kalerkantho


সরকারি চিকিৎসক ও জনগণের সুচিকিৎসা

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সরকারি চিকিৎসক ও জনগণের সুচিকিৎসা

২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডাক্তার ধরে রাখার জন্য এমপিদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তার আগে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ জনগণকে সেবা দিতে সব চিকিৎসকে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ২৯ ডিসেম্বর (২০১৭) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাতটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অ্যাম্বুল্যান্সের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে থেকে যথাযথভাবে মানুষকে সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় তাঁরা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন। সরকারি চিকিৎসকদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের নির্দেশের মাধ্যমে মফস্বল পর্যায়ে চিকিৎসকদের থাকতে না চাওয়ার প্রবণতার বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট  ধারণা পাওয়া যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকায় অবস্থানরত বেশির ভাগ চিকিৎসকই সাধারণত ঢাকার বাইরের জেলায় কাজ করতে চান না। আর এমন অভিযোগ বেশ প্রবল এবং এ ধরনের অভিযোগ অনেক আগে থেকেই উত্থাপিত হয়ে আসছে। অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁরা প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর রাজধানীতে কাজ করছেন। আবার অনেক চিকিৎসকই বাইরের জেলা থেকে ঢাকায় আসতে আদা-জল খেয়ে চেষ্টা-তদবির করেন। আর এ কারণেই রাজধানী ঢাকা যেন ডাক্তারদের যানজটে পরিণত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ঢাকার বাইরে কাজ করতে পারেন, তাহলে ডাক্তাররা পারবেন না কেন? কী কারণে সরকারি চিকিৎসকরা ঢাকার বাইরের জেলায় কাজ করতে চান না কিংবা কী কারণে তাঁরা ঢাকায় থাকার ব্যাপারে এতটা মরিয়া, তা বুঝতে বোধ হয় কারো বাকি থাকার কথা নয়। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নিয়ে যাঁরা আন্দোলন করেন তাঁদের অভিযোগ হচ্ছে, বড় শহরগুলোর বাইরে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ কম থাকায় চিকিৎসকরা সেদিকে যেতে অনাগ্রহী। গত ২৭ ডিসেম্বর (২০১৭) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঢাকায় কর্মরত ১১০ জন চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বদলি করেছে। বদলির আদেশে বলা হয়েছে, ডাক্তাররা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাঁরা কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না। কিন্তু অনেক ডাক্তার এখনো নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। বরং অনেক ডাক্তার প্রভাব খাটিয়ে বদলির আদেশ ঠেকাতে তত্পর।

রাষ্ট্রের কাছে জনগণের অন্যতম চাহিদার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। আর স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। আর এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এ দেশের জনগণকে কম হয়রানির শিকার হতে হয় না। বিশেষ করে জনগণ যদি যান কোনো সরকারি হাসপাতালে। এ দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি আজ আর কোনো নতুন বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এসংক্রান্ত নানা খবর। মফস্বল পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা, হাসপাতালের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব, ডাক্তার সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি গায়েব করা, বেশি অর্থের লোভে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে চিকিৎসকদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখতে বেশি মনোযোগী ও যত্নবান হওয়া, সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাব, ভুল চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর এসব খবরের মধ্যে চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার ফলে রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যু হওয়া সবচেয়ে দুঃখজনক। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে বা আঘাত পেলে তার জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটা বা ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে এ দেশে আইনের তেমন একটা প্রসার ঘটেনি। তা ছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিও খুব কম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে অনেক মামলা হয়েছে। ‘কনজিউমার প্রোটেকশন অ্যাক্ট (১৯৮৬)’-এর আওতায় চিকিৎসকের অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা কনজিউমার আদালতে গিয়ে কোনো প্রকার ফি ছাড়াই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারেন এবং অনেক রোগী এ বিষয়ে প্রতিকারও পেয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো আইন নেই। যেহেতু এ দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অহরহই চিকিৎসকের অবহেলার ঘটনা ঘটছে, ফলে এ ধরনের একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। কোনো চিকিৎসকের অবহেলার কারণে যদি ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অন্য চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে সজাগ হবেন, চিকিৎসার সময় যথাযথ মনোযোগ  দেবেন, যত্নবান হবেন।

বর্তমান সরকার সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা অগ্রণী ও অপরিসীম। কারণ চিকিৎসকদের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা যদি শুধু ঢাকামুখী হন কিংবা ঢাকায়ই থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠেন, তাহলে সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নসহ সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী এর আগেও অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। কিন্তু তেমন একটা লাভ হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। ফলে সার্বিক দিক বিবেচনায় এমন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চিকিৎসকরা গ্রামীণ এলাকায় থেকে কাজ করতে বাধ্য হন। আর বাস্তবিক অবস্থা বিবেচনায় এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়নসহ তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের মনমানসিকতার ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন। প্রয়োজন বেশি অর্থের লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করা; প্রয়োজন দায়িত্ব-কর্তব্যে আন্তরিক ও সতর্ক হওয়া। কারণ চিকিৎসা একটি মহান পেশা, সেবামূলক পেশা। চিকিৎসকরা যদি ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থলোভ পরিহার করতে না পারেন, তাহলে কোনো সতর্কবাণী কিংবা কোনো নির্দেশই কাজে আসবে বলে মনে হয় না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

kekbabu@yahoo.com

 


মন্তব্য