kalerkantho


নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে টানাপড়েন কেন?

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে টানাপড়েন কেন?

নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রশ্নে রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। এই উত্তাপকে একধরনের সংকটও বলা যায়।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এমন সংকট কিংবা উত্তাপের পরিবেশ নতুন নয়। পারস্পরিক অনাস্থার বেড়াজাল থেকে কোনো রাজনৈতিক দলই যে মুক্ত নয়, তা সবার কাছেই পরিষ্কার। বিশেষ করে সরকারের মেয়াদান্তে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বিগত কয়েক বছর এমনই এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনীতি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধানের মাধ্যমে গণতন্ত্রমুখী যাত্রা শুরু হলেও তা দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংকটের আবর্তে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। পরে দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে ১৯৯০ সালে তীব্র গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোই দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য প্রত্যয়ী হয়। তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভিন্ন সময় নানাবিধ খুঁটির আশ্রয় নিতে হয়েছে।

একটি শিশু যখন হাঁটতে শেখে তখন সে তার মা-বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে হাঁটে। একা একা হাঁটতে একটু সময় লাগে বটে।

কিন্তু একসময় সে পরিপূর্ণভাবে হাঁটতে শেখে। আবার একজন যুবক যখন অসুস্থ হয় তখন তাকে চিকিৎসা না দিলে তার পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব হয় না কিংবা একজন বৃদ্ধের জন্য জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অন্যের সহায়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এমনই এক শিশু, অসুস্থ যুবক ও বৃদ্ধের মতো। চিকিৎসা কিংবা সহযোগিতা ছাড়া চলতেই পারে না। বাংলাদেশে বিপন্ন গণতন্ত্র রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় সমঝোতামূলক চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছে। কখনো স্বাভাবিক হওয়ার জন্য রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলেও ধীরে ধীরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হলে জনগণের মধ্যে যে আশার বাণী সঞ্চার হয়েছিল, তা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনের ফলে বাধাগ্রস্ত হয়। গণতন্ত্র রক্ষার নামে—অর্থাৎ অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনার জন্যই ১৯৯১ সালে অন্তর্বর্তীকালীন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির জন্ম হয়েছিল। আর পরবর্তীকালে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেন্দ্রিক এবং নির্বাচনে রেফারি নির্ধারণে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের টানাপড়েনের ফলেই দেশে সামরিক-সমর্থিত ভিন্ন মডেলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্ম হয়েছিল। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একই সঙ্গে কারাগারে বন্দি করে পৃথিবীর ইতিহাসে নজির স্থাপিত হয়েছে। দুই বছর পর হলেও গণতন্ত্র রক্ষায়, গণতন্ত্রের মূল উপাদান সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা যায়। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াই আরো একটি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশন গঠন ও আগামী ২০১৯ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রশ্নে টানাপড়েন রাজনীতির সূত্রপাত হয়েছে। আওয়ামী লীগ বলছে, প্রধানমন্ত্রীকে সরকারপ্রধান রেখেই সংবিধানের রীতি অনুযায়ী নির্বাচন হবে, আর বিএনপি বলছে, প্রধানমন্ত্রীর অধীনে তারা কোনোভাবেই নির্বাচনে যাবে না। এতে বিষয়টি দাঁড়িয়েছে এমন যে নিয়মানুযায়ী নির্বাচনের মাঠে তাদের দলনেতাকে প্রধান রেখেই আওয়ামী লীগ খেলতে চায়। আর বিএনপি নিয়ম আর রেফারি না বদলালে খেলতেই নামবে না। অন্যদিকে সরকারের ইচ্ছা রয়েছে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যাওয়া।

সংগত কারণেই সবার মনে একই প্রশ্ন—যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে কি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে? নাকি নানা টালবাহানা শেষে বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে? আবার সরকার কি তাদের সিদ্ধান্ত থেকে নড়বে না? তাহলে সমাধান কী? আদৌ কি কোনো সমাধান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে তৈরি হবে? আর যদি হয়, তাও কি সেটি ক্ষণস্থায়ী? নানা প্রশ্ন আমাদের সামনে। তবে আমরা চাই স্থায়ী সমাধান। গোল কে খাবে আর কে দেবে, সেটি বড় কথা নয়, আমরা চাই গ্রহণযোগ্য এবং ন্যায্য সমাধান। তবে সমাধান ও সমঝোতার টানাপড়েনে বাংলাদেশে নতুন করে আবার কোনো ১/১১ সৃষ্টি হোক—এটা আমরা কেউই চাই না।

বাংলাদেশের রাজনীতি মোটামুটিভাবে দুটি মেরুতে বিভক্ত। একটি আওয়ামী মেরু আর অন্যটি বিএনপি কিংবা আওয়ামীবিরোধী মেরু। নব্বই-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি তিনবার এবং আওয়ামী লীগও তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি একবার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল। কারণ সেটি ছিল দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও দলীয় সরকারের অধীনে অনেকটা একতরফা নির্বাচন করলেও ক্ষমতার স্থায়িত্ব রক্ষা করতে পেরেছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে ছিল। আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনের বাইরে ছিল। মাত্রাগত দিক থেকে দুটি নির্বাচন প্রায় একই রকম। কাজেই নির্বাচন নিয়ে টানাপড়েন খেলায় বিএনপি আবারও নির্বাচনের বাইরে থাকলে আওয়ামী লীগের জন্য যেমন বিতর্ক তৈরি হবে, অন্যদিকে বিএনপিকেও এর মাসুল গুনতে হতে পারে—সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ফলে উভয় দলকেই বুঝেশুনে রাজনীতির মাঠে খেলার প্রস্তুতি নিতে হবে। বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনপ্রিয় এবং বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি। ফলে নির্বাচনকে প্রশ্নাতীতভাবে সম্পন্ন করার একমাত্র উপায় দুই বড় দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটি কিভাবে সম্ভব? নাকি আদৌ সম্ভব নয়?

সর্বদলীয় সরকার হোক আর নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার—যেটাই হোক না কেন, এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলকে নিজ নিজ অবস্থানে কিছুটা হলেও নমনীয় হতে হবে। নির্বাচনের স্বার্থে সমঝোতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা যেন হয় স্থায়ী। কারণ একটি স্থায়ী পদ্ধতি তৈরি না হলে সব সময়ই এই টানাপড়েনের রাজনীতি চলতে থাকবে। অতএব যেকোনো ইতিবাচক সমাধানের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের আন্তরিকতা এবং বিএনপির সদিচ্ছা রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রতীক হতে পারে।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com

 


মন্তব্য