kalerkantho

আলোকের এই ঝরনাধারায়

জয়তু বঙ্গবন্ধু

আলী যাকের

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জয়তু বঙ্গবন্ধু

আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। আজ বাঙালির জন্য এক ক্ষণজন্মা অতিমানবের জন্মতিথি উদ্যাপনের দিন। বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশেই আমরা যে মুক্ত জাতিসত্তা নিয়ে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারছি এর পেছনে কোনো একজন মানুষের অবদানের কথা যদি বলতে হয় তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’। তাঁর জন্মদিনে আজ এই অশান্ত, সাম্প্রদায়িক ও সংঘাতময় বিশ্বে তাঁর মাপের একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল আমাদের যুক্তিগ্রাহ্য পথপ্রদর্শনের জন্য। সে কথা স্মরণ করেই আজকের এই লেখাটি শুরু করেছি।

আমি একজন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করি যে যুক্তিহীন অমানবিক আচরণ যখন একাধিক্রমে ঘটতে থাকে তখন শুধু কোনো সমাজ, দেশ ও জাতি নয়, সারা বিশ্বই একের পর এক অমানবিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। এই যে অপরাধ, এর নিকৃষ্টতম হলো হত্যা। আমি এর আগেও অনেক লেখায় বলেছি, আবারও বলছি, হত্যাই খুলে দেয় হত্যার দরজা। বেশি দূর যেতে হবে না। এ ধরনের অপকর্ম যেসব সমাজে ঘটেছে, সেখানকার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে আমরা পাকিস্তানের অধিবাসী ছিলাম।

পাকিস্তান নামের অগণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রে যে অনাচার, অত্যাচার ও হত্যা আমরা দেখেছি, এসবই বাংলার মানুষকে ঠেলে দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের দিকে। আমরা ২৬ মার্চ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলাম এবং ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ জয় করেছিলাম। যে একটি বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত হয়েছিলাম, সেটি হলো আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় চার নীতি যথা—গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক গণমুখী দেশ প্রতিষ্ঠিত করলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি ও অগণিত নারীর সম্ভ্রমহানির পর আবারও মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জীবনের অধিকার লঙ্ঘিত হবে সেটা আমরা কল্পনাও করিনি। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছিল এ ভূখণ্ডে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেই সঙ্গে এই ঢাকা শহরেরই বিভিন্ন স্থানে তাঁর পরিবারের এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আরো অনেক মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ড আপাতদৃষ্টিতে কিছু উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তার দ্বারা সংঘটিত বলে মনে হলেও আসলে এটি ছিল সুচিন্তিত, সুদূরপ্রসারী ও তাত্পর্যপূর্ণ একটি ষড়যন্ত্র। আমরা জানি যে ১৬ ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশবিরোধী শক্তি আমাদের দেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করে পাকিস্তানি মূল্যবোধ সম্পৃক্ত একটি দেশের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশবিশেষ।

ভাবতে অবাক লাগে যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একের পর এক যেসব সরকার আমাদের দেশের ক্ষমতা দখল করেছে, তারা কেউ এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার তো করেইনি, বরং হয় এর প্রত্যক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এবং হত্যাকারীদের পুনর্বাসন করেছে নতুবা পরোক্ষভাবে হত্যার পক্ষে যায় এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে কি এটিই সত্য বলে ধরে নিতে হবে যে আমাদের বিজয় দিবস থেকে শুরু হয়েছিল এক ভয়াবহ স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্ত, তার সঙ্গে এসব সরকারের সংশ্লিষ্টতা ছিল? যদি বলি এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার জন্য ওই সব সরকার বাংলাদেশবিরোধী অনেক কাজ করেছে, তাহলে কি বাড়িয়ে বলা হবে?

সেই ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দিয়ে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান; এসবেরই লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা। অতএব, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর থেকেই আমরা আবহাওয়ায় স্বাধীনতার গন্ধ পাচ্ছিলাম। সে কারণেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রমনার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন মুক্তির কথা, স্বাধীনতার কথা। এই ইঙ্গিতই যথেষ্ট ছিল সব বাঙালির জন্য। আমরা দেখতে পাই যে ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকার নিরস্ত্র জনগণের ওপর যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী সব নৃশংসতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন একদিকে যেমন পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ‘আল্লাহ পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে’, আরেক দিকে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় সব মানুষ বঙ্গবন্ধুর আহ্বান অনুযায়ী ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। সেই যুদ্ধে  সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিল। এই বাঙালি কখনোই জাতির পিতার রক্তে নিজ হাত রঞ্জিত করতে পারে না। যারা এই জঘন্য কাজটি করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে এই নৃশংস হত্যার বিচার করেনি তারা অবশ্যই বাংলাদেশবিরোধী ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সবচেয়ে খুশি হয়েছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং তড়িঘড়ি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেটা কোন বাংলাদেশ ছিল? সেই বাংলাদেশ, যা একটি অসাম্প্র্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নয়, বরং পাকিস্তানের আদলে সাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসী এক বাংলাদেশ। এ কারণে বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল নব্য বাংলাদেশের ধারক ও বাহক এক সরকার। এরা সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধুকে নতুন প্রজন্মের হৃদয় থেকে নির্বাসিত করতে। তাঁর ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করতে। এককথায় বাংলাদেশের মুক্তিকে অস্বীকার করতে। মনে পড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্র্রতিক সময়ের নির্বাচনের পর আমার এক পরিচিতজন আমাকে কথাচ্ছলে বলেছিল, ‘দেখো কী গণতন্ত্রমনা মার্কিন নেতারা! শত বিরোধিতা করলেও ট্রাম্পের জয়ে ওবামা ঠিকই তাঁকে অভিনন্দন জানান। ’ আমি তাঁকে জবাবে বলেছিলাম, এটাই স্বাভাবিক। কেননা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ট্রাম্প ও ওবামার কতগুলো মৌলিক বিষয়ে দ্বিমত নেই। তাঁরা দুজনই বিশ্বাস করেন যে তাঁরা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছেন। তাঁরা দুজনই বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতির পিতা জর্জ ওয়াশিংটন। তাঁরা দুজনই বিশ্বাস করেন তাঁদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। আমাদের দেশটিকেও আমরা একটি উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীন করেছি। আমাদেরও একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আছে, যা ১৭ এপ্রিল ১৯৭১-এ মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় পাঠ করা হয় এবং যার মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদেরও একজন জাতির পিতা আছেন যাঁর নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এবং স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম। কিন্তু সেই জাতির পিতার নৃশংস হত্যার পর গঠিত সরকারগুলো ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের এ সত্যগুলোকে অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু কথায় আছে, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। ’ তাই অতি বিলম্বে হলেও শত চক্রান্তকে পরাজিত করে আজ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

যত দিন নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের কথা ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা হবে তত দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকবেন সব মুক্তিকামী মানুষের অন্তরে। এ মাসের ১৫ তারিখ বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবস। বাঙালির কাছে ওই দিনটি একটি কৃষ্ণ দিবস। নির্মমভাবে আমাদের জাতির পিতাকে এবং তাঁর অতি আপনজনদের হত্যা করেছিল নব্য পাকিস্তানি চক্র। কিন্তু যে কারণে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল অর্থাৎ বাংলাদেশকে বিপথগামী করে আবারও একটি সাম্প্রদায়িক স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করা, সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পারেনি কুচক্রীরা। বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রত্যেক বাংলাদেশির যে ঋণ তা শোধ করতে পারি আমরা শুধু মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে এবং বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনায় গণতন্ত্রকে চিরায়ত করে। শুধু তাহলেই তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব হবে আমাদের পক্ষে।

 

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য