kalerkantho


বিপ্লবের ধ্রুবতারা তাজুল ইসলাম

হায়দার আকবর খান রনো

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিপ্লবের ধ্রুবতারা তাজুল ইসলাম

প্রায় চার দশক আগে যে শহীদের আত্মদান বিপ্লবের ধ্রুবতারার মতো অগুনতি তরুণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, শ্রমজীবী মানুষের দৃপ্ত পদচারণে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের বিকাশের সম্ভাবনাকে ভাস্বর করে তুলেছিল, বিশেষ করে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে জ্বলজ্বল করছিল, আজ তাঁর স্মৃতি প্রায় বিস্মৃত। আজকের তরুণ প্রজন্ম তাঁকে খুব একটা জানে বলেও মনে হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেও সেটাকে গোপন করে সাধারণ বদলি শ্রমিক হিসেবে কষ্টকর কায়িক শ্রমের কাজ করতেন এবং এভাবে একজন শ্রমজীবীর মতোই আর্থিকভাবে কষ্টকর জীবনযাপন করতেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন নিজেকে ‘শ্রেণিচ্যুত’ করে শ্রমিকের সঙ্গে পরিপূর্ণরূপে মিশে গিয়ে তাদের বিপ্লবের জন্য সচেতন ও সংগঠিত করতে। তিনি একজন আদর্শ কমিউনিস্টের ভূমিকা পালন করেছেন, যা আজকের দিনে সত্যিই বিরল।

এই মহান শহীদকে আমরা যে আজকাল খুব বেশি স্মরণ করি না, তার কারণ প্রধানত দুটি বড় বুর্জোয়া দলের নেতৃত্বাধীনে পরিচালিত প্রধান ধারার যে রাজনীতি এখন চলছে, তাতে আত্মত্যাগের কোনো মূল্য নেই। আছে কেবল ভোগসর্বস্বতা, নোংরামি, টাকার খেলা ও আর্থসামাজিক কর্মসূচিবর্জিত প্রদর্শনবাদ। তাই রাজনীতির এই অধঃপতনের যুগে তাজুল ইসলামকে ভুলে যাওয়া হবে, মিডিয়াতেও তাঁর প্রচার হবে না—এটাই স্বাভাবিক মনে হয়; কিন্তু এটাই শেষ কথা হতে পারে না। রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে, দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করে সেই আগের ধারায় প্রবাহিত করতে হবে। তাই বিপ্লবী তাজুল ইসলামের শহীদ দিবস উপলক্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জীবন, কাজ ও আদর্শের সঙ্গে আজকের নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্যেই এই লেখা।

গরিব কৃষক পরিবারে তাজুলের জন্ম।

চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ইছাখালী গ্রামে। বেশ কষ্টের মধ্যে তাঁকে লেখাপড়া করতে হয়েছিল। তবে তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ক্লাসে বরাবর প্রথম স্থান অধিকার করতেন। স্কলারশিপের টাকা দিয়ে তাঁর লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করতে হয়েছিল। কৈশোরের একটা সময় তাঁর কেটেছিল আইসক্রিম বিক্রি করে। তিনি স্কুলের হকি টিমের অধিনায়কও ছিলেন। শুনেছি তিনি ভালো গানও গাইতেন। উচ্চাঙ্গসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত। ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। এ সময়ই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকের পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ‘ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের’ যৌথ উদ্যোগে ভারতে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেছিলেন।

তাজুল ইসলাম ছিলেন স্বল্পসংখ্যক ব্যতিক্রমীর একজন, যিনি নিজেকে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সংগ্রামে পরিপূর্ণরূপে উৎসর্গ করছিলেন। ষাটের দশকে বেশ কিছু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল। আমি নিজেও ছাত্র জীবনের ও ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে টঙ্গীর শিল্প এলাকায় শ্রমিক বস্তিতে থেকে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেছিলাম। তবে তাজুল ইসলামের মতো কারখানার শ্রমিক হয়ে কাজ করিনি। এতটা অগ্রসর হতে আমি পারিনি। এটা বোঝা যায় যে কমরেড তাজুল ইসলাম ছিলেন অনেকের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে তিনি দুঃখকষ্টের জীবনের অবসান ঘটাতে পারতেন। মেধাবী ছাত্রের জন্য বড় চাকরি, বড় সামাজিক মর্যাদা, বিত্তবৈভব অর্জন করা কঠিন ছিল না। কিন্তু সাধারণ বদলি শ্রমিকের চাকরি নিলেন আদমজীতে। তাঁত চালাতেন। থাকতেন বস্তিতে। সামান্য পয়সায় দুই সন্তান নিয়ে সস্ত্রীক থাকতেন। তাও আবার এক দিন-দুই দিন নয়, দু-এক বছরও নয়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক দশক এভাবে সাধারণ বদলি শ্রমিকের কাজ করেছেন ও জীবন কাটিয়েছেন।

তাঁর স্ত্রী নাসিমা ইসলাম খুকুও এক অসাধারণ নারী। তিনি ধনী পরিবারের মেয়ে। তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল জামাতা সিএসপি হবে। সেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সে হলো কি না কারখানার বদলি তাঁত শ্রমিক। তাজুলের শ্বশুর এটা মানতে পারেননি। কিন্তু মেনে নিয়েছিলেন স্ত্রী খুকু, যিনি নিজে কষ্ট করে ছোটখাটো চাকরি করে কোনোমতে সংসার টেনে স্বামীর রাজনৈতিক কাজে সাহায্য করে গেছেন। ১৯৭২ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। জীবনের এগারোটি বছর তাঁরা খুবই দারিদ্র্যের মধ্যে, কিন্তু গভীর ভালোবাসায় কাটিয়েছেন।

১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক অঙ্গনেও সাড়া সৃষ্টি করেছে। গড়ে উঠেছে ১৫ ও ৭ দল। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) গড়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক জোটদ্বয় ও স্কপের পক্ষ থেকে হরতাল ডাকা হয়েছে ১ মার্চ। সেই হরতাল সংগঠিত করার জন্য ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতের বেলায় এক শিফটের শ্রমিকদের নিয়ে মিছিল বের হয়েছে আদমজীতে হরতালের প্রচার উপলক্ষে। এই মিছিল সংগঠিত করেন তিনি। মিছিলের সামনে ছিলেন তিনি।

এই মিছিলের ওপর এরশাদের দালালরা হামলা চালায়। প্রধান টার্গেট ছিল তাজুল। তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। এই মৃত্যু ছিল সাহসী মৃত্যু, বীরের মৃত্যু, শহীদের মৃত্যু।

বিপ্লবীর যেমন মৃত্যু নেই, তেমনি তাজুল ইসলামেরও মৃত্যু নেই।

এখন প্রয়োজন মৃত্যুহীন তাজুলের অসামান্য জীবন আদর্শকে নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আজকের দূষিত বুর্জোয়া রাজনৈতিক ধারাকে বদলিয়ে সুস্থ প্রগতিশীল রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রয়োজন হবে তাজুল ইসলামের। কমিউনিস্ট আন্দোলন ও পার্টিকে সত্যিকারের প্রলেতারীয় বিপ্লবী ধারায় গড়ে তুলতে হলেও আমাদের প্রয়োজন হবে কমরেড তাজুলকে।

 

লেখক : রাজনীতিবিদ


মন্তব্য