kalerkantho


২০১৮ সালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ড. কানন পুরকায়স্থ

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



২০১৮ সালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

আমরা যখন ভবিষ্যদ্বাণী করি তখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই। ব্যবস্থাপনার একজন বিশেষজ্ঞ পিটার ড্রুকার (Petor Drucker) একবার বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলা মানে হচ্ছে, গাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে অন্ধকারে গাড়ি চালানো।’ অর্থাৎ অতীতের দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে আমাদের বর্তমানও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইঙ্গিত বহন করে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের ভাষায়, ‘আমাদের বর্তমান হচ্ছে ভবিষ্যতের গর্ভাবস্থা।’ সুতরাং অতীত ও বর্তমানের আলোকে ২০১৮ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উন্নয়ন সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করা হবে।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যথাযথ ওষুধ (Precision Medicine) ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে একজন রোগীর জিনেটিক প্রফাইল, তার পরিবেশ ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে জেনে ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা। এই পদ্ধতিতে ওষুধ কম ক্ষতিকারক ও বেশি কার্যকর হয়। ২০১৮ সালে আমরা এ বিষয়ে আরো অগ্রগতি লক্ষ করব।

জিনেটিক বা প্রজনন বিজ্ঞান একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে, যাকে বলা হয় CRISPR। এই পদ্ধতির দ্বারা আমাদের জিনোম থেকে কোনো জিনকে অপসারণ অথবা মেরামত করা সম্ভব। তা ছাড়া এই প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো ওষুধ প্রতিরোধক ব্যাকটেরিয়াকে অন্য ব্যাকটেরিয়া দ্বারা নির্মূল করা সম্ভব। পারকিনসন, আলঝাইমার ও অন্যান্য স্নায়বিক রোগের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সহায়ক হবে। ২০১৮ সালে আমরা এই পদ্ধতির আরো উন্নয়ন লক্ষ করব। তবে এ বছর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কাজু ইশিগুরো তাঁর নোবেল বক্তৃতায় উল্লেখ করেন যে ‘নতুন জিনেটিক প্রযুক্তি যেমন জিন সংশোধনকারী প্রযুক্তি CRISPR আমাদের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে প্রভূত সহায়তা প্রদান করবে কিন্তু এই প্রযুক্তি আমাদের জাতিবিদ্বেষী হয়ে উঠতেও সাহায্য করতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নাসা সংশ্লেষিত জীববিদ্যার (Synthetic Biology) নানা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। এর একটি হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে নভোচারীদের দেহকোষে অক্সিজেন উৎপাদন করা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে মহাকাশে বিকিরণের হাত থেকে নভোচারীদের রক্ষা করার জন্য কৃত্রিম উপায়ে সাইটোকিন নামের একধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করা, যা ডিএনএকে বিকিরণের হাত থেকে রক্ষা করে।

জলবায়ু সুরক্ষায় সংশ্লেষিত জীববিদ্যার প্রয়োগ আশাপ্রদ। জে ক্রেইজ ভিস্টার ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা একধরনের শৈবাল (Algae) তৈরি করেছেন, যা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। এই শোষিত কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব। এই প্রযুক্তির আরো উন্নয়ন আমরা লক্ষ করব ২০১৮ সালে। তবে সংশ্লেষিত জীবাণুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

কৃত্রিম বোধশক্তির (Artificial Intelligence) ক্ষেত্রে আমরা এর বহুবিদ প্রয়োগ লক্ষ করব ২০১৮ সালে। বিশেষ করে আমাদের পারিবারিক দৈনন্দিন কাজে রোবটের ব্যবহার, যেমন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রোবট বয়স্ক লোকজনদের দেখাশোনা অথবা শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে। মিলিটারিদের প্রয়োজনে রোবটের নানাবিধ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিকসের (আইএফআর) এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ৪.৭ মিলিয়ন রোবট বিক্রয় হয়। আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে এই বিক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪২ মিলিয়ন। সুতরাং রোবটকে কিভাবে একটি নিয়ম-নীতির মধ্যে আনা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ওপর যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা হ্রাস করার লক্ষ্যে রোবট প্রযুক্তির ব্যবহার আশাপ্রদ। উদাহরণস্বরূপ রোবট সাবমেরিন সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। রোবট প্রযুক্তি প্রবাল প্রাচীরের (Coral Reef) ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে পারে। এ ধরনের রোবটকে বলা হয় ‘করালবট’ (Coralbot)। আমাদের পরিবেশে কোনো রাসায়নিক পদার্থের নির্গমন হলে রোবট তা খুঁজে বের করতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে আন্তর্মহাদেশীয় পাইপলাইনে কোনো রাসায়নিক বা গ্যাসীয় পদার্থের নির্গমনকে রোবট প্রযুক্তির সাহায্যে চিহ্নিত করা সম্ভব।

কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশাপ্রদ। কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং বর্তমানে ব্যবহৃত ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এই যে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ্যকে কোয়ান্টাম বিটে কোড করা হয় ০ ও ১-এর উপরি প্রয়োগের (superpose) মাধ্যমে। কিন্তু ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারে তথ্যকে ০ অথবা ১ ব্যবহার করে কোড করা হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষমতা হবে অপরিসীম, বর্তমানে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের যুগে একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে কোনো একটি স্থানে বসিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থান থেকে জটিল গণনার কাজ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

২০১৮ সালে আমরা প্রযুক্তির বেশ কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন লক্ষ করব। যেমন—সৌরশক্তি ব্যবহার করে বাতাস থেকে জলীয়বাষ্প শোধন করে তা পানীয়জল হিসেবে ব্যবহার, কৃত্রিম উপায়ে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করা ও ডাটা উপাত্তের উন্নত কলাকৌশল প্রয়োগ করে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং অপচয় রোধ করা।

আমরা এখন তথ্যের আধিক্য, সময়ের স্বল্পতা ও প্রযুক্তির বিস্তার—এই ত্রিবিধ সমস্যায় ভুগছি। ট্রাফিক গ্রিডলকের মতো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলছে একধরনের গ্রিডলক। সময় আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমাদের শরীরের চতুর্দিকে চর্বি যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে বাড়ছে তথ্য ও প্রযুক্তি। আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করছি, কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চিন্তা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বৈদ্যুতিক গাড়িকে এখন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহার করার চিন্তা করা হচ্ছে লন্ডন শহরে। কিন্তু এই প্রযুক্তি ১৮৩৭ সালে রবার্ট ডেভিডসন নামের এক রসায়নবিদ ইংল্যান্ডে আবিষ্কার করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈদ্যুতিক গাড়ির বহর লক্ষ করা যায় লন্ডনের রাস্তায়। এই গাড়ির শব্দ একধরনের পাখির শব্দের মতো ছিল বলে তাদের বলা হতো ‘Hummingbirds’। ওই সময় ঘোড়ার গাড়ি ইংল্যান্ডের রাস্তায় চলত এবং যা অনেক সময় ট্রাফিক যানজটের সৃষ্টি করত। কিন্তু ঘোড়ার গাড়ির চালকরা এই বৈদ্যুতিক গাড়ির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠল এবং একপর্যায়ে ইলেকট্রিক ক্যাব কম্পানি তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলো। তারপর হেনরি ফোর্ড কম্পানি বৈদ্যুতিক গাড়ির অর্ধেক দামে গ্যাসোলিনের গাড়ি বাজারজাত করতে শুরু করল। এভাবেই আস্তে আস্তে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ইংল্যান্ডের রাস্তাঘাটে কমে গেল।

ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, ‘সৈন্যবাহিনীকে প্রতিহত করা যায়, কিন্তু কোনো ধারণা বা idea-কে প্রতিহত করা যায় না। একটি নতুন ধারণার জন্ম সমাজের চাহিদা অনুযায়ী হতে পারে, আবার সেই ধারণা আর্থিক ও রাজনৈতিক কারণে বিলুপ্ত হতে পারে। তবে ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ সব সময় থাকে। কারণ আমরা তো আমাদের বাকি জীবন ভবিষ্যতেই কাটাব। বিজ্ঞানী হেনরি পয়েনকার (Henri Poincare) তাঁর (The Foundation of Science) গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে ‘আমরা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত না হলেও আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী করা উচিত।’ বস্তুত এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটি অংশ। ২০১৮ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জন্য কল্যাণকর হোক—এই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : যুক্তরাজ্যে কর্মরত পরিবেশ বিষয়ক অ্যাডভাইজার ও খণ্ডকালীন অধ্যাপক



মন্তব্য