kalerkantho


রাজনীতিবিদদের কথার ধরন বদলাতে হবে

বিমল সরকার

১৭ জুন, ২০১৭ ০০:০০



রাজনীতিবিদদের কথার ধরন বদলাতে হবে

ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে নিজের বা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ উদ্ধার কিংবা রক্ষা করার জন্য আমাদের দেশের রাজনীতিকরা কী করতে পারেন আর কী না করতে পারেন, তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ও একবার কোনো রকমে ক্ষমতায় যেতে পারলে তা ধরে রাখার জন্য যেকোনো উপায় অবলম্বন করা তাঁদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলতে গেলে সবার ক্ষেত্রে কথাটি কমবেশি প্রযোজ্য।

১৯৮৬ সালে গঠিত জাতীয় সংসদ মাত্র দেড় বছর যেতে না যেতেই ভেঙে দেওয়ার পর এইচ এম এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাতে হাত আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্বার আন্দোলন চালিয়ে যায়। তাদের যুগপৎ আন্দোলন আর প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও এরশাদ সরকার ১৯৮৮ সালে আবার সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ওই নির্বাচন ঘিরে সৃষ্টি হয় গভীর রাজনৈতিক সংকটের। দেশব্যাপী চরম অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্যের ফলে সবার একেবারে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। আট দলীয় জোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ঘোষণা দেয় নির্বাচনে যাবে না। একইভাবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোটেরও একই সিদ্ধান্ত। এ দুই জোটের বাইরে বাম আরো পাঁচটি দল সিদ্ধান্ত নেয় তারাও যাবে না নির্বাচনে। তিনটি জোট বা মোর্চাভুক্ত প্রধান সব দল নির্বাচন বর্জন করলে এটি যে একটি প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত হবে ক্ষমতার বলয়ে থেকে এ কঠিন সত্যটি উপলব্ধি করতে সেদিন নীতিনির্ধারকরা চরমভাবে ব্যর্থ হন।

ফলে ২২ দলের বর্জন ও একই সঙ্গে প্রতিহত করার ঘোষণা সত্ত্বেও চতুর্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকার অটল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মাত্রা বেড়ে যায়। রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। দেশজুড়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা বিস্তৃত হতে থাকে। বিরোধী দলগুলোর প্রবল বাধা ও প্রতিরোধের মধ্যেই অতি উৎসাহীরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য অনেকটা সঙ্গোপনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে থাকেন। অনেক স্থানে প্রার্থীদের নানাভাবে নাজেহাল করা হয়। একজন প্রার্থীকে তো একেবারে খুনই করে ফেলা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী আর কোনো প্রার্থী না থাকায় ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির ১৮ জনকে নির্বাচনের আগেই নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়। অবশেষে বিরোধী দলগুলোর ডাকা ৩৬ ঘণ্টা লাগাতার হরতালের মধ্যে ৩ মার্চ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনের দিন ব্যাপক সহিংসতায় ১২টি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে। নির্বাচনের আগে-পিছে আহত হয় সহস্রাধিক ব্যক্তি। গ্রেপ্তার করা হয় গণহারে। নির্বাচনের পরপরই সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিংবা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে যাঁর যাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা নেতা-নেত্রীদের দু-একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। আট দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘জনগণ এই নির্বাচনে ভোট দেয়নি। সরকারের উচিত অবিলম্বে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া...। ’ সাত দলীয় জোটনেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে...। ’ অন্যদিকে নির্বাচনোত্তর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত উপপ্রধানমন্ত্রী ডা. আব্দুল মতিন বলেছিলেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ’ দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত ভোটারবিহীন ওই নির্বাচনের দুই দিন পর খোদ রাষ্ট্রপতি এরশাদও মন্তব্য করেন, ‘জনগণ নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। ’

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেও বলতে গেলে একই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও তামাশা কম হয়নি। তিন দফা তফসিল পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচনটি। এ সময় অন্য দল বা স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী না দাঁড়ানোয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ৪৮টিতেই ক্ষমতাসীন বিএনপি দলীয় প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই সারা দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। সরকার ও বিরোধী পক্ষ একেবারে মারমুখো হওয়ায় জনজীবনে দেখা দেয় চরম অনিশ্চয়তা।

আশির দশকে এরশাদের অধীন অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংসদ নির্বাচন ও নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার আমলে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের দুঃসহ সব স্মৃতি বোধ করি দেশবাসীর মন থেকে মুছে যায়নি। ভুলে যায়নি কেউ ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির ঘোষিত নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির কথাও (যা পরে অনুষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮)। আর দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি ও কর্মকাণ্ড তো সেদিনের কথা। মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য! নির্বাচন কমিশনে ৪১টি দল নিবন্ধিত থাকলেও দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় মাত্র ১২টি দল।   তা-ও আবার বেশির ভাগই নাম ও প্যাডসর্বস্ব। মোট প্রার্থী ৫৪৩ জন; ইতিহাসে সর্বনিম্ন (নবম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিল এক হাজার ৫৬৭ জন)। জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকে সংসদ নির্বাচন নিয়ে যা যা বলেছেন বা বলছেন কিংবা করেছেন বা করছেন, বিরোধী দলে থেকেও তাঁরা সবাই মোটামুটি একই বয়ান শুনিয়েছেন বা শোনাচ্ছেন। কমবেশি করে তাঁরা সবাই সংবিধানের পাঠ শেখান। স্বাধীনতার পর কয়েকটি বছর যেতে না যেতেই, বিশেষ করে আশির দশক থেকে উচ্চাভিলাষী রাজনীতিকরা সংবিধানের এ ধরনের ‘পাঠ’ আমাদের জাতীয় নির্বাচনের ‘সিলেবাসে’ অন্তর্ভুক্ত করেন। একেকটি সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওই ‘পাঠদানের’ জন্য তাঁরা সদলবলে একেবারে উঠেপড়ে লেগে যান। জানি না কথিত ওই সিলেবাসের পাঠদান কবে নাগাদ শেষ করতে পারবেন আমাদের রাজনীতিকরা।

কার নিন্দা করব? গর্বই বা কাকে নিয়ে করব? এ যেন আমাদের ললাট লিখন। জানি না কবে নাগাদ পূরণ হবে সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা। সব শেষে বঙ্কিমচন্দ্রকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি : ‘তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন। ’ চলুন, আমরা সবাই উত্তম হই। দেশে-বিদেশে অনেক নিন্দা কুড়িয়েছি। চলুন, আবার আমরা মানুষ হই।   

 

লেখক : কলেজ শিক্ষক।


মন্তব্য