kalerkantho


সময়ের প্রতিধ্বনি

সাবমেরিন যুগে বাংলাদেশ এবং নিরাপত্তা কৌশল

মোস্তফা কামাল

অন্যান্য   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাবমেরিন যুগে বাংলাদেশ এবং নিরাপত্তা কৌশল

ঐতিহাসিক কারণেই মার্চ মাস বাংলাদেশের জন্য তাত্পর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।

সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ তিনি বললেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়; তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট, যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। ’

এই ঘোষণার পর দেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন মুক্তিযুদ্ধের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়ে যায়। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি চলতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও বুঝে যায়, এবার আর বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। তার পরও দাবিয়ে রাখার নানা অপকৌশল করে তারা। তারা আলোচনার নামে প্রহসন শুরু করে। এটা যে সময়ক্ষেপণের একটা ফন্দি ছিল, সেটাও তখন বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

কিন্তু পাকিস্তানিরা যে রাতের আঁধারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালাবে, তার জন্য বাঙালি মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

সেদিন ছিল ২৫ মার্চ রাত। বাঙালির জীবনে কালরাত হিসেবে চিহ্নিত। সেই রাতে ঢাকার নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলে পড়েছিল পাকিস্তানি হায়েনারা। সেদিন নির্বিচারে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। জানতে পারে সারা বিশ্ব। পৃথিবীর ইতিহাসে ২৫ মার্চের গণহত্যা কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কিন্তু সেই গণহত্যার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। কারণ প্রায় আড়াই দশক বাংলাদেশ উল্টোপথে চলেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে জাতীয় সংসদ। যদিও সংসদে এর প্রস্তাবক হচ্ছেন জাসদের শিরিন আখতার। তার আগে জনমত গঠনে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ভূমিকা রাখে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, ২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে ইতিমধ্যে আমরা কালের কণ্ঠে অনেক লেখা ছেপেছি। পাঠক মতামত নিয়েছি। যেদিন জাতীয় সংসদে প্রস্তাব উত্থাপিত ও অনুমোদন হয়েছে, সেদিনও পূর্ণ পৃষ্ঠা পাঠক মতামত ছেপেছি।  

যা হোক, সেই মার্চ মাসেই জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে দুটি সাবমেরিন যাত্রা শুরু করল। চীনের দেওয়া সাবমেরিন দুটির নামও (জয়যাত্রা ও নবযাত্রা) দিয়েছেন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর বাংলাদেশ সাবমেরিন যুগে প্রবেশ করল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি ত্রিমাত্রিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হলো। আর এতে দেশের মানুষের মনোবল অনেক গুণ বেড়ে গেল।

অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশকে কে আক্রমণ করবে? ছোট্ট দেশের এত অস্ত্রশস্ত্রের দরকার কী? বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত আর এক দিকে মিয়ানমার। কাজেই আক্রমণ যদি করে, ভারত অথবা মিয়ানমার করবে। দুটি দেশই তো বন্ধুপ্রতিম। কাজেই অর্থ ব্যয় করে সমরশক্তি বাড়ানোর কী দরকার?

আমি এ কথা স্বীকার করি, এখনকার যুগে এক দেশ আরেক দেশকে দখল করতে পারবে না। কিন্তু আক্রমণ চালিয়েও সুবিধা করতে পারবে না। এখন সময় পাল্টেছে। প্রতিবেশী তো বটেই, অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রেখে সবাইকে চলতে হবে। তার পরও কোনো দেশই কিন্তু সমরশক্তি হ্রাস করছে না। ছোট-বড় সব দেশই পাল্লা দিয়ে সমরশক্তি বাড়াচ্ছে।

ভারতে ৪০ কোটির বেশি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না বাড়িয়ে সেই টাকা তাদের দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা উচিত। এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও জানেন। তার পরও কেন তারা সমরশক্তি বাড়িয়ে চলেছে? রাশিয়া এখনো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। দারিদ্র্য একটা বড় সমস্যা। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে দেশটি। তার পরও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন সমানতালে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে যাচ্ছে। সবাই যখন প্রতিযোগিতা করে সমরশক্তি বাড়িয়ে চলেছে, তখন বাংলাদেশ আর নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে কেন?

বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে দুর্বল হয়ে থাকবে, তা হতে পারে না। যে বাঙালি রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষা এনেছে, স্বাধীনতা এনেছে; সেই জাতি দুর্বল নয়। সাহসী জাতি হিসেবে বিশ্বের স্বীকৃতি পেয়েছে। শৌর্যবীর্যেও বাঙালিকে এগিয়ে থাকতে হবে।   

ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা পর্যায়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনাও হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশকে রাজি করাতে পারেনি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের কম আগ্রহ ছিল না। মার্কিন রাষ্ট্রদূত হোলজম্যান ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বললেন, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের ওপর ভাসছে। তারপর তিনি একটি হিসাবও দাখিল করলেন। তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে কী পরিমাণ গ্যাস মজুদ আছে, তার হিসাব দিতে পারবেন?

