kalerkantho


আতঙ্কের নাম ৫৭ ধারা!

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

৮ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



আচ্ছা, একটু কল্পনা করুন তো। ব্লগে গণবিরোধী কাজের জন্য সরকারকে ইচ্ছামতো তুলাধোনা করলেন, অথচ পরদিন হাতকড়া পরলেন না। ফেসবুকে কোনো নেতার দেশবিরোধী কাজের সমালোচনা করে ব্যঙ্গাত্মক স্ট্যাটাস দিলেন, অথচ গলায় মামলা ঝুলল না। অনলাইনে হঠকারী কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো মন্ত্রীর কার্টুন পোস্ট করলেন, অথচ কেউ তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনল না। বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মত প্রকাশের এতটুকু স্বাধীনতা উপভোগ কি বাংলাদেশে সম্ভব? এক প্রবীর সিকদারই তো তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ফেসবুকে এলজিআরডি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুই লাইনের স্ট্যাটাস দিয়ে বেচারা পাঁচ দিন হাজত খাটলেন। চোর-ডাকাতের মতো হাতকড়া পরলেন। বাঁধা চোখে থানায় পুলিশের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলেন। রাতের আঁধারে কড়া পুলিশ প্রহরায় ঢাকা থেকে ফরিদপুর। তারপর তথ্য-প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারায় মামলা। ২৪ ঘণ্টার মাথায় তিন দিনের রিমান্ড আর জামিন নামঞ্জুর। পরে সরকারের গ্রিন সিগন্যালে জামিন পেলেও ১৪ বছর জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানার ওই অজামিনযোগ্য মামলাটি কাঁটার মতো এখনো গায়ে বিঁধে আছে। আর ৫৭ ধারায় হেনস্তার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটল কয়েক দিন আগে। ৩১ জুলাই ফেসবুকে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের বিতরণ করা একটি ছাগলের মৃত্যুর খবর শেয়ার করে মন্ত্রীর মানহানির অভিযোগে রাতের আঁধারে গ্রেপ্তার হলেন খুলনার সাংবাদিক আবদুল লতিফ মোড়ল। এভাবে, বিশেষত ২০১৩ সালের সংশোধনীর পর কতজন যে ওই বিতর্কিত ৫৭ ধারার শিকার, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। 

তথ্য-প্রযুক্তি আইনে এ পর্যন্ত কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানের সূত্র ধরে একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ছয় মাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুুক্তির ৩৯১টি মামলা হয়। এর বেশির ভাগ ৫৭ ধারায়। তাতে আসামি ৭৮৫ জন, গ্রেপ্তার ৩১৩ জন। তন্মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়েছে ১৯টি মামলা।

তবে ‘বিভিন্ন অস্পষ্টতায় দুষ্ট’ ৫৭ ধারার যে ধরনের নির্বিচার অপপ্রয়োগ হচ্ছে, তাতে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন’টি কার্যত ‘সরকার অবমাননা আইনে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। সুনির্দিষ্টভাবে বললে আইনটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ‘লেসে মাজেস্টি’ (রাজা বা রাষ্ট্রের মর্যাদার হানি ঘটানো) চালুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মূলত রাজতন্ত্রের একটা নীতি। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন রাজতন্ত্রে ‘লেসে মাজেস্টি’ দণ্ডযোগ্য অপরাধ। থাইল্যান্ডে এই আইনে মহামারি আকারে মামলা হতে থাকলে একসময় থাই রাজা ভূমিবল বাধ্য হয়ে বললেন, ‘অবশ্যই আমার সমালোচনা করা যাবে। কারণ রাজাও তো ভুল করতে পারেন।’ আর আমাদের দেশে সরকারপ্রধানদের এরূপ উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টান্ত তো নেই, উল্টো আইনটি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে ৫৪ ধারা জনপ্রিয় বিকল্প হয়ে উঠছে। কারণ হালে সমালোচনামাত্রই ওই ৫৭ ধারার ছোবলে পড়ছে। 

ওয়েবসাইটে ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মানহানি ও ভাবমূর্তিহানি বিষয়ক ৫৭ ধারাটি মূলত ভারতীয় তথ্য-প্রযুক্তি আইন, ২০০০ (২০০৮ সালে সংশোধিত)-এর ৬৬ক ও ৬৭ ধারার বাংলাদেশি সংস্করণ। ‘পিতৃ’ আইনে সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড। অথচ ‘বৎস’ আইনে তা ১৪ বছর!

ভারতেও এই আইনের প্রচুর অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং টুইটারে মন্তব্যের জন্য এই আইনে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়। যেমন—১৭ মার্চ ২০১৫ উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ফেসবুকে প্রতিমন্ত্রী আযম খানের বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় এক কিশোরকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে অবশ্য জামিনে মুক্তি পায় ছেলেটি। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কার্টুন বন্ধুকে ই-মেইলের অভিযোগে অম্বিকেশ মুখোপাধ্যায় নামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক গ্রেপ্তার হন। ওই বছর অক্টোবর মাসে টুইটারে ভারতের তখনকার অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের ছেলে কার্তি চিদাম্বরমের সমালোচনার অভিযোগে এক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ায় গোয়ার এক যুবককে পুলিশ তলব করে।  পরে ক্ষমা চেয়ে ও স্ট্যাটাসটি মুছে দিয়ে  যুবকটি কোনো রকমে পার পায়। একই প্রক্রিয়ায় ফেসবুকে মোলায়ম সিং যাদব ও অখিলেশ যাদবের ‘আপত্তিকর ছবি’ প্রকাশের দায়ে গ্রেপ্তার হন এক পর্যটন কর্মকর্তা। এভাবে অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতোই ছড়াচ্ছিল ওই আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা।

অবশেষে ভারতবাসী ওই রাহুর গ্রাস থেকে মুক্তি পেল। ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশি ৫৭ ধারার সমতুল্য ভারতীয় তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৬৬ক ধারা বাতিল ঘোষণা করেছেন। ওই ধারাকে অসাংবিধানিক ও ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে আদালত বলেন, তা কোনো অর্থে ১৯(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের মধ্যে পড়ে না।’

আদালতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইন্টারনেটের প্রভাব ব্যাপক। তাই টেলিভিশন ও মুদ্রণ মাধ্যমের চেয়ে এর ব্যবহারে অনেক বেশি বিধিনিষেধ থাকা উচিত। এই দুই মাধ্যমের মতো ইন্টারনেট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র থেকে পরিচালিত হয় না। তাই এর পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণ দরকার।

কিন্তু আদালত রাষ্ট্রপক্ষের এই যুক্তি বাতিল করে দিয়ে বলেন, ৬৬ক ধারাটি গণতন্ত্রের দুই শক্তিশালী স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী। এতে জনগণের তথ্য জানার অধিকার সরাসরি বাধাগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া ধারাটি পরিষ্কার নয়। তাই পুলিশ এর অপব্যবহার করেছে। আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের জন্য তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারাবলে ভারতীয় পুলিশ নিরীহ মানুষকে সরাসরি গ্রেপ্তার ও হয়রানি করতে পারত। আদালত ওই ধারা শিথিল করে এবং সরাসরি গ্রেপ্তার নিষিদ্ধ করে। কারো সম্পর্কে শিষ্টাচারবহির্ভূত বিবৃতি বা মন্তব্য বা টেলিফোন কল বা মেসেজ বা মেইলের জন্য কেরালা পুলিশ আইনের ১১৮(ঘ) ধারায় সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ১০ হাজার রুপি জরিমানার বিধানও আগে ছিল। রায়ে আদালত ওই ধারাও বাতিল করেন (টাইমস অব ইন্ডিয়া)। এ রায়কে বিখ্যাত ভারতীয় দৈনিক ‘হিন্দু’ ‘একটি উত্ধপড়হরধহ (অতিশয় কঠোর ও নির্মম) বিধানের হাত থেকে মুক্তি’ বলে মন্তব্য করে।

আর আমরা এখনো ওই Draconian বিধান মহাসমারোহে বয়ে বেড়াচ্ছি। বক্তৃতা-বিবৃতি, প্রতিবাদ, মিছিল-মিটিং, লেখালেখি—তথ্য-প্রযুক্তি ও যোগাযোগ আইনের ধারাটি বাতিলের জন্য গত চার বছরে কত কিছুই হলো! সরকার তার পরও যক্ষের ধনের মতো ওই ধারা আগলে রেখেছে। আর জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ভারতের মতো আমরাও কি ৫৭ ধারাসহ বিতর্কিত, জনস্বার্থবিরোধী ও হয়রানিমূলক ধারাগুলোর রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারি না? 

 

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib2@gmail.com



মন্তব্য