kalerkantho


জয়ী হয়েছে মধ্যবিত্তের ব্যক্তিবাদ

জয়া ফারহানা

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশে কোনটি দুর্ঘটনা আর কোনটি হত্যাকাণ্ড সেটি নির্ধারণ করা এখন বেশ ধন্দের বিষয়। ১২ মার্চ মালিবাগে উড়াল সড়কে ৯৮ টনের গার্ডার পড়ে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাটিকে নিশ্চয়ই আপনি দুর্ঘটনা বলবেন না।

কারণ এরই মধ্যে আপনি জেনে গেছেন, এই ফ্লাইওভারটি নির্মাণের সময় দেশি বা আন্তর্জাতিক কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। বছরের পর বছর খোলা জায়গায় এই মহাযজ্ঞ চলেছে ও অনিয়ম আর অব্যবস্থাজনিত কারণে এখানে মানুষ মরছেই। গত বছরের মার্চেও এখানে রডের আঘাতে আরেক শ্রমিক হত্যা হয়েছে। প্রকল্প এলাকার আওতাভুক্ত কোনো সড়কেই নিরাপত্তা ছিল না, যখন-তখন ফ্লাইওভারের ওপর থেকে ইট, পাথর, রড নিচে ফেলা হচ্ছে, নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া ক্রেনের মাধ্যমে ভারী নির্মাণসামগ্রী ওপরে তোলা হচ্ছে, যেকোনো সময় ছিঁড়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে। রডের ওয়েল্ডিং করার সময় আগুনের ফুলকি নিচ দিয়ে চলা যানবাহনের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। কংক্রিটে পানি দেওয়ার সময় ছিটকে পথচারী ও যানবাহনের ওপর পড়ছে। নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তার যেখানে-সেখানে। লেনের বিন্যাস যথাযথ না থাকায় তৈরি হয়েছে অগণিত খানাখন্দ ও গর্ত। সেই গর্তে প্রতিদিন কোনো না কোনো মানুষ পড়ছে। গর্তে পড়ে যাওয়া অবশ্য কোনো ঘটনা হিসেবেই গণ্য হয়নি। প্রকল্প এলাকায় সড়ক নিরাপত্তার ন্যূনতম কোনো নিয়ম ছিল না, ট্রাফিক সাইন ছিল না, নির্দেশনামূলক বোর্ড ছিল না, এমনকি নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট বোর্ড বা সিটি করপোরেশন অথবা সেতু বিভাগের কোনো আইন মেনে চলা হয়নি। শত অব্যবস্থাপনা নিয়ে যে নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কাজ করেছে তাদের সীমাহীন অবহেলার কারণে ফ্লাইওভার নির্মাণকালীন এ পর্যন্ত যাঁরা মারা গেলেন, তাঁদের মৃত্যু কি আপনি দুর্ঘটনা না হত্যাকাণ্ড বলবেন?  

আন্তর্জাতিক আইনকানুন ছেড়ে দিলাম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বলেও তো সব ধরনের নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক এবং সেটা কেউ না মানলে তা আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। চমত্কার আইন। কিন্তু নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান যে বছরের পর বছর ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত উদাহরণ তৈরি করে যাচ্ছে, তার জন্য তাদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? একেকটি হত্যাকাণ্ডের পর সাংবাদিকরা পুরকৌশল, প্রকৌশল বিভাগের বিশেষজ্ঞের কাছে ছুটে যান আর বিশেষজ্ঞদের মুখে যেসব আইনকানুন নীতির কথা শুনি, তমা কনস্ট্রাকশন তো তার কোনো কিছুই না মেনে দিব্যি উড়াল সড়কের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, ফুরফুরে মেজাজে যেন অনন্তকাল ধরে এই কাজ চালিয়ে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। কাজ কি আসলেই চলছে? ঠিকমতো কাজ চললে ৯ কিলোমিটার একটি ফ্লাইওভার নির্মাণে কত বছর লাগার কথা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উড়াল সড়কে গার্ডারের স্কেপ হোল্ডিং থাকতে হয় যেন সেটি কোনো লোকের ওপর না পড়ে, শ্রমিকদের নিরাপদ পোশাক, হেলমেট পরতে হয়, খোলা জায়গায় এত খোলাখুলি কাজ করতে নেই, নিরাপত্তাবেষ্টনী থাকতে হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার বিধানও রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নির্মাণকাজে নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি এর কোনোটি কি মানছে? নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারার কারণে শত কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে, মানুষ নিহত হয়েছে, দিনের পর দিন গার্ডারটি দুই প্রান্তে আংশিক আটকে রেখে স্থানীয়দের মরণভীতির কারণ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।

