kalerkantho


অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হবে

ড. মীজানুর রহমান

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হবে

অ্যাডাম স্মিথের আমল থেকে ইকোনমিকস হয়ে পড়ে পলিটিক্যাল ইকোনমিকস। শুধু অর্থনীতি, যার মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই, তা আসলে কোনো বিষয় নয়। কাজেই রাজনীতি ও অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে আমাদের অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক সূচকগুলো ইতিবাচক এবং প্রায় সব কটি বিনিয়োগবান্ধব। এই ইতিবাচক সূচকগুলো সুষ্ঠু ও সুন্দর রাজনীতির ফল। একজন রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিভাবে উজ্জ্বল করতে পারে, তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক যখন সরে গেল, তখন একই সঙ্গে জাইকাসহ অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানও পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকে। প্রধানমন্ত্রী যখন দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করবেন, তখন দেখা গেল জাইকা আমাদের তিনটি সেতু যথা শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী সেতুতে অর্থায়ন করবে। এরই মধ্যে জাইকা কাজ শুরু করেছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা যাদের উন্নয়ন সহযোগী ভাবি, যারা আমাদের উন্নয়নের সহযোগী ও বিনিয়োগকারী, তাদের মধ্যে এক ধরনের আস্থা ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন একটি ব্র্যান্ড।

রাষ্ট্রের নেতৃত্বে কে আছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিচক্ষণতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ নানা গুণ বিবেচনা করা হয়। আমাদের দেশে এ কথা প্রায়ই বলা হতো, বিনিয়োগকারীরা দেশে এলে দিনের পর দিন ঘুরতেন, কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত পেতেন না। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একটি ওয়ান স্টপ সেন্টার চালু রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমস্যার কথা বলতে পারেন। সেই সঙ্গে তাঁরা সমাধানও পাচ্ছেন। একসময় আমাদের দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ মনে করত বিদেশিরা। আমাদের সক্ষমতা ও ক্রয়ক্ষমতা যথেষ্ট ছিল না। ১৯৭১ থেকে ২০০৮-০৯ সাল অর্থাৎ ৩৫ বছর লেগেছে আমাদের মাথাপিছু আয় ৫৪৩ মার্কিন ডলারে উত্তীর্ণ হতে। ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে আমাদের বর্তমান মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার। এর জন্য আমাদের ১০ বছরেরও কম সময় লেগেছে। এই কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ার জন্য একজন ব্যক্তি দরকার ছিল। যে ব্যক্তিত্বকে বিদেশিরা বাংলাদেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। বর্তমানে দেশে খাদ্যশস্য উতপাদনের পরিমাণ তিন কোটি ৮৫ লাখ মেট্রিক টন, যা গত ১০ বছরের মধ্যে তিন গুণ। আমাদের দেশে খাদ্য ঘাটতি ও রিজার্ভ কম ছিল। সে দিনও বাংলাদেশ ব্যাংকে আমাদের রিজার্ভ ছিল ৫.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। এসব সূচক বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বিদেশিদের আশ্বস্ত করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীনের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসছেন। তবে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক কাজ বাকি আছে। আমাদের পণ্যের মান বাড়াতে হবে। নানা বাধাবিপত্তি দূর করতে হবে। যখন রানা প্লাজা ধস ঘটে, তখন আমরা ব্যাপক চাপে পড়ে যাই। আমাদের গার্মেন্ট ক্ষেত্রের উদ্যোক্তারা নিজ প্রচেষ্টায় উন্নতমানের ভবন, কর্মপরিবেশ, ডে কেয়ার সিস্টেম, নারীদের বিনোদন, টিফিন ব্যবস্থা, মজুরি ও শ্রমিকদের নানা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছেন।

বর্তমানে ১০০টি দেশে আমাদের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যে আমেরিকায় আমাদের ওষুধ রপ্তানি শুরু হচ্ছে। কাজেই ইতিবাচক সূচকের সঙ্গে পণ্যের মানোন্নয়ন ও উতপাদন প্রক্রিয়াগত গুণাগুণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আরো আকৃষ্ট করতে হবে। শুধু গার্মেন্ট নিয়ে ভাবলে হবে না। কারণ গার্মেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। এখন আমরা দ্বিতীয়, একসময় আমরা প্রথম হব। শুধু গার্মেন্টের ওপর নির্ভর করে আমাদের অর্থনীতি টেকসই হবে না। ওষুধশিল্প ও জাহাজশিল্প নিয়ে ভাবতে হবে।

কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে পুকুর, নদীনালা, খালবিল ভরাট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমরা মিঠাপানির মাছ উতপাদনে পৃথিবীতে চতুর্থ স্থান দখল করেছি। আলু উতপাদনে পৃথিবীর ১০টি দেশের মধ্যে একটি বাংলাদেশ। শাকসবজি উতপাদনে পৃথিবীর ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। আমাদের শাকসবজি সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। বর্তমানে দেশের ভেতরেই আমাদের একটি বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। এদিক থেকে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ শিল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ইউরোপের অর্ধেক দেশের লোকসংখ্যা যোগ করলে আমাদের দেশের পাঁচ কোটির মতো মধ্যবিত্তের সংখ্যা হয় না। কাজেই আমাদের একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো জাতির জীবনে একবারই এই সময় আসে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হচ্ছে কোনো দেশের জনসংখ্যার বেশিসংখ্যক জনগণ কর্মক্ষম। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কোরিয়া, জাপানসহ প্রতিটি দেশে এসেছিল। এখন আমাদের দেশে এসেছে। এই সুবিধা আমরা অনেক দিন পর্যন্ত ভোগ করব। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকবে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

আমরা যদি জনসংখ্যাকে কর্মক্ষম জনসংখ্যায় রূপান্তর করতে পারি, তাহলে দেশের উন্নয়নের গতি বাড়বে। বর্তমানে দেশে ৭০ থেকে ৮০ লাখ লোক বিদেশে কাজ করে। এর বাইরেও আরো অনেকে রয়েছে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমায় এক লাখ লোক। আর ২০০৮ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় আট লাখে। বর্তমানে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স আরো ১০ থেকে ২০ গুণ বাড়ানো যেত, যদি আমরা তাদের কাজে দক্ষ করে বিদেশে পাঠাতে পারতাম। বিদেশে নানা কাজে নিয়োজিত আমাদের বেশির ভাগ জনশক্তি অদক্ষ। তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণগত জ্ঞান নেই বললেই চলে। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ির কাজের জন্য লোক পাঠানো হচ্ছে। মাদরাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই।

পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রেও নানা বিষয় চিন্তা করতে হবে। জ্বালানি তেলসহ আমরা ভোজ্য তেলও আমদানি করি। খাদ্য ও সবজিতে আমরা উদ্বৃত্ত। জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বিশ্বব্যাপী কমছে। এর ফলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। কারণ আমরা যে দামে কিনি, তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করি। বর্তমানে আমাদের বেশির ভাগ জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যুৎ উতপাদনে। তেলের দাম কমালে জনগণ সরাসরি সুবিধা ভোগ না করতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধা লুটবে। তবে তেলের দাম না কমিয়ে বিদ্যুতের দাম কমানো দরকার। তাতে জনগণ লাভবান হবে এবং সহজে কার্যকর হবে। সবাই সুবিধা ভোগ করবে।

ব্যাংকিং অব্যবস্থাপনার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আমাদের নতুন অনেক ব্যাংক হওয়ায় অনেকে মনে করছিলেন, এত ব্যাংকের প্রয়োজন আছে কি না? কিন্তু ব্যাংকগুলো এখন আমানত সংগ্রহ করছে, ওপরের দিকে যাচ্ছে। তবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি আরো ঘরোয়াভাবে হওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন যে পদক্ষেপ নেয়, তা অনেক বিলম্বে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সব পক্ষ। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা অনেক কার্যকর। কোনো আপত্তিজনক লেনদেন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা দ্রুত ধরে ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অগোচরে কোনো ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নেই। যেকোনো শিডিউল ব্যাংকের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংককেই নিতে হবে। টাকা রাখলাম আর ব্যাংক উঠে গেল—এটা নয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করলেই বাজারে ভালো প্রভাব পড়ে না। কাজেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রেগুলেটরি ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হবে এবং তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তদারকি কার্যক্রম জোরদার হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে এটা যেন এমনও না হয়, যা বাজারের ওপর প্রভাব ফেলে।

 

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য