kalerkantho


সাদাকালো

রোহিঙ্গা সমস্যায় আন্তর্জাতিক তৎপরতা জরুরি

আহমদ রফিক

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা সমস্যায় আন্তর্জাতিক তৎপরতা জরুরি

শেষ পর্যন্ত গৌতম বুদ্ধের অনুসারীদের এমন দুর্মতি? অহিংস জীবনাচরণের শান্তশীল নীতি বিসর্জন দিয়ে একদিকে মিয়ানমারের রাখাইন বৌদ্ধদের প্রতিবেশী রোহিঙ্গা মুসলমানের ওপর সহিংস হামলা, অন্যদিকে তাদের দুর্বৃত্তপনায় জ্বালানি যোগ করে চলেছে মিয়ানমারের কথিত গণতন্ত্রী শাসন ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের ব্যাপক মহড়া, যা এত দিনে জাতিসংঘের কর্তাব্যক্তিদের নজরে এসেছে।

প্রসঙ্গত একটা কথা বলি।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশে দেখা গেছে কথিত গণতন্ত্রের মানসকন্যা অং সান সু চির ওপর আস্থা, যেন সু চি ক্ষমতায় এলেই সেই বহুশ্রুত নাটকীয় ডায়ালগ ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। ’ কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের কোলে লালিত সু চি তাঁর প্রগতিবাদী পিতা অং সানের যথার্থ রাজনৈতিক অনুসারী নন। ক্ষমতা দখলই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, তা যেনতেন প্রকারে। এ কথা একাধিকবার লিখেছি আমার বিচার-বিশ্বাসে ভর করে।

এখন অংশত ক্ষমতাসীন হয়ে সু চির কথায় ও কাজের ফারাক, বিশেষ করে সম্প্রচারবাদী ধ্যান-ধারণা ও তৎপরতা প্রায় সবারই বোধোদয় ঘটাতে সাহায্য করেছে। চোখের সামনে গণহত্যা দেখেও সু চি অন্ধ, এমনকি তাঁর বক্তব্য-বিবৃতিতে সেসব পৈশাচিক ঘটনা ঢাকা দেওয়ার প্রয়াস, অস্বীকার তো বটেই। আমাদের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে।

এখন দেখছি একাধিক দৈনিকে এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। লেখা হচ্ছে উপসম্পাদকীয় কলাম, এমন শিরোনামেও : ‘গণহত্যার কবলে মিয়ানমার’, ‘রোহিঙ্গা নির্যাতন গণহত্যার শামিল’ ইত্যাদি।

অবশ্য শেষোক্ত বক্তব্য বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের। তা ছাড়া জাতিসংঘেরও কানে পানি ঢুকেছে। সরেজমিনে অবস্থার জরিপে গঠিত হয়েছে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিবকে নিয়ে কমিশন।

প্রশ্ন করতে হয়, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’ রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের আলামত তো আজকের নয়। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে একদল নির্যাতিত রোহিঙ্গা বা মৃত্যুভয়ে ভীত রোহিঙ্গা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সীমান্তের শরণার্থী শিবিরে। এখন তো তারা প্রায় এ দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। এদের অনেকে জড়িত হয়ে পড়েছে অবৈধ ও সমাজবিরোধী তৎপরতার সঙ্গে। কেউ কেউ জড়িত মাদক ও অপরাধজগতের সঙ্গে। বাংলাদেশ সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ জোরালোভাবে নেয়নি।

আর এখন তো মিয়ানমারের পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ যে বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে দলে দলে এখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রবেশ চলছে। বাংলাদেশের জন্য এ তৎপরতা সংকটজনক। তবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও এদের বিতাড়িত করতে পারছে না সরকার। ধর্মীয় চেতনার টানে অনেক বাংলাদেশি এদের নিজ দেশে আশ্রয়দানে সহানুভূতিশীল। মানবিকতা বলে কথা।

কিন্তু এ দেশের শাসনব্যবস্থার চরিত্র বিচারে কেউ যদি এজাতীয় ঘটনায় অশনিসংকেত দেখতে পান, তাহলে যুক্তি ভিন্ন কথা বলবে বলে মনে হয় না। গত কয়েক বছরে এ সম্পর্কে—অর্থাৎ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আশু তৎপরতার জন্য একাধিক নিবন্ধ লিখেছি। তাতে হয়তো কেউ অমানবিকতার আভাস পেতে পারেন। কিন্তু এ ঘটনা যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্বার্থে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিচক্ষণ ব্যক্তি মাত্রের না বোঝার কথা নয়।

