kalerkantho


প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মায়েদের জন্য উপবৃত্তি ও কিছু কথা

মাছুম বিল্লাহ

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মায়েদের জন্য উপবৃত্তি ও কিছু কথা

প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয় শিক্ষার ভিত্তি। এই ভিত্তি মজবুত করার জন্য বর্তমান সরকার বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে আরেকটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো। সেটি হচ্ছে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুদের এক কোটি ৩০ লাখ মা উপবৃত্তি পাবেন। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা প্রতিজন মাসে ১০০ টাকা ও প্রাথমিকে ১৫০ টাকা করে রাষ্ট্র থেকে এই উপবৃত্তি পেয়ে থাকে। ১ মার্চ ২০১৭ থেকে এই শিশুদের মায়েদের জন্য উপবৃত্তির কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মায়েরা এ টাকা পাবেন। এটি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে আরেকটি মাইলফলক। শিশুদের প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন মা। মা ও শিক্ষক সবাই তাঁদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন মায়েরা উৎসাহী হবেন, অন্যদিকে তাঁদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে সরকারের এ পদক্ষেপ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। সিদ্ধান্তটি নারীর ক্ষমতায়নের জন্যও একটি বিরাট পদক্ষেপ। সরকারের এসব উদ্যোগ সফল হলে মানসম্মত শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে প্রতিটি ঘরে। তবে শিক্ষা হতে হবে যুগোপযোগী, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। প্রাথমিকে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমরা সাফল্য অর্জন করেছি, এ হার এখন ৯৮ শতাংশ। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা শেষ করতে পারার হারও ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ সময়মতো অর্জন করতে পেরেছে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিকে দুই কোটির বেশি শিক্ষার্থী আছে।

এই নতুন উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে—দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য, শ্রেণিকক্ষের অভাব এবং গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষাদান তো নিত্যদিনের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে প্রচলিত উপবৃত্তির টাকা বণ্টনে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। উপবৃত্তির টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মায়েদের মোবাইলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কারণ এতে বণ্টনগত সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়—এটি ওপেন সিক্রেট ব্যাপার। এর ফলে উপবৃত্তির জন্য সরকারকে যেমন বাড়তি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি বই ছাপানো বাবদও বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে। নতুন পদক্ষেপ অর্থ অপচয় রোধ করতে সহায়তা করবে। একজন মায়ের একাধিক সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলে তাদের টাকা একসঙ্গে দেওয়া হবে। এ জন্য টেলিটক থেকে বিনা মূল্যে প্রত্যেক মাকে একটি করে সিম দেওয়া হচ্ছে। রূপালী ব্যাংকের শিওর ক্যাশের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা শিক্ষার্থীদের মায়েদের মোবাইলে পৌঁছে দেওয়া হবে। তাঁরা আশপাশের শিওর ক্যাশের এজেন্সির কাছ থেকে টাকা তুলতে পারবেন। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে এবং এর আওতায় সব শিশুকে আনার লক্ষ্যে সরকার আগেও বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমান পদক্ষেপও ইতিবাচক। এ খাতে সরকারের বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমরা যা কিছুই করি দেখা যায়, একটু সচ্ছল পরিবার হলেই অভিভাবকরা বাচ্চাদের আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না। তাঁরা পাঠাচ্ছেন বাসার কাছের কিন্ডারগার্টেনে; যদিও সেখানে প্রশস্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, টিউশন ফি উচ্চমাত্রার, শিক্ষকরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা দেড় বছরের ডিপিএড প্রশিক্ষণ ও বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। কিন্ডারগার্টেনের টিচারদের এ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তার পরও সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোর সার্বিক পারফরম্যান্স কিন্তু কাউকেই আগ্রহী করতে পারছে না এবং এ প্রশিক্ষণ আসলেই কি তাঁরা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করছেন, না করলে কেন করছেন না তার কোনো জবাব বা গবেষণা নেই। এ বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে।

গ্রাম, গঞ্জ ও শহরের অলিগলিতে গড়ে ওঠা মানহীন অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর কারিকুলাম, পড়াশোনা, শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, শিক্ষকদের বেতন, বেতনের উৎস, প্রশিক্ষণ, একাডেমিক যোগ্যতা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তথ্য যাচাই-বাছাই এবং এ ধরনের কতগুলো প্রতিষ্ঠান কোন এলাকায় প্রয়োজন কিংবা আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি না, সেগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কথা ছিল। এ উদ্দেশ্যে সরকার উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ৫৫৯টি টাস্কফোর্স গঠন করেছিল। আমরা আশা করেছিলাম ওই টাস্কফোর্সগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য এবং তাদের সুপারিশ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। বেসরকারি পর্যায়ে প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু গত ২৫ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে জানতে পারলাম, মাঠ প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে কাজটি আর এগোয়নি। অলিগলিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের শিক্ষা প্রদান করছে দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের, তা জানা এবং দেশের জনগণকে জানতে সহায়তা করতে পারত এই টাস্কফোর্সগুলোর প্রতিবেদন। কিন্তু কেন বিষয়টি ঘটল না, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানা প্রয়োজন। সব ধরনের অভিভাবকের একটি ইচ্ছা থাকে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াবেন, তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবেন; কিন্তু ব্যবসাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা করা সম্ভব নয়। আবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় কী করতে হবে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com


মন্তব্য