kalerkantho


আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও একজন ম্যাসকারেনহাস

বিমল সরকার

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও একজন ম্যাসকারেনহাস

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক বন্ধু রাষ্ট্র, সংস্থা, সংগঠন ও পেশাজীবী আমাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পাশে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদেরই একজন হলেন নির্ভীক ও সৎ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস।

বাঙালি জাতির ঘোর বিপদ ও চরম অনিয়শ্চতার দিনগুলোতে তিনি যে সাহসিকতা ও হৃদয়তার পরিচয় দিয়েছেন এর তুলনা বিরল। কৃতজ্ঞ জাতির হৃদয়ে মহত্প্রাণ ম্যাসকারেনহাসের নামটি চিরজাগরূক হয়ে থাকবে।   

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিশাল ঘটনা। পাকিস্তানি শাসনামলে পাহাড়সম বৈষম্য, অন্যায় শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন, স্বার্থপরতা আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিরোধসহ শত রকমের কর্মতৎপরতার সফল পরিণতি আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ। এই অনন্য ঘটনায় এ দেশের ৩০ লাখ নিরপরাধ মানুষ জীবনদান করেছে। দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ও তাণ্ডবলীলা থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কেউ-ই রেহাই পায়নি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনারা সেনানিবাসে বাঙালি সেনা সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা পিলখানাস্থ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, খিলগাঁওয়ের আনসার সদর দপ্তরেও সশস্ত্র হামলা চালায়।

পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক দিয়ে ঢাকা শহরটিকে ঘিরে রেখে মেশিনগানের গুলিতে অসংখ্য বাড়িঘর বিধ্বস্ত করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাসভবন ও ছাত্রদের আবাসিক হলগুলোতে হামলা চালায়। এতে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কয়েক শ মানুষ নিহত হয়। মাত্র দুই দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন শহরে ৫০ হাজারেরও বেশি নরনারী ও শিশুকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তারা। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর ক্রমে দেশব্যাপী সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধারা দখলদার বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা শুরু করেন।  

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীর চোখের সামনে প্রথম তুলে ধরেন একজন অবাঙালি প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক। নির্ভীক ও কর্তব্যনিষ্ঠ ওই বিদেশি সাংবাদিকের নাম অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস (জন্ম : ১০ জুলাই ১৯২৮, মৃত্যু : ৩ ডিসেম্বর ১৯৮৬)। তিনি আমাদের যুদ্ধবন্ধু, বাংলাদেশের অকৃত্রিম সুহৃদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আড়াই মাসের মাথায় পাকিস্তানি দুর্বৃত্তদের বর্বরতা ও নৃশংসতার প্রকৃতি ও পরিধি ক্রমে বিস্তৃত হতে থাকে। পাকিস্তান সরকার প্রেস সেন্সর ও সংবাদ পাঠানোর ক্ষেত্রে বাধানিষেধ আরোপ করায় বাংলাদেশ থেকে কোনো সংবাদ বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল না। প্রথিতযশা ও গুণী বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিডনি শনবার্গসের মতো নির্ভীক সাংবাদিককেও সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণহত্যাবিষয়ক সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য পাকিস্তান সরকার দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। সে কারণেই বিশ্বসম্প্রদায় বাংলাদেশের নির্মম ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে শুরুতে কিছু জানতে পারেনি। বাঙালি জাতির এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৩ জুন ১৯৭১ ব্রিটেনের প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক সানডে টাইমসে ম্যাসকারেনহাসের তৈরি করা ‘বাংলাদেশে গণহত্যা’ শিরোনামে একটি সংবাদনিবন্ধ প্রকাশিত হয়। একটি সংবাদ হিসেবে মাত্র নয়, জল্লাদ বাহিনী বাংলাদেশে যে কী ভয়াবহ ধ্বংস আর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এর মাধ্যমে তা অবহিত হয়ে বিশ্ববিবেক হতবাক হয়ে যায়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে সৃষ্টি হয় ব্যাপক কৌতূহল ও আলোড়ন। এরপর জুলাই মাস থেকে বিদেশি বিভিন্ন সংবাদপত্র ছবিসহ বাংলাদেশের গণহত্যার প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে। কতিপয় সদস্য দেশ ছাড়া জাতিসংঘ ও এর অপরাপর সদস্য দেশ বাংলাদেশের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন হয় এবং পাকিস্তানের বর্বরোচিত গণহত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানি নৃশংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত ক্রমান্বয়ে জাগ্রত হতে থাকে।