পরিস্থিতি এখন এতটা সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে যে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘকে এ বিষয়ে হাল ধরতে হচ্ছে। জানি না, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কতটা উদ্বিগ্ন, কতটা সতর্ক। কিন্তু বাস্তব বিবেচনায় পরিস্থিতি গুরুতর। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ‘রেড অ্যালার্ট’ তৎপরতা না দেখালে ভবিষ্যৎ বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠবে।

 

কথাটা বলছি এ জন্য যে খোদ কফি আনান কমিশন সরেজমিন তদন্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শনাক্ত করতে পেরেছে, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিবেচনায়। তাদের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ওপর উগ্র রাখাইন জাতীয়তাবাদী, এমনকি মিয়ানমার পুলিশ ও সেনা সদস্যদের ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলি।

এ অবস্থার জের হিসেবে যেনতেন উপায়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। ফলে এখনই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর পরও আমাদের টনক নড়ছে না।

এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে একসময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক জাতীয় সংকট দেখা দেওয়ার খুবই আশঙ্কা। স্বভাবতই এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করি।

কফি আনান কমিশন এতদসংক্রান্ত ঘটনাবলির পর্যালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন, যে বিষয়টি আমরাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কারণ শরণার্থী রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে এজাতীয় তথ্য তালিকার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

দ্বিতীয় বিষয়টি অধিকতর রাষ্ট্রনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। আনান কমিশনের মতে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অরক্ষিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের সহজ অনুপ্রবেশের সংখ্যা এত বেশি। অবশ্য স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ‘সীমান্ত যথেষ্ট সুরক্ষিত। ’ প্রশ্ন হলো, সীমান্ত যদি যথেষ্ট সুরক্ষিতই হবে, তাহলে এত সহজে এত রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটবে কেন? এ বিষয়ে বাংলাদেশের সতর্ক হওয়া দরকার।

উল্লিখিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলি, আমি উগ্র জাতীয়তাবাদী নই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক স্বার্থেই সংরক্ষণবাদী চিন্তা বিবেচনায় আসে। কারণ একাধিক। প্রথমত, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আয়তনে খুবই ছোট, বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতির দেশ হিসেবে পরিচিত, যা অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরির অনুকূল। তা ছাড়া ভিন্ন জাতি-সংস্কৃতির ভাষিক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিতে সামাজিক-রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করার যে আশঙ্কা থাকে, ইতিমধ্যে এ দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আচরণে তা প্রকাশ পেয়েছে একাধিক ঘটনায়।

জাতিসত্তা-ভাষা-সংস্কৃতির ভিন্নমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রায়ই অভিবাসীদের পক্ষে আশ্রয়দাতা দেশের মূল স্রোতের অন্তর্ভুক্ত হতে না পারার ঘটনাই দেখা যায়, যা রাষ্ট্রিক সমস্যাও তৈরি করে। যেমন দেখা গেছে ১৯৪৭-উত্তর পূর্ববঙ্গে মোহাজের বিহারিদের ক্ষেত্রে, যা বরাবর রাজনৈতিক-সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। আর সে সমস্যা বাংলাদেশ এখনো বহন করে চলেছে স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরও। নতুন করে অনুরূপ সমস্যা ডেকে আনার পরিণাম কি বাংলাদেশ বহন করতে পারবে? সে জন্যই আপাত অপ্রিয় কথাগুলো বলা।

দুই.

বাংলাদেশের ইতিহাস আরাকানি মগ-বর্মি-পর্তুগিজ দুর্বৃত্তদের চরম অমানবিক রক্তাক্ত তৎপরতার কাহিনী ধরে রাখলেও এ দেশের শিক্ষিত জনশ্রেণি এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়, বিস্মৃতিপ্রবণ তো বটেই। ইতিহাস-অসচেতন জাতি বলেই বহিরাগত দস্যুদের আগ্রাসী নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার ইতিহাস মনে রাখি না—এটা একধরনের আত্মবোধহীন মহত্ত্বের পরিচায়ক বলে ভাবা যেতে পারে।

এ তো গেল রোহিঙ্গা সমস্যার এক অভ্যন্তরীণ প্রাসঙ্গিক দিক। একই সঙ্গে এর ভিন্ন দিক রয়েছে; একদা বর্মি শাসকদের নিজ দেশেও নিষ্ঠুরতার অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা, যা উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী প্রভাবে (যদিও তারা গৌতম বুদ্ধের অহিংস ধর্মের অনুসারী) আধুনিকতা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ব্যবহারিক প্রকাশে উদার মানবিক চরিত্র অর্জন করতে পারেনি। এটা কি তাদের মহাজাতিগোষ্ঠীর জিনগত প্রভাবের প্রতিফলন?

