kalerkantho


পাঠ্যপুস্তক ও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা!

ফরিদুর রহমান

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাঠ্যপুস্তক ও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা!

একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে আমরা বাংলাদেশ টেলিভিশনে বেশ কিছু নতুন অনুষ্ঠান প্রযোজনার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’। ভোরে অধিবেশন শুরুর পরপরই স্বদেশ বন্দনা এবং তারপর প্রাতঃস্মরণীয় মানুষের জন্ম-মৃত্যু এবং দিনের প্রয়োজনীয় নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাজানো এই অনুষ্ঠানটি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ২০০১ সালের অক্টোবরে সরকার পরিবর্তনের পরও বেশ কিছুদিন ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ নামে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরই সদ্য টেলিভিশনে যোগ দেওয়া একজন মহাপরিচালক অনুষ্ঠান সম্পর্কিত একটি সভায় জানতে চাইলেন, অনুষ্ঠানের নাম ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ কেন দেওয়া হয়েছে? আমাদের একজন সহকর্মী উৎসাহের সঙ্গে জানালেন, এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গান থেকে নেওয়া এবং ভোরের সূর্যোদয় থেকেই বাংলাদেশকে মনের মধ্যে ধারণ করে যেন সারা দিনের কর্মসূচি তৈরি করা যায় সে লক্ষ্যেই এই নামকরণ। আমি আরেক ধাপ এগিয়ে জানালাম, ১৯৭১ সালে এই গানটি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছে এবং আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। মহাপরিচালক মহোদয় একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনারা এত কিছু জানেন আর এই গানটা যে হিন্দুদের দেবী কালীর উদ্দেশে লেখা তা জানেন না? ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কা হরণ—তার মানে বোঝেন?’ তিনি উত্তরের অপেক্ষা না করে অনুষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন। পরের সপ্তাহ থেকে অনুষ্ঠানের নতুন নাম হলো ‘শুভেচ্ছা নিন’।

আজ এত দিন পরে পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘হিন্দু ও নাস্তিক’ কবি-লেখকদের কয়েকটি কবিতা, গল্প ও ভ্রমণকাহিনি বাদ দেওয়ার পর সংগত কারণেই বিষয়টি নতুন করে মনে পড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল সময়টা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল। রাষ্ট্রক্ষমতার মূল অংশীদারি বিএনপির হলেও সে সময় বুদ্ধিবৃত্তিগত সুদূরপ্রসারী নীতিমালা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেছে সহযোগী জামায়াতে ইসলামী।

২০০৩ সালে প্রণীত পাঠ্যপুস্তকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বিকৃত করা হয়েছে স্বাধীনতার ইতিহাস, ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করলেও সব বিভ্রান্তি ও বিকৃতি দূর করে একটি গ্রহণযোগ্য বই শিশুদের হাতে তুলে দিতে প্রায় চার বছর সময় নেয়। আমাদের আশা ছিল, ২০১৩ সালের এই পাঠ্যসূচি পরের বছরগুলোতে বিজ্ঞজনদের পরামর্শ, মেধা ও মননের সমন্বয়ে ও সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে আরো সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড যখন চারদলীয় জোটের পাঠ্যক্রম নতুন করে ফিরিয়ে আনে তখন প্রশ্ন জাগে, এনসিটিবি আসলে কার নির্দেশে চলে?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও একের পর এক বাঘা বাঘা যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকর হওয়ার ফলে কিছুটা বেকায়দায় থাকা জামায়াতের প্রণীত পাঠ্যসূচি বাস্তবায়নের কাজে নেমেছে হেফাজতে ইসলাম আর তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব নিয়েছে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির।   পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়ে যে সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়েছে, তাদের নামের আগে-পেছনেও জামায়াতের মতোই ‘ইসলাম’ শব্দটি যুক্ত রয়েছে। কিন্তু নাম যাই হোক, তারা যে প্রকারান্তরে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে চলেছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার, সরকারের ভেতর থেকে এই পরিবর্তনের দায়দায়িত্ব কেউ সরাসরি স্বীকার করেননি।

পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তনগুলো সামনে রেখে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিয়েছে তা হলো, এখন থেকে ৪৬ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করা হচ্ছে কেন? আমরা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত সংবিধানে যে আদর্শ ও নীতির আলোকে একটি অসাম্প্রদায়িক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম; দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীলদের নানা ষড়যন্ত্র, নির্মম হত্যাকাণ্ড ও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পথ পেরিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের যখন সবচেয়ে উপযুক্ত সময়—তখন এ ধরনের বিভ্রান্তির জটাজাল বিস্তার করছে কারা?

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাঙালির এই বিপথ যাত্রাকে পশ্চাৎপদতা বলা বোধ হয় মোটেও সংগত নয়। কারণ অতীতে অর্থাৎ ১৯৭২ সালেই আমরা ব্যাংকগুলোর নাম রেখেছিলাম সোনালী, অগ্রণী, জনতা, উত্তরা ও পূবালী। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সবই এখন ইংরেজি, আরবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাসের নাম ছিল সোনারতরী, শুভযাত্রা, পথের সাথি ইত্যাদি। এখন নতুন নাম হয়েছে ওয়েলকাম, ট্রান্স সিলভা, আবাবিল, লাব্বায়েক ও জাবালে নূর! ৯০ শতাংশ বাঙালি পরিবারে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র ছাপা হয় ইংরেজিতে। অফিস-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজিতে জীবনবৃত্তান্ত জমা না দিলে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা যদি ব্যাহত হয়, তা হবে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে যাত্রা। একবার সেই গুহার আঁধারে ঢুকে পড়লে প্রভাত পাখির গান শোনার জন্য আবার রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হতে হবে। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকবেন কি না সেটাই ভাবনার বিষয়।     

 

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক

বাংলাদেশ টেলিভিশন


মন্তব্য