ওই আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংবাদনিবন্ধের লেখক ম্যাসকারেনহাস পরের বছরের (১৯৭১) শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকের গৌরব অর্জন করেন এবং তাঁকে ব্রিটেনের জাতীয় প্রেস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

সে এক রোমাঞ্চকর ও দুঃসাহসিক কাহিনি। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস ১৯৭১ সালে করাচির ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে—এমন নিবন্ধ লেখার জন্য তাঁকে ১৩ এপ্রিল ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় এসে নিজের জীবন বাজি রেখে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি ১৩ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ১৪ দিন চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, লাকসাম, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া সফর করেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্বিচার গণহত্যা প্রত্যক্ষ করেন।

এরপর তিনি কর্মস্থল করাচি চলে যান। কিন্তু স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেন যে মাত্র অল্প কয়েকটি জায়গায় স্বচক্ষে যা দেখেছেন সততার সঙ্গে তা লিখলে তাঁর জীবন বিপন্ন হবে। আর মিথ্যা আজগুবি কাহিনি লিখে জেনারেলদের তুষ্টিবিধান করতেও তাঁর বিবেক আপত্তি জানায়। এই অবস্থায় একান্ত বাধ্য হয়ে তিনি মে মাসের মাঝামাঝি লন্ডন চলে যান এবং সেখানে ‘গণহত্যা’ সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ প্রতিবেদন তৈরি করে ফেলেন।

কিন্তু তখনো তাঁর পরিবার অর্থাৎ স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়ে করাচিতে রয়ে গেছে। অতএব, এখনই গণহত্যাবিষয়ক উল্লিখিত প্রতিবেদনটি বের হলে তাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার সমূহ আশঙ্কা। তাই ‘সানডে টাইমস’ কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি আবার করাচিতে ফিরে আসেন এবং দু-এক দিন পরই পরিবারের সবাইকে নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান।

পরিবারের সবাই যখন খান সেনাদের বুলেটের নাগালের বাইরে আসতে সক্ষম হয়েছে, ঠিক তার পরে ১৩ জুন সানডে টাইমসে ‘বাংলাদেশে গণহত্যা’ শিরোনামে ইংরেজি ভাষায় তাঁর এ ভয়াবহ ও লোমহর্ষক সংবাদটি প্রকাশিত হয়। আর সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় অবরুদ্ধ বাংলাদেশের দিকে। দেখতে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ভারত, কুয়েত ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সংবাদপত্রে এ খবর পুনর্মুদ্রিত হয়। জাপান ও কানাডার অনেক কাগজও এ সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো প্রকাশ করে। তা ছাড়া ব্রিটেনের বেসরকারি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এ নিবন্ধের ওপর ভিত্তি করে ‘ওয়ার্ল্ড ইন অ্যাকশন’ শীর্ষক সোমবারের নিয়মিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচার করে; যা সমগ্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম ও হল্যান্ডে প্রদর্শিত হয়।

একটিমাত্র সংবাদ যে সর্বত্র কী আলোড়ন সৃষ্টি করতে ও বিশ্ববিবেককে নাড়া দিতে পারে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘বাংলাদেশে গণহত্যা’। সংবাদনিবন্ধটি লেখার ব্যাপারে অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস যে নির্ভীকতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন বিশ্বব্যাপী তা প্রশংসা অর্জন করে। আর এরই জন্য বিশ্বের সাংবাদিকতা পেশার শ্রেষ্ঠ সম্মানটি দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি মঙ্গলবার যখন লন্ডনে পুরস্কার প্রদান করা হয় তখনো ম্যাসকারেনহাস যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকায় পেশাগত কাজে ব্যস্ত। সানডে টাইমসের সম্পাদক সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাসকারেনহাসের পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন।

সুদীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধ করে লাখ লাখ প্রাণসহ অপরিমেয় ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জন করা আমাদের স্বাধীনতা। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদানকে আমাদের মহান স্বাধীনতার মাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। একইভাবে অন্য সব যুদ্ধবন্ধুর সঙ্গে স্মরণ করি বাংলাদেশের অকৃত্রিম ও পরীক্ষিত বন্ধু, সাংবাদিকতা পেশার অহংকার, অকুতোভয় ও মহত্প্রাণ অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসকেও। আমাদের বিজয়ের মাসে ৩ ডিসেম্বর ১৯৮৬ তিনি লোকান্তরিত হন।

 

লেখক : কলেজ শিক্ষক


মন্তব্য