কারণ যা-ই হোক, বহুজাতিক-বহুভাষিক ও একাধিক ধর্মবিশ্বাসী মানুষ অধ্যুষিত ব্রহ্মদেশ তথা মিয়ানমার তাদের জাতিগত সমস্যা রাজনৈতিক সমঝোতায় নয়, অস্ত্রের জোরে শেষ করতে চেয়েছে। রক্তস্রোতের টানে সমস্যা আরো জটিল হয়েছে—সমাধান তো দূরের কথা। তাই জাতিগত অশান্তি অব্যাহত রয়েছে এবং মিয়ানমারে দীর্ঘ সামরিক শাসনামলে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও রক্তাক্ত কাটাকুটি কম হয়নি। এখন তার ন্যক্কারজনক প্রকাশ প্রশাসনের ও স্থানীয় প্রতিপক্ষের রোহিঙ্গা নির্যাতন ও রোহিঙ্গা নিধনে।

এর বাড়বাড়ন্ত ঘটে চলেছে একপর্যায়ে রোহিঙ্গা গণহত্যায়। জাতিসংঘসহ বিশ্বমোড়লরা এ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে প্রতিকার-প্রতিরোধে মাথা ঘামাননি, ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক। সম্প্রতি পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করার ফলে তাঁদের নড়েচড়ে বসতে দেখা যাচ্ছে। কফি আনান কমিশন তেমন একটি প্রমাণ। এতে কতটা কী হবে, রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ হবে কি না, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে কি না বলা কঠিন। আন্তর্জাতিক শক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে জোর কদমে না হাঁটলে সাধারণত এ ধরনের সমস্যার সমাধান মেলে না।

কিন্তু সেখানে কাজ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থ। এ দিক বিচারে ইঙ্গ-মার্কিন থেকে চীন—কেউ ব্যতিক্রম নয়। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের মতো কট্টর ধর্মবাদী দেশগুলো ধর্মের নামে যত ধুয়া তুলুক, রোহিঙ্গাদের মানবেতর দুর্দশায় তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়, তাদের সমস্যা সমাধানে তৎপর হওয়া তো দূরের কথা। অথচ একাত্তরে এরাই বাংলাদেশে গণহত্যার পক্ষে দাঁড়িয়ে মুসলমান দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সংহতির জন্য অন্ধ সমর্থন জানিয়েছিল। তাদের ধর্মীয় চেতনা যে কতটা মেকি, কতটা আর্থরাজনৈতিক স্বার্থনির্ভর, তা তাদের বিদেশনীতি ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়।

রোহিঙ্গাদের অবস্থা ভাসমান কুর্দিদের চেয়েও মন্দ বলা চলে। তদুপরি এদের মধ্যে জনগোষ্ঠীর স্বার্থে লড়াকু রাজনৈতিক মনোভাবও দেখা যায় না, যেমনটা দেখা যায় কুর্দিদের ক্ষেত্রে। আরো একটি অপ্রিয় বিষয় হলো, এদের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায় ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক-সামাজিক স্বার্থের অনুকূল নয়। আর এই সূত্রে লক্ষ করা যাচ্ছে, কট্টর ইসলামী জঙ্গিবাদের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা, যা তাদের স্বার্থের পক্ষে কতটা অনুকূল, সে সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তাই রোহিঙ্গাদের পক্ষে দরকার তাদের সঠিক রাজনৈতিক আদর্শের নিশানা ঠিক করা, যা শুদ্ধ গণতন্ত্রমুখী হওয়া উচিত। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষে দরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে অবিলম্বে মিয়ানমারের অন্যায়, অনৈতিক ও অমানবিক ভূমিকার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা। এ ছাড়া জাতিসংঘ, আরব লিগ, ওআইসিসহ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিমান দেশ—বিশেষ করে সৌদি আরবের কাছে তথ্য-উপাত্তসহ তদবির করাও জরুরি। কারণ বিষয়টি রাষ্ট্রগত বিচারে দ্বিপক্ষীয় তথা বাংলাদেশ-মিয়ানমারের হলেও এর আন্তর্জাতিক তাৎপর্য অনস্বীকার্য। এ কাজে আর বিলম্ব নয়।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

 


মন্তব্য