার হতো যদি জীবনের কোনো একটি সময়ে তারা দেশে ফিরে আসত। আমাদের খুব দুর্ভাগ্য তারা ফিরে আসছে না। এই দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলে-মেয়েদের প্রতিভাটুকু আমরা আমাদের নিজেদের দেশের জন্য ব্যবহার করতে পারি না।

তোমরা যারা সত্যিকারের জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, তাদের একটি সত্য কথা জানিয়ে দিই। মাতৃভূমিতে থেকে মাতৃভূমির জন্য কাজ করার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটি খুব সুন্দর কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রত্যেক মানুষের তিনটি করে মা থাকে, একটি হচ্ছে জন্মদাত্রী মা, একটি হচ্ছে মাতৃভাষা, অন্যটি হচ্ছে মাতৃভূমি। কথাটি পুরোপুরি সত্যি, মাতৃভূমি আসলেই মায়ের মতো। আমার সহজ-সরল সাদাসিধে মাকে ছেড়ে আমি যে রকম কখনোই উচ্চশিক্ষিত, চৌকস সুন্দরী একজন মহিলাকে মা ডাকতে যাই না, দেশের বেলায়ও সেটি সত্যি। আমি আমার এই সাদামাটা দেশকে ছেড়ে চকচকে-ঝকঝকে একটি দেশকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করে বাকি জীবন কাটাতে পারব না। আমি সেটি বলতে পারি। কারণ আমি নিজে এর ভেতর দিয়ে এসেছি।

তোমরা এই দেশের নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মশালটি এখন তোমাদের হাতে। তোমরা কর্মজীবনে কী করো, তার ওপর নির্ভর করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম। তাই তোমাদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে হবে। মনে রেখো, বড় স্বপ্ন না দেখলে বড় কিছু অর্জন করা যায় না।

এই দেশ তরুণদের দেশ। বায়ান্ন সালে তরুণরা এই দেশে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, রক্ত দিয়েছে, একাত্তরে সেই তরুণরাই মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধ করেছে, অকাতরে রক্ত দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি আমাদের এই তরুণরাই নিশ্চিত করেছে। আমাদের দেশটি এখন যখন পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে যাচ্ছে আবার সেই তরুণরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। তোমরা সেই তরুণদের প্রতিনিধি। তোমাদের দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই, আমি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।

তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখায় আমাকে নতুন একটি সুযোগ করে দেওয়ার জন্য!”

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সমাবর্তন বক্তব্য এটুকুই; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন নিয়ে দুটি কথা বলে শেষ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকে। আমরা যখন পাস করেছি তখন দেশের অবস্থা খুব খারাপ ছিল, সমাবর্তনের মতো বিলাসিতার কথা কেউ চিন্তা পর্যন্ত করেনি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম; কিন্তু নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন পাইনি। এখন আর দেশের সেই অবস্থা নেই, এখনো কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিতভাবে সমাবর্তন আয়োজন করে না। যেহেতু বেশ কয়েক বছর পর পর সমাবর্তন করা হয়, গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়, তাই আয়োজনটি অনেক জটিল হয়ে পড়ে। যদি প্রতিবছর সমাবর্তন করা হতো, তাহলে গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা এত বেশি হতো না, আয়োজনটিও হতো অনেক সহজ। যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর সমাবর্তন করতে পারে, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন পারবে না?

আমরা মনে করি, সমাবর্তন করা হয় গ্র্যাজুয়েটের জন্য, আসলে সেটি কিন্তু সত্যি নয়। একটি সমাবর্তন যেটুকু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য, ঠিক ততটুকু কিংবা তার চেয়ে বেশি তাদের মা-বাবা ও অভিভাবকদের জন্য। পৃথিবীর সব জায়গায় সমাবর্তনের বড় উৎসবটি করেন গ্র্যাজুয়েটদের অভিভাবকরা। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা সমাবর্তন উৎসবে ছেলে-মেয়েদের মা-বাবাদের সমাবর্তন প্যান্ডেলে ঢুকতে পর্যন্ত দিই না। যদি আমরা গ্র্যাজুয়েটদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মা-বাবাদের এই আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দিতাম, সেটি কী চমৎকার একটি ব্যাপার হতো!

লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট



মন্তব্য