রাষ্ট্রদূত হোলজম্যান আর কথা বাড়ালেন না। তবে পরে আমরা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকায় এসে গ্যাস রপ্তানির ব্যাপারে দূতিয়ালি করেন। সাহসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বললেন, ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ রেখে তিনি রপ্তানি করতে রাজি আছেন। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সেই আগ্রহে ভাটা পড়েনি।

যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, ছোট দরিদ্র একটি দেশ, যা বলব তাই শুনবে। সে কারণেই তারা নানা ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই দেশটিরও যে আত্মসম্মানবোধ আছে, তা হয়তো তারা বিবেচনায় নেয়নি। তাই তারা বারবার হোঁচট খেয়েছে; তবে হাল ছাড়েনি। চাপ সৃষ্টির প্রবণতাও অব্যাহত আছে। দেশে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর উপস্থিতি আছে বলে একধরনের রব তোলা হচ্ছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের মতো এই দেশটাকে অস্থিতিশীল করা যায়! কিন্তু শেখ হাসিনা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করছেন।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়—ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেমন আছে, আবার বিপদও আছে। একদিকে বৃহত্তর শক্তির দেশ চীন, আরেক দিকে নিকটতম বড় প্রতিবেশী ভারত। দুটি দেশকেই হাতে রাখতে হয় বাংলাদেশকে। দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হয়, তা না হলে নাখোশ হয়। কূটনৈতিক কৌশলে উনিশ-বিশ হলেই বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

বিএনপি সরকারের আমলে তারেক রহমান তাইওয়ানকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অফিস খোলার অনুমতি দিয়ে বিরাট বিপদে পড়েছিলেন। চীন বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল। এখনো বিএনপিকে সেই খেসারত দিতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছেন। চীন ও ভারত উভয় শক্তিধর দেশের সঙ্গেই অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছে।

সাম্প্রতিককালে চীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিচ্ছে চীন। সামরিক খাতেও চীনের সহযোগিতা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। দুটি সাবমেরিন দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শক্তি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। সেই সঙ্গে বেড়েছে এ দেশের জনগণের মনোবল। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর ব্যাপারেও চীন অনেক বেশি উদারতা দেখাচ্ছে।

চীনের এই আগ্রহের বিষয়টিকে বাঁকা চোখে দেখছে ভারত। তারা চীনের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর বিশেষ নজর রাখছে। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাবেন। তখন সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতাসংক্রান্ত কোনো চুক্তি করা যায় কি না তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি হওয়ার পর ভারতও এগিয়ে আসছে। এখন বাংলাদেশ সরকার কী কৌশলে আগাবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে বাংলাদেশের উচিত, কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা ও দেনদরবারের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা। কূটনৈতিক কৌশল দিয়েই দুটি দেশকে হাতে রাখতে হবে।

রাশিয়া, জাপান ছাড়াও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে বর্তমান সরকার। রাশিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। জাপানের ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই স্বীকৃতিদানের মধ্য দিয়ে জাপান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে গড়ে তোলার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছে। এখনো সেই সহযোগিতা অব্যাহত আছে। তবে এ ক্ষেত্রে জাপানের কোনো বিশেষ স্বার্থ নেই। কোনো কিছুর বিনিময়ে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেনি।

ইউরোপীয় দেশগুলো অবশ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করে আসছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোতে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে। আমি মনে করি, এগুলো দেশের জনগণের জন্য মঙ্গলজনক। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো বাংলাদেশকে অবাধ সুবিধা দিয়ে আসছে। অস্ত্র ছাড়া সব কিছুই ইউরোপে রপ্তানি করা যায়। চলতি বছর বাংলাদেশের পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে জার্মানি। বাংলাদেশের জন্য এর চেয়ে সুখবর আর কী হতে পারে!

আমরা আশা করি, ভারতও তার উদার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবে। আমরা সব সময়ই আমাদের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বড় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের উচিত, তার চারপাশের ছোট প্রতিবেশী দেশকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ছোট প্রতিবেশী দেশকে পশ্চাত্পদ রেখে কখনোই ভারত ‘সুপারপাওয়ার’ হতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে যাতে তিস্তা চুক্তি সই করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ভারতের। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে। উভয় দেশের নাগরিকদের মধ্যে যাতায়াত সহজতর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থা সচল করতে হবে। সরাসরি বাস ও ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সীমান্তে সৃষ্ট জটিলতা দূর করতে হবে। তবে কাঁটাতারের বেড়া কিন্তু একসময় দুই দেশের সম্পর্কে ‘বিষফোড়া’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।  

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com  


মন্তব্য