kalerkantho


টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাংলাদেশ

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাংলাদেশ

সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ২০৩০ (এসডিজি) মূলত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস ২০১৫ (এমডিজি)-এর উত্তরসূরি এবং তাদের সফলতা ও সীমাবদ্ধতার ওপর নির্মিত। ২০১৫-পরবর্তী বৈশ্বিক এজেন্ডা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭টি লক্ষ্য এবং ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রার সংকলনে ‘আমাদের বিশ্বের রূপান্তরকরণ : টেকসই উন্নয়নের বিষয়সূচি ২০৩০’ নামে পরিচিত।

২০১৫-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিষয়সূচির পার্থক্য হলো যে প্রথমটি সমস্যা, সমাধান ও উন্নয়নকেন্দ্রিক; আর দ্বিতীয়টি সমস্যার কারণ অন্বেষণ, শিকড় অপসারণ ও টেকসই উন্নয়নের উদ্দেশ্যে উন্নয়নের বিষয়সূচি, সব লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আন্তসংযোগ স্থাপনকারী।

ভালো অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও এসডিজি সমালোচনার বাইরে নয়। ইকোনমিস্টের (২৬ মার্চ ২০১৫) তাফসির শিরোনাম ‘১৬৯টি আজ্ঞা’ (‘The 169 Commandments’) ও উপশিরোনাম ‘প্রস্তাবিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বেহুদার চেয়েও খারাপ হবে’। এটি প্রকাশ করে যে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি ও জগাখিচুড়ি, তা অর্জন করা অত্যধিক ব্যয়বহুল ও কার্যকরীভাবে অসম্ভব। এ ছাড়া আমার মনে হয়, অনেক দেশের সমষ্টিগত গোল ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার দক্ষতা বা ক্ষমতাই নেই এবং বৈশ্বিক উন্নয়নে স্থানীয় প্রেক্ষাপট পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে গ্লোবাল উন্নয়ন সহযোগিতা ও উন্নয়ন তহবিল বিতরণ-রাজনীতি একটা বিরাট ফ্যাক্টর হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, কার্যকরী উন্নয়ন সহযোগিতার জন্য বিশ্বব্যাপী অংশীদারের পর্যবেক্ষণ প্রফাইল অক্টোবর ২০১৬ অনুযায়ী, সরকার সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (২০১৬-২০) চালু করেছে। উভয়টি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডা বা টেকসই উন্নয়ন বিষয়সূচি, লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত ও বিজড়িত। এ পর্যায়ে ১৭টির মধ্যে ১৪টি এসডিজি লক্ষ্য সম্পূর্ণরূপে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়।

এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক এবং সব সেক্টর এলাকাজুড়ে একটি উন্নয়ন ফলাফল ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে সরকার সরকারি ব্যয়ের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক বিবেচনায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। উপরন্তু স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের লক্ষ্য বিবেচনায় বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির আলোকে উন্নয়ন ভিশন ২০২১ প্রণীত হয়। ভিশন ২০২১ এবং তার পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১-এর অধীনে দুটি জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা : ‘প্রবৃদ্ধি ত্বরণ এবং দারিদ্র্য হ্রাস’ শিরোনামে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১০-১৫) এবং ‘প্রবৃদ্ধি ত্বরক, নাগরিক ক্ষমতায়ন’ শিরোনামে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) প্রণয়ন করা হয়।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল মূলত একটি বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের দর্শন কাঠামো। এর মাধ্যমে একদিকে এমডিজির চূড়ান্ত পর্যায়ের লক্ষ্য অর্জন করা হয়; অন্যদিকে ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (এমডিজি) ১ থেকে ৬ অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য ছিল অসাধারণ। উপরন্তু দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি; কিন্তু বিপরীত চিত্র নর্থ-সাউথ সহযোগিতার ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। এমডিজি-৭ ও এমডিজি-৮ অর্জনে ব্যর্থতা মানে এই নয় যে শাসন ব্যর্থতা। জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত বৈশ্বিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক তহবিলের অসম বণ্টন স্পষ্ট ছিল। এ ছাড়া উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারের লক্ষ্যটিতে উদ্দেশ্য ও পরিমাপগত সীমাবদ্ধতা ছিল।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি জাতিসংঘের ২০১৫-পরবর্তী বৈশ্বিক এজেন্ডা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় পরিকল্পিত। এর মৌলিক তিনটি থিম হলো : (১) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাসকরণ; (২) উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং উন্নয়নের উপকার লাভ করার জন্য নাগরিকদের ক্ষমতায়নের একটি ব্যাপকভিত্তিক কৌশল; (৩) একটি টেকসই উন্নয়নের ফ্রেমওয়ার্ক, যেটি জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন এবং দুর্যোগ ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম, যেটি প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং সফলভাবে অনিবার্য নগরায়ণে রূপান্তরটি পরিচালনা করবে।

বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের ওপর উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামের ‘২০১৭ জাতীয় স্বেচ্ছাসেবী পর্যালোচনা’র অংশ হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গসমতা চেতনা, অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা, বেসরকারি খাতের উদ্যোগ ও নতুনত্ব, মানব উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তা সত্ত্বেও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৬ প্রকাশ করে যে সত্যি মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেতে অনেক বেশি বিনিয়োগ, শক্ত-সমর্থ উন্নয়ন সহায়তা, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন এবং উন্নত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা স্থাপন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সমুন্নত রাখতে হবে। উপরন্তু বিশ্বব্যাপী অংশীদারের পর্যবেক্ষণ প্রফাইল অক্টোবর ২০১৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি সক্রিয় ও ক্রমাগত স্থিতিশীল পরিবেশ, সরকারি খাতের সুশাসন এবং সরকার ও বিচার বিভাগের দক্ষতা ও সততা শক্তিশালীকরণ, একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও ক্রমবর্ধমান শহুরে শ্রমশক্তির কার্যকরী ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ও বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।

 

লেখক : স্থানীয় শাসন ও উন্নয়ন বিশ্লেষক

rafiqul.talukdar@gmail.com

 


মন্তব্য