kalerkantho


সাদাকালো

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে

আহমদ রফিক

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে

মেধাবী হিসেবে পরিচিত ইহুদি সম্প্রদায়ের বড় স্ববিরোধিতা, তারা তাদের কথিত ‘শাইলক চরিত্র’ বিসর্জন দিতে পারেনি। ধর্মীয় চেতনানির্ভর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তারা বিশিষ্ট এই রক্ষণশীলতাকে আধুনিক চেতনার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে এতটা অনড় যে বিশ্বমনীষার কোনো সমালোচনা তারা গ্রাহ্য করে না। এর বড় কারণ তাদের রাজনৈতিক-মহাজনি খুঁটি যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তিহীন, অন্ধ সমর্থন। মাঝেমধ্যে এক-আধজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধে অসহায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নমনীয় মনোভাব প্রকাশ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব পড়ে না। তাই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মৌখিক সদিচ্ছা সদিচ্ছাই থেকে যায়, তা বাস্তবের মাটিতে গভীর কোনো দাগ কাটে না।

বিশ্ব উদ্বাস্তু হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে চিহ্নিত ইহুদিদের ঐতিহাসিক যাযাবরবৃত্তির অবসান ঘটে হিটলারের ইহুদি গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব পরাশক্তি সেদিকে সহানুভূতির নