kalerkantho


শিক্ষা প্রসারের মোড়কে শিক্ষাশূন্যতা

গোলাম কবির

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষা প্রসারের মোড়কে শিক্ষাশূন্যতা

গত শতকের মাঝামাঝি সদ্যবিভক্ত পূর্ববাংলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল ছিল। অনেক থানায় হাই স্কুল ছিল না। আর কলেজ? কয়েকটি ব্যতিক্রমী থানা ছাড়া অনেক মহকুমাতেও কলেজ গড়ে ওঠেনি। পাঁচের দশকের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। তবে রাজশাহী কলেজ, ঢাকা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, বিএম কলেজ, বিএল কলেজ, কারমাইকেল কলেজ, এডওয়ার্ড কলেজ থেকে তখনকার দিনে যেসব স্নাতক কর্মস্থলে আসতেন তাঁদের অধিকাংশই যথার্থ শিক্ষিত ছিলেন।

দেশভাগের ডামাডোলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশান্তরিত হয়। ফলে নিজেদের গরজেই এ দেশের মানুষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় উদ্যোগ নেয়। থানা ও প্রত্যন্ত গ্রামে কিছু কিছু স্কুল-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। লেখা বাহুল্য, তখন থেকেই শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি আভাসিত হতে থাকে। দেশ স্বাধীন হলে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ধুম পড়ে যায়। আটের দশকের পর কোনো কোনো থানায় হালি হালি কলেজ গজিয়ে ওঠে।

তখনকার সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য যত্রতত্র কলেজ জাতীয়করণ করতে থাকে। মুফতে সরকারি হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সদ্য পাস করা তরুণরা সংঘবদ্ধ হয়ে কলেজ গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা শুরু করে। নিদেনপক্ষে সরকারি না হলেও এমপিওভুক্ত হলে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা একেবারে নগণ্য নয়, সে বিশ্বাস সামনে রেখে।

নব্বইয়ের দশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তিত হলে সনদপ্রাপ্ত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একই সময়ে ব্যক্তিমালিকানায় ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে জ্যামিতিক হারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠদানের মোড়কে সনদ বিক্রির স্বাধীনতা পেয়ে যায়। চলতে থাকে রমরমা ব্যবসা। পরিতাপের বিষয়, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোথাও কোনো লেখাপড়া হয় না। উচ্চাভিলাষীরা সনদ কিনে দুয়ারে দুয়ারে কর্মসংস্থানের উমেদার হয়।

আজকের দিনের অধিকাংশ সনদধারী যথাযথ শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। এদের অনেকে সুলভ চাকরি হিসেবে শিক্ষা বিভাগে ঠাঁই পাচ্ছে। ফলে চারপাশে দৃষ্টিকটুভাবে স্পষ্ট হচ্ছে শিক্ষাশূন্যতার ছাপ। কোচিংকেন্দ্র, ব্যক্তিমালিকানার বিশ্ববিদ্যালয়ের লিফলেট, বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ইত্যাদিতে অশুদ্ধ বাক্য আর বানান ভুলের ছড়াছড়ি। আমাদের মনে হয়, এই অধোগামিতার মূল কারণ হলো শিক্ষার আকণ্ঠ দুর্বলতা। জাতিকে এমন বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিয়ে শিক্ষাশূন্যতার কবলে নিপতিত করার নেপথ্য কারিগরদের সনদ বিক্রির স্বাধীনতা রোধ করা বোধ করি সময়ের দাবি।

দেশে শিক্ষাশূন্যতার ব্যাপকতায় সংশ্লিষ্টজন আতঙ্কিত। এ অবস্থা চলতে থাকলে এমন সময় আসবে যখন দেশের জন্য যোগ্য কর্মকর্তা-শিক্ষক বাছাই করার মতো শিক্ষিত মানুষ পাওয়া কঠিন হবে। দেশ চালানোর জন্য যথাযথ উচ্চশিক্ষিত লোকবল যতজন প্রয়োজন, সেদিকে দৃষ্টি রেখে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত রাখা বাঞ্ছনীয়। সবাই পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে অথবা তার মান অর্জন করতে পারবে না—এটা সমীচীন নয়। সুতরাং সবার জন্য সব কিছু উন্মুক্ত থাকলে শেষ পর্যন্ত কোনোটাই মানসম্পন্ন হবে না তা স্বতঃসিদ্ধ।

ইতিহাস বলে একদা নিমজ্জমান ফ্রান্সকে রক্ষা করেছিল, যারা প্রচলিত লেখাপড়া করেনি বা করতে চায়নি তারা। এখানে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। ফ্রান্স ওয়াজ সেভড্ বাই হার আইডিলায়। আমরা শঙ্কিত, বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিকে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এসব শিক্ষাশূন্য সনদধারীরা নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবে।

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বসতে পেয়ে এখন শোয়ার দাবিদাওয়া তুলছেন। তাঁরা আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে শিষ্টাচার জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। এটা যেমন কাম্য নয়, তেমনি ব্যক্তিমালিকানায় গজিয়ে ওঠা জবাবদিহিহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক-শিক্ষকরা সনদ বিক্রি করাকেই বড় করে দেখেন। তাঁরা অনেকটা স্বার্থান্ধ। অভিভাবকরা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সেদিকে নজর দেওয়ার সময় কারো নেই।

আমাদের শিক্ষার সংস্কৃতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের চেয়ে সনদ পাওয়াকেই শ্লাঘনীয় ভাবে। আমরা লক্ষ করছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছু নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অধিভুক্ত করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে। পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয় নিজের হাতে রাখছে। এটা খারাপ উদ্যোগ নয়, কিন্তু শিক্ষার্থী মিলছে না। কারণ এখানে টাকা দিয়ে সনদ পাওয়া কঠিন।

সনদ বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সন্তানদের মেধা ও মনন ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কাজেই কালবিলম্ব না করে শিক্ষা প্রসারের মোড়কে গড়ে ওঠা শিক্ষাশূন্যতার দিকে ধাবমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সনদ বিক্রির স্বাধীনতার রাশ টেনে ধরার জন্য কালবিলম্ব না করাই বোধ হয় সমীচীন।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ


মন্তব্য