kalerkantho


জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

তিনি আমাদের ‘কালের কণ্ঠ’

আবদুল বায়েস

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তিনি আমাদের ‘কালের কণ্ঠ’

প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান একজন ‘কালের কণ্ঠ’। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি সংকটকালে তাঁর ঐন্দ্রজালিক কণ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে চলেছে। ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই বিরল প্রতিভার মানুষটি বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও আমার অন্যতম প্রিয় একজন শিক্ষক; প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত। আজ শুভ জন্মদিনে অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

দুই

পরম সৌভাগ্য যে আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম। এটা ছিল প্রথমকাল। একজন জাদুকরের মতো রেহমান সোবহান জাদুমুগ্ধ করে ছাত্র-ছাত্রী ধরে রাখতেন। ক্লাসে তাঁর সম্মোহনী ও সমুদ্ভাসিত ভাষণে চোখের পাতা ফেলা কিংবা উসখুস করার সুযোগ দিতেন না। কথা শোনার জন্য সব সময় ‘হাউজফুল’ ক্লাসে সবাই উত্কর্ণ হয়ে থাকতাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনর্গল ইংরেজি ভাষায় লম্বা বাক্যের অলংকারসমৃদ্ধ শব্দসমেত ভাষণে পুরো ক্লাস মাত; পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে ক্লাস শেষ হলে শুরু হতো মৃদু গুঞ্জন। এমনিতে কাটখোট্টা ও গুরুগম্ভীর মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন রসে টইটম্বুর।

মাঝেমধ্যে তাঁর সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত।

তিন

আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ এই মানুষটি একটি অসাধারণ পরিবারে জন্ম নেন। দার্জিলিং ও লাহোরে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। বাবার ইচ্ছা ছিল চামড়াশিল্পের ওপর উচ্চশিক্ষা নেবেন; কিন্তু বনে গেলেন অর্থনীতিবিদ। তিনি অবশ্য বলে থাকেন যে অর্থনীতি পড়ার আগ্রহ কোনোকালেও ছিল না, অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠা নাকি নিছক একটা ‘অ্যাকসিডেন্ট’। এই যে না চাইতেই অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠা তার মানে দাঁড়ায় নাচতে জানলে সব উঠোনই সোজা। পলিটিক্যাল ইকোনমির এমন কোনো শাখা-প্রশাখা নেই, যেখানে তাঁর পদচারণ নেই।

চার

তিনি প্রথম বোমা ফাটালেন ১৯৬১ সালে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য নিয়ে এক সেমিনারে, পাকিস্তানে বিরাজমান দুই অর্থনীতির কথা তুলে ধরে। বয়স তখন বড়জোর ২৬ বছর, একজন ইয়াং লেকচারার মাত্র। মজার ঘটনা হলো, ঠিক তার পরের দিন বিখ্যাত ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দুটি শিরোনাম জায়গা নিল—একদিকে রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতি এবং অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এক অর্থনীতি। এমনই করে মাত্র ২৬ বছরের রেহমান সোবহান লৌহশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কপালে ভাঁজ ফেলার এবং আরামের ঘুম হারাম করার সব বন্দোবস্ত করে ‘কালের কণ্ঠ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন!

পাঁচ

আমাদের তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে টার্ম পেপার লেখাতেন। সে লক্ষ্যে রোদ-বাদলে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। পরবর্তী সময় বের করলেন একটি প্রতিবাদী পত্রিকা ‘ফোরাম’। এর মাধ্যমে হয়ে উঠলেন সেই কালের কণ্ঠ। খুব অল্পদিনের মধ্যে পত্রিকাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে তরুণ প্রজন্ম তথা বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মন কেড়ে নিল। ওই পত্রিকায় রেহমান সোবহান ছাড়াও ওয়াহিদুল হক, আনিসুর রহমান, নুরুল ইসলাম ও অন্যান্য বিদগ্ধ সমাজবিজ্ঞানী ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতেন। তবে ওই সব লেখা বাদ দিলেও প্রায় ৩০টি বই, ২০টি রিসার্চ মনোগ্রাফ ও প্রফেশনাল জার্নালে ১৪০টি লেখাসহ তিনি গড়েছেন প্রকাশনার এক পাহাড়। দ্বিতীয়কাল পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে একটি ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক দলিল প্রণয়নে লিপ্ত থাকেন। ঢেঁকি যে স্বর্গে গেলেও ধান ভানে তার প্রমাণও তিনি রেখেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে প্রথম দিন থেকে নজর দিলেন গবেষণালব্ধ একটা টাস্কফোর্স রিপোর্ট তৈরির জন্য, যা পরবর্তী সরকারকে অর্থ ও সমাজ নীতির ওপর কিছুটা হলেও ধারণা দেবে।

ছয়

দারুণ মজার মানুষ রেহমান সোবহান। মুখে মুচকি হাসি লেগেই আছে, হোক সেটা চরম রাগের সময় কিংবা সমালোচকের মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সিপিডির বিভিন্ন ডায়ালগে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে দেখেছি তিনি থাকেন মধ্যমণি হিসেবে; বাকি সবাই অপেক্ষাকৃত নিষ্প্রভ—এমনকি মন্ত্রী, এমপি, দাতাগোষ্ঠীর সদস্য। মানুষ তিনি মহান হৃদয়েরও। অধ্যাপক রেহমান সোবহান আপাদমস্তক মানবিক; আদর্শগত অবস্থান থেকে সাম্যবাদী ও মার্ক্সীয় চিন্তা-চেতনায় লালিত ও পুষ্ট। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ছয় দফার খসড়ায় উল্লিখিত বৈষম্য দূরীকরণে লক্ষ্য ও কৌশলকে, যা পরবর্তী সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুঘটক হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। একটি ন্যয়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে। সেই দলিলে উপস্থাপিত সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ঠিক করার দায়িত্বে অন্যদের সঙ্গে অধ্যাপক রেহমান সোবহানও ছিলেন।

সাত

তৃতীয়কাল তাঁর কণ্ঠ শুনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মাধ্যমে। সিপিডি আজ দেশে-বিদেশে বেসরকারি থিংক-ট্যাংক হিসেবে সুপরিচিত। যত দূর মনে পড়ে, বিভিন্ন বাহানায় দাতাগোষ্ঠীর শর্তারোপ ও সরকার কর্তৃক সেই শর্ত বিনা বিতর্কে গ্রহণ এবং সার্বিকভাবে সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক বিতর্কের অভাব থেকে তিনি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। জীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি অসমতার বিরুদ্ধে এক অদম্য যোদ্ধা হিসেবে থাকছেন রেহমান সোবহান। এই তো সেদিন আমাদের ‘কালের কণ্ঠ’ ৮২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক সেমিনারে দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোগত বৈষম্য নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন। বললেন, মরা ব্যাঙ কুয়ায় রেখে যেমন পানি সেচে লাভ নেই, তেমনি কাঠামোগত বৈষম্য বজায় রেখে শুধু দরিদ্রের জন্য সম্পদ নির্দিষ্টকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্য দূর করা যাবে না। মাথার ওপর বিপ্লবের বাজ পড়ার আগেই বৈষম্য নিরোধে সব ব্যবস্থা নিতে সবাইকে আহ্বান জানালেন।

এমনইভাবে কালের কণ্ঠ রেহমান সোবহান সমাজের সেবায় নিয়োজিত। তিনি আগামীকালেরও কণ্ঠ।

আজ ৮২তম জন্মদিনে আবারও তাঁর দীর্ঘ উৎপাদনক্ষম জীবন কামনা করি।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য