আমরা এমন এক শহরে বাস করি, যেখানে সকালে সুস্থ হার্ট আর নরমাল ব্লাডপ্রেশার নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলে সন্ধ্যায় শতভাগ সুস্থতা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নগরের দেখভালের দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁদের সীমাহীন অবহেলায় মাঝের সময়টুকুর মধ্যে আপনি, আমি যে কেউ খোলা ম্যানহোলে পড়ে মারা যেতে পারি। ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে বুনতে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে যাচ্ছেন? গার্ডার ভেঙে মাথায় পড়ে তক্ষুনি আপনার স্বপ্নের সমাধি হতে পারে। তবু নাকি এই নগরের নাম তিলোত্তমা। তো তিলোত্তমার এ ধরনের রঙ্গ-রসিকতার আরো বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সেই কবে ঈশ্বরগুপ্ত লিখেছেন, এতো ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গে ভরা, তো মরণ নগরের নাম তিলোত্তমা, রঙ্গভরা বঙ্গ দেশেরই একটি উদাহরণ। রাস্তার ভিখারি থেকে শীর্ষ শিল্পপতি কারো প্রাণই যে শহরে নিরাপদ নয়, সে শহরের নাম নাকি প্রাণের শহর! জাদুর শহর! নাগরিকদের জন্য এসব উপমা নির্মম রঙ্গ ব্যঙ্গ ছাড়া কিছু নয়। এই শহরের রাস্তায় বের হলে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, পকেটমারসহ বিবিধ প্রতারণার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আপনাকে। শর্টকাট টাকা কামাইয়ের জন্য এই শহরের একটি শ্রেণি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং সেই প্রশিক্ষণের আপনিও একটি অংশ, গিনিপিগ হিসেবে। প্রতিদিনকার জীবনযাপনে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নানা মাত্রার পরিহাস ও প্রতারণা। প্রতারিত নাগরিক প্রতারণার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সব সময় সতর্ক থাকতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধে। এই নগরে প্রত্যেকে নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন একেকটি দ্বীপের মতো। সমচিন্তার নাগরিকরা কোনো একটি উপলক্ষ সামনে নিয়ে মিলিত হবে, সুযোগ নেই। সরাসরি মিলিত হওয়ার মধ্যে প্রাণের যে সংযোগ অনুভব হয়, ভার্চুয়াল মাধ্যমে তা কখনো সম্ভব নয়। কিন্তু নিঃসঙ্গ নাগরিকদের নিঃসঙ্গতাই নিয়তি। এত ফ্লাইওভার, গন্তব্যের দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য সড়ক সংযোগের এত আয়োজন, কই তবু যানজট পরিস্থিতির তো তিল পরিমাণ উন্নতি হলো না। মালিবাগ, মৌচাক থেকে বসুন্ধরা পর্যন্ত পৌঁছতে দুই-আড়াই ঘণ্টা লেগে যায়। ওই আড়াই ঘণ্টার পথে কোনো নাগরিকের মনে যদি সীমা-অসীমের দ্বান্দ্বিক দর্শনের উদয় হয় তো তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। না, এই সীমা-অসীমের দ্বন্দ্ব গভীর কোনো দর্শন থেকে উদ্ভূত নয়, এ হলো ১৫ মিনিটের সীমিত পথ কিভাবে অসীম সীমায় পৌঁছাল সেই সীমা-অসীমের দ্বন্দ্ব। রাস্তার পাশে নির্মাণসামগ্রী রাখা, ফুট ওভারব্রিজের দুই-তৃতীয়াংশ হকারদের দখলে থাকা, সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নজনিত খোঁড়াখুঁড়িতে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটে, কোনো না কোনো মানুষ মারা যায়। চলে মৃত্যুর দায় একে অপরের কাঁধে চাপানোর উতোনচাপার। একসময় কিছু ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয়, নির্ধারণের নির্ণায়ক শ্রেণি। যেমন ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে নিহত শ্রমিকের জীবনমূল্য বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। পুঁজিবাদের খোঁড়া বিকাশ হয়েছে যেখানে, সেখানে শ্রমিকের জীবনমূল্য এর বেশি কোনো দিনই ছিল না। কিন্তু সমাজে একসময় প্রবল কাল সচেতন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল। সমাজব্যবস্থার ওপর যাঁদের সীমাহীন ক্রোধ ও অনাস্থা ছিল। ঠিক যে মধ্যবিত্ত বিপ্লবকে ভয় করে। এটা নতুন কিছু নয়। ব্যাপক টানাপড়েন, পরিচয় সংকট, সফল হতে না পারার শোচনীয় সব দুর্বলতায় মধ্যবিত্ত নিজেই এক সংকটগ্রস্ত শ্রেণি। তবু বিপ্লবের মতো আমূল পরিবর্তন না হলেও নিজের স্বার্থে সমাজব্যবস্থার অন্তত কিছুটা পরিবর্তনে চিরদিন এগিয়ে এসেছে মধ্যবিত্ত। সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বপ্নকে ধারণ না করেও সমাজ পরিবর্তনের জন্য সমাজের এক রকম মহৎ খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে জীবনকে অর্থবহ করতে চেয়েছে। সমাজের অনেক সুবিধা না পাওয়ার পরও যেসব সুবিধা নিচ্ছে তার জন্য এক রকম অপরাধও কাঁটার মতো বিঁধেছে। সামন্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত বিত্ত সম্পদের প্রতি উন্নাসিকতা দেখিয়েছে। শত ঘাত-প্রতিঘাত এবং ঘোর প্রতিকূলতার মধ্যেও সমাজব্যবস্থা ভেঙে ফেলার জন্য অন্তত একটি যুক্তি সে দেখিয়েছে, যে সমাজে বেশির ভাগ মানুষ বঞ্চিত, সে সমাজ ভেঙে যাওয়াই ভালো। সমাজ রূপায়ণের আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা লক্ষ করা গেছে তার মধ্যে। এখন যে মধ্যবিত্তকে দেখা যাচ্ছে সে কোন মধ্যবিত্ত? এমন নেতিয়ে পড়া নিস্তেজ নির্বিকার মধ্যবিত্ত আগে কখনো দেখা যায়নি। মধ্যবিত্তের মনে এখন এই ধারণা বদ্ধমূল যে সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াতে হবে এবং যেভাবেই হোক দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে। একসময়কার ছিমছাম মধ্যবিত্ত এই দেশের সংস্কৃতিতে নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেত, এখানেই কর্মসংস্থান, এখানেই একমাত্র ঠাঁই ভাবত বলে শহরে সংঘটিত অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদ করত। অনিয়ম প্রতিরোধের জন্য পাড়া-মহল্লায় গড়ে তুলত বিভিন্ন সামাজিক নাগরিক কমিটি। জীবনের সব উত্তেজনা, সংকল্প এবং উত্থানও ছিল এই শহরকে কল্পনা করে। এই শহর ছিল তার কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো কাছের। মধ্যবিত্তের সেই অনুভবের স্পন্দন আর নাই, তাই প্রতিবাদেরও সেই ভাষা নাই। প্রতিবাদের বদলে পালিয়ে বাঁচাকেই এখন সে বাঁচার শর্ত হিসেবে গণ্য করছে।    

 

লেখক : কথাশিল্পী


মন্তব্য