kalerkantho


ভোটের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু কথা

আবুল কাসেম ফজলুল হক

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভোটের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু কথা

যখন যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রিগ্যান রাষ্ট্রপতি এবং যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁদের উদ্যোগে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠনের কিছু আয়োজন দেখা যায়। তাঁরা বিশ্বপরিসরে মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতাবাদ, ‘উদার’ গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ (pluralism), এককেন্দ্রিকতাবাদ (unipolerism), নারীবাদ, মৌলবাদ-বিরোধিতা, এনজিও, সিএসও (Civil Society organization) ইত্যাদির ঘোষণা দেন এবং বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, জাতিসংঘ ইত্যাদির মাধ্যমে এগুলোর বাস্তবায়ন আরম্ভ করেন।

সেটি আশির দশকের ঘটনা। তথ্য-প্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তির বিপ্লব তখন আরম্ভ হয়েছে মাত্র। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ তখন নতুন প্রযুক্তির বিস্তার দেখে বিশ্বায়ন (Globalization) কথাটি ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ যে আসন্ন, এটা তখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বুঝে ফেলেছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এর আগে ও পরে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠিত হয়ে চলে।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে তখন মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যেতে থাকে। যাঁরা মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী বলে পরিচিত ছিলেন, কার্যত তাঁরা কোনো ঘোষণা না দিয়ে ওয়াশিংটনপন্থী হয়ে যান। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, পরিবেশবাদী আন্দোলন ইত্যাদিতে তাঁরা মেতে ওঠেন এবং এনজিও, সিএসও ইত্যাদিতে নিজেদের সমর্পণ করেন।

সাম্রাজ্যবাদের অনুসারী হয়ে কার্যত তাঁরা না সমাজতন্ত্রী, না গণতন্ত্রী হয়ে যান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তখন তাদের দলীয় ঘোষণাপত্র পরিবর্তন করে মুক্তবাজার অর্থনীতি ইত্যাদি ঘোষণাপত্রে গ্রহণ করে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের অন্ধ অনুসারী হয়ে যায়। দুটি দলই তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের এতটাই সমর্পণ করে যে ক্ষমতার স্বার্থে তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে ক্রমাগত ধরনা দিতে থাকে। বামপন্থীরা তখন এ নিয়ে টুঁ শব্দটিও করেননি। এর মধ্যে এনজিও এবং সিএসও মহলের অঘোষিত প্ররোচনায় পরিচালিত হয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনকালীন অরাজনৈতিক, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে এবং ভারতকে ডেকে আনা হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই রাজনীতি কি গণতান্ত্রিক? সমাজতান্ত্রিক? দুই দলের নেতারাই জনসমক্ষে সব সময় উদার গণতন্ত্র কথাটা আওড়িয়ে থাকেন। সেই ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি কি গণতন্ত্রের দিকে এগিয়েছে? সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করে চলছে? বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিক্ষানীতি কি সংবিধান নির্দেশিত পথে চলছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে একমাত্র যে নীতি কার্যকর আছে, তা কি নিছক সুবিধাবাদী নয়? ইসলামপন্থী দলগুলো কি ইসলাম অবলম্বন করে চলছে?

এখন বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কিছু কথাবার্তা চলছে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নানা আয়োজন দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। তা নিয়েও দুই পক্ষে দুই মত দেখা যাচ্ছে। আসলে এসব আলোচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা আগ্রহী। এনজিও এবং সিএসও আগ্রহী। প্রচারমাধ্যম আগ্রহী। জনসাধারণ যে এগুলোতে আগ্রহী, তা আমার মনে হয় না। জনগণ রাজনীতি ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি নেই। কেবল দলাদলি আছে। বৃহৎ শক্তিবর্গের বিরাজনৈতিকীকরণের নীতি বাংলাদেশে খুব কার্যকর হয়েছে। জনগণের কথাবার্তায়—গ্রামে ও শহরে—শোনা যায়, ‘দেশে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো নেতা নেই আর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল নেই। ...’ জনগণের কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, জাতীয় সংসদের আগামী নির্বাচনে অবশ্যই আওয়ামী লীগ বিরাট সংখ্যাধিক্য নিয়ে জয়ী হবে। এই অবস্থায় নির্বাচনকে খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল না করাই বাঞ্ছনীয়।

নির্বাচন যেভাবে হয়ে আসছে, তাতে নির্বাচন নিয়ে জনগণের উন্মত্ত হয়ে ওঠার কোনো কারণ নেই। নির্বাচন দিয়ে কি সব সময় গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়? নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রবিরোধী, গণবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে—এমন দৃষ্টান্তও অনেক আছে। হিটলার অসাধারণ জনপ্রিয় ও নির্বাচিত ছিলেন। মুসোলিনি অসাধারণ জনপ্রিয় ও নির্বাচিত ছিলেন। সালাজার, ফ্রাংকে—এমন আরো অনেক বিখ্যাত শাসকের নির্বাচিত হওয়ার কথা বলা যায়। নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র হয় না, নির্বাচিত হলেই কোনো ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হয় না। নির্বাচন আর গণতন্ত্র এক না।

বাংলাদেশে ভুল ধারণা প্রচলিত হয়েছে যে নির্বাচনই গণতন্ত্র। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব আছে, পরিবারতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতি আছে, নির্বাচনের নামে আজব সব কর্মকাণ্ড আছে। সর্বত্র দুর্নীতি আছে। বাংলাদেশের চলমান ঐতিহাসিক প্রবণতা গণতন্ত্রের দিকে নয়। গণতন্ত্রের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য।

নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশে চলছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা, রাজনৈতিক দলের প্রধান, প্রশাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইত্যাদি অবস্থানে নারীরা আছেন। নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে। কিন্তু সমাজের স্তরে স্তরে নারী নির্যাতন বাড়ছে। নারী হত্যা বেড়ে চলছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ও পরিবার শিথিল হচ্ছে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই অশান্তি বাড়ছে। শিশুহত্যা বেড়ে চলছে। মানুষের নৈতিক পতন বাড়ছে। সমাজে স্তরে স্তরে কিছু লোক সীমাহীন জুলুম-জবরদস্তি চালাচ্ছে। জুলুম-জবরদস্তি বাড়ছে। ২০১৯ সালে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর জুলুম-জবরদস্তির গতি আরো বাড়তে পারে। সরকারি অফিসে দুর্নীতি বাড়ছে। সাধারণ মানুষ মনোবলহারা—অসহায়। কোনো কিছু নিয়েই তাদের কোনো অভিযোগ নেই। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-বাদলকে যেমন লোকে মেনে নেয়, তেমনি জুলুম-জবরদস্তিকেও লোকে মেনে নিচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রের জনজীবনে এই মনোবলহারা অবস্থাই সেই রাষ্ট্রের দুর্গতির চরম পর্যায়। কিন্তু এ সম্পর্কে রাজনৈতিক মহলে কোনো সচেতনতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার মনে করছে, সরকার সব কিছু ঠিক করছে—সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বুদ্ধিজীবীদের প্রধান অংশ এনজিও এবং সিএসওতে ব্যস্ত। কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে গভীরতর কোনো জীবনবোধের পরিচয় নেই। এর সঙ্গে সুস্থ, স্বাভাবিক, গভীর চিন্তা কিছু আছে। কিন্তু সেগুলো প্রচারমাধ্যমে গুরুত্ব পায় না, শিক্ষিত সমাজও সেগুলোর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। অন্ধকারকে অন্ধকার মনে না করে সবাই নিশ্চিন্ত আছে।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নিয়ে চলছে সবাই। ক্লিনটন-হিলারি-ওবামার নীতির প্রতি যাঁদের অন্ধ আস্থা ছিল, তাঁরা ট্রাম্পের উত্থানে বিচলিত হয়েছেন। ট্রাম্প কী করবেন, করতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ভালো কিছু হবে, তা মনে হয় না। ট্রাম্প বলছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করবেন, অনুন্নত রাষ্ট্রের উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি নেবেন না। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নারীবাদে আস্থাশীল নন, তিনি হিউম্যানিজমে বিশ্বাস করেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেবেন। তিনি Armed Islamic Fundamentalist-দের বিরুদ্ধে কঠোরতর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এমনই আরো নানা কথা। এসবের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়া চলছে।

বাংলাদেশে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের চলতে হবে আত্মনির্ভর (Self-relient) হয়ে। উন্নত বিশ্ব থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার একটা প্রগতিশীল দিক আছে—যার পরিচয় রয়েছে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি আদর্শে। এদিকটাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এর দ্বারা আমরা প্রগতির পথ পাব। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার আরেকটা দিক হলো, তাদের অপক্রিয়ার দিক। এতে রয়েছে তাদের উপনিবেশবাদ, ক্রুসেড, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের দিক। এদিকটায় রয়েছে আগ্রাসী যুদ্ধ। এটা বর্জনীয়। পাশ্চাত্য প্রগতিশীল বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের মতো করে যত গ্রহণ করতে পারব ততই আমাদের মঙ্গল।

যে দুর্গত অবস্থা বাংলাদেশে চলছে, তাতেও যাঁরা সুস্থ-স্বাভাবিক ও প্রগতিশীল মনোভাব এবং চিন্তা ও কর্ম নিয়ে আছেন, তাঁদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। জাতীয় অবস্থার সঙ্গে বৈশ্বিক অবস্থাকেও পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় গ্রহণ করতে হবে। দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য