kalerkantho


পাকিস্তানে উর্দুর আগ্রাসনে সব ভাষা কোণঠাসা

শাহজাদ আহমেদ

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গে পাকিস্তানের স্মৃতি যুক্ত এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে দিবসটি আমাদের ইতিহাসের কোনো সুখের অধ্যায় হিসেবে নেই।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিক্ষোভ করেন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে এবং তাদের গুলিতে বেশ কিছু শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। ঘটনাটি দেশজুড়ে অস্থিরতার জন্ম দেয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহু ভাষার সহাবস্থান নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে অনেক উপাদানই ভূমিকা রেখেছিল। তার মধ্যে আছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য এবং সীমান্তের ওপারের হস্তক্ষেপ। তবে যে মৌলিক উপাদানটি বাঙালির মনে অবিশ্বাসের বীজ বপন করেছিল, তা হচ্ছে বাংলা ভাষাকে প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদাদানে অস্বীকৃতি।

আজ এই ২০১৭ সালে যখন পাকিস্তানে আগামী আগস্টে ৭০তম স্বাধীনতা দিবস পালন করতে যাচ্ছি, এখনো জাতীয় পর্যায়ে আমাদের মাতৃভাষাগুলোর প্রতিনিধিত্ব করার প্রশ্নটি সমান প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক রয়ে গেছে। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ভাষাবিদ ড. তারিক রহমান ডন পত্রিকাকে বলেন, ‘পাকিস্তানে আজও আমরা আমাদের মাতৃভাষাগুলোকে যথাযথ মর্যাদা দিতে পারিনি। শিশুদের তাদের মায়ের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দিতে পারছি না, অথচ এ তাদের মৌলিক অধিকার।

শিশুদের তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য এমনকি শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যায় না। সিলেবাস নেই, পাঠ্যপুস্তক নেই। ’ ড. তারিক সব আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক ভাষা প্রসারের লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করতেও সরকারের প্রতি দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘সমসাময়িক পাকিস্তানের অন্যতম দাবি এটি। জাতীয় ভাষা অবশ্যই একের অধিক হওয়া উচিত। শিশুকে তার মায়ের ভাষায় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক, পাঠ্যপুস্তক সব তৈরি করতে হবে। ’

লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক রাসুল বখশ রইস মনে করেন, শুধু উর্দু ও ইংরেজি প্রাধান্য দিতে গিয়ে পাকিস্তানের মানুষকে তাদের মাতৃভাষা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি নিজে জরিপ চালিয়ে দেখেছি, আমাদের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাড়িতে নিজ নিজ মাতৃভাষা ব্যবহার করে না। তারা উর্দু কিংবা ইংরেজিতে কথা বলে। অথচ প্রতিটি মানুষেরই দায়িত্ব হচ্ছে তার নিজের ভাষাকে রক্ষা করা। ’ ‘মাতৃভাষার জন্য সবার গর্ব থাকা উচিত, কিন্তু পাকিস্তানের মানুষ তা ভুলে যাচ্ছে, যা দুর্ভাগ্যজনক’ মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এর মূল কারণ হচ্ছে প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণি এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে শুধু উর্দু ও ইংরেজি জানা লোকদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রচলিত ভাষাগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় ইনস্টিটিউট স্থাপনেরও দাবি জানান তিনি।

‘লোক ভিরসা’র প্রধান ফৌজিয়া সাঈদ বলেন, পাকিস্তানের সব ভাষারই জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত, সব যদি নাও হয় অন্তত প্রধান ১০টি ভাষাকে এই মর্যাদাদানের প্রস্তাব আমি করেছি।

পাকিস্তানের প্রবীণ সাংবাদিক মোবারিক এ ভিরক মনে করেন, পাকিস্তানের প্রধান প্রধান ভাষাকে অস্বীকার করার জের ধরে জাতীয় বিতর্কও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘সেরাইকি, বেলুচি এবং সিন্ধির মতো ভাষাগুলোকে অবশ্যই প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া উচিত। এই যে আমরা মূল ভাষাগুলোকে অবহেলা করছি, এর ফলে আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক পর্যায়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও ঘৃণার উদ্রেক হতে পারে। ’ মোবারিক বলেন, পাঞ্জাবি হচ্ছে পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা। এর পরও এই ভাষাকে অবহেলা করা হচ্ছে। লাখো কোটি শিশুর মাতৃভাষা পাঞ্জাবি। কিন্তু এই শিশুদের বেশির ভাগই প্রাথমিক শিক্ষা ইংরেজি, উর্দু, এমনকি অনেক সময় আরবিতে শুরু করতে বাধ্য হচ্ছে।

পাকিস্তান বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির এক রাষ্ট্র। ড. মেমন আবদুল মাজিদ সিন্ধির গ্রন্থ লিসানিয়াত ই পাকিস্তানে বলা হয়, পাকিস্তানে ৭২টি ভাষা ও ডায়ালেক্ট রয়েছে। এর মধ্যে আছে উর্দু, সিন্ধি, সেরাইকি, হিন্দকু, পাঞ্জাবি, বেলুচি, ব্রাহভি, পশতু, কাশ্মীরি, শিনা, কোহিশতানি, খাওয়ার, বালটি, লাদাখি, ব্রুশাসকি। উর্দু ছাড়াও অন্যান্য ভাষা কেমন শক্তিশালী তা তাদের উপভাষা দিয়েও বোঝা যায়। মেমন মাজিদ হিসাব করে দেখান, সিন্ধি ভাষার ১৩টি এবং পাঞ্জাবি ভাষার ২২টি ডায়ালেক্ট রয়েছে।

 

লেখক : পাকিস্তানের সাংবাদিক। গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজেস স্টিল ডিনাইড ডিউ স্ট্যাটাস’ শিরোনামে এই লেখাটি প্রকাশ করে


মন্তব্য