kalerkantho


মশার যন্ত্রণায় নগরবাসী অতিষ্ঠ

ইসহাক খান

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মশার যন্ত্রণায় নগরবাসী অতিষ্ঠ

ধর্মীয় কিতাবে আছে, মহান প্রভু ১৮ হাজার মখলুকাত সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে ক্ষুদ্র একটি প্রাণী আছে, যার জন্ম নর্দমায়, বেড়ে ওঠা নর্দমায়, অদ্ভুত এই প্রাণী জীবনধারণের জন্য পান করে সবচেয়ে দামি জিনিস। মখলুকাত শ্রেষ্ঠ মানুষের রক্ত। এই প্রাণীর নাম মশা। ছোট্ট কীট। কিন্তু এই ছোট্ট কীটের আক্রমণে নগরবাসী অতিষ্ঠ। এই কীটের মধ্যে নারী কীটই ভয়ংকর। নারী কীটের কামড়ে ডেঙ্গু হয়, চিকুনগুনিয়া হয়। এতে মানুষের প্রাণ যায়। যারা বেঁচে থাকে তারাও অর্ধমৃত হয়ে বাঁচে।

ডেঙ্গু রোগটি বেশিদিনের পুরনো নয়। গত দুই দশক হবে আমরা এই রোগের সঙ্গে পরিচিত হই। আর চিকুনগুনিয়া রোগটি এবারই প্রথম আমাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি।

চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এই রোগ ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। সারা শরীর ব্যথা করে। পা মাটিতে ফেলা যায় না। এই ব্যথা দুই মাসও থাকে আবার তিন-চার মাস, এমনকি পাঁচ-ছয় মাসও থাকে। এমন ব্যথা যে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না, অসহনীয়। ফলে মশার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য অনেকে দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে তার ভেতরে বসে কাজ করে।

মানুষের চরম শত্রু এই মশা কিভাবে দমন করা যায় সে ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু আমাদের ব্যবস্থার মধ্যে আছে শুভংকরের ফাঁকি। আমরা মশা মারতে কামান দাগাতে চাই। সোজাভাবে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করলেই শত্রু নিধন হয়ে যায়। তা না করে আমরা বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার ওষুধ এনে সেগুলো ছিটাতে গিয়ে কত সমস্যায় পড়ছি তার ফিরিস্তি অনেক লম্বা।

নগরবাসীর অভিযোগ, মশার ওষুধ ক্রয়, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও স্প্রে, সংশ্লিষ্ট কমিটির মনিটরিং কমিটিসহ সব পর্যায়ে অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে। ফলে দুই করপোরেশনে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া অর্থ ব্যয় করেও আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘মশক নিধনের জন্য এবারের বাজেটে আমাদের অর্থ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এ কাজে কিছুটা সীমাবদ্ধ রয়েছে। যে পরিমাণ এলাকা বেড়েছে বা মশার উৎপত্তিস্থল যে হারে বেড়েছে, আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট সেভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না। মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য জনবল একেবারে কম। যাঁরা আছেন তাঁরা অনেকেই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তাঁদের পক্ষে পুরোপুরি কাজটি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর যুক্তি অগ্রহণীয়। খোঁড়া যুক্তি। সেই প্রবাদের মতো তাঁরা মশা মারতে কামান দাগাতে চান। মশার উৎপত্তিস্থল কেন ধ্বংস করা হচ্ছে না? এর জন্য যে জনবল থাকা দরকার সে জনবল কি সিটি করপোরেশনের নেই? কিন্তু তারা তো নগরের ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার করে না। সারা ঢাকা শহরে যত্রতত্র ময়লা। আর এসব ময়লা থেকে মশককুলের জন্ম। ধীরে ধীরে মশার অভয়ারণ্য হয়ে যাচ্ছে ঢাকা নগর। পরিণামে নগরের মানুষজন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া আতঙ্কে ভুগছে।

এদিকে বাজেট বেড়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১২ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা এবং উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১ কোটি থেকে বেড়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই করপোরেশনে আলাদাভাবে কচুরিপানা ও আগাছা পরিষ্কার, ফগারসহ অন্যান্য মেশিন সরবরাহের জন্য পৃথক অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর পরও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। একজন সাধারণ দোকানি বললেন, ‘ভাই, হবে না। কিচ্ছু হবে না। যারা মশার কয়েল এবং স্প্রে করার ওষুধ তৈরি করে, তারাই মশা নিধনে বড় বাধা। মশা নিধন হলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।’ এসব নিন্দুকদের কথা। কিন্তু এর মধ্যে কি কিছুই সত্যাসত্য নেই? বোধ করি কথাটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আমাদের স্বভাবে দাঁড়িয়েছে, নিজের স্বার্থে দেশ ধ্বংস করতে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। 

গত বছরের মাঝামাঝি ঢাকা মহানগরে মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ২৩টি এলাকাকে চিকুনগুনিয়ার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, মশক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কাজ হলো যেসব স্থানে মশা জন্ম নেয় সেগুলো ধ্বংস করা। কথাটা আগেও উল্লেখ করেছি, আবারও করলাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ মোতাবেক। তাঁরা মনে করেন এ কাজে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব বাজেটও রয়েছে। কিন্তু এ কাজ সঠিকভাবে করা হচ্ছে না বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত জলাশয় ও নর্দমা পরিষ্কার করার কথা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে সপ্তাহে চার দিন দুই শিফটে ৩২ জন ফগার মেশিন নিয়ে কর্মরত থাকার কথা। ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের সাত শর বেশি শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। কিন্তু মশক নিধন হচ্ছে না। রসিকজনরা বলেন, কামান দাগালে মশা মরবে না। এর জন্য যথাযথভাবে কাজ করতে হবে। সেটাই সিটি করপোরেশনের শ্রমিকরা করছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। মশার ওষুধ ক্রয়, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে স্প্রে করা পর্যন্ত তেমন কোনো মনিটরিং থাকে না। তাই তো হওয়ার কথা। আমরা সব ব্যাপারে উদাসীন। আমরা কেউ আমাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি না। শুধু অন্যের সমালোচনা করি। কারবারটা দেখেন, ওষুধের মান যাচাইয়ের জন্য সিটি করপোরেশনে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি রয়েছে। উচ্চপর্যায়ের কমিটি তারা এত উঁচুতে থাকে যে তাদের দৃষ্টিসীমায় এগুলো ধরা পড়ে না। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজের সঠিক তদারকির জন্য প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার [দ্বিতীয় গ্রেড] ওপর দায়িত্ব থাকলেও তাঁরা কখনো মাঠে যান না। এ জন্য তাঁদের কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। কী আরামের চাকরি। কারো কাছে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় না। 

লেখার শেষে অন্য রকম একটি তথ্য দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রামপুরার নাম রয়েছে। আমি রামপুরার বাসিন্দা না হলেও সেখানে আমাকে মাঝেমধ্যে যেতে হয়। সেখানে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার মাঝেমধ্যে কাজ থাকে। বিটিভির স্টুডিওতে যেখানে নাটকের শুটিং হয়, সেখানে আপনি এক মিনিট চুপচাপ বসে থাকতে পারবেন না। কোটি কোটি মশা মিছিল করে এসে আপনাকে আক্রমণ করবে। শুধু যে স্টুডিওতে, তা কিন্তু নয়। গোটা টেলিভিশন ভবনেই মশার অবাধ বিচরণ। আমি মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভেবেছি, সেন্ট্রাল এসি করা ভবনে মশারা ঢোকে কিভাবে? আমি একজন কর্মকর্তাকে মজা করে বলেছিলাম, ভাই, আপনারা মশাদের লালন-পালন করেন নাকি? উনি বিস্ময়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, জরিপ করলে দেখা যাবে, সারা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মশা বিটিভিতে। উনিও মজা করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মশারা অভিজাত। তারা অভিজাতদের রক্ত পান করে। কারণ এখানে যেসব শিল্পী, লেখক, অভিনেতা-অভিনেত্রী আসেন, তাঁরা অভিজাত শ্রেণির। ওরা অভিজাতের রক্ত খেয়ে মজা পায়। তাই ওরা এই ভবন থেকে যায় না।’

ব্যাপারটি হাস্যরসের হলেও মোটেও এটা হাসির কোনো ব্যাপার নয়। ভোটের আগে প্রার্থীরা জনগণের কাছে তাঁদের সেবা করার সুযোগ চান। এখন সুযোগ পেয়ে তাঁদের চেহারা দেখা যায় না। উত্তরের মেয়র মারা গেছেন। তাঁর কাজ নিয়ে বলার কিছু নেই। দক্ষিণে যিনি আছেন এবং সব কাউন্সিলর তো আছেন, তাঁরাও ভোটের আগে জনগণের কাছে সেবা করার সুযোগ চেয়েছেন। আমরা আপনাদের সেই অমূল্য সুযোগ দিয়েছি। এখন আপনারা সেবা করেন। না হলে আগামী দিনে ভোটের জন্য এলে তখন জনগণ যদি উল্টোটি দেখায়। তখন আপনাদের কেমন লাগবে, সেই কথাটা বেশি করে ভাববেন।   

 

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার



মন্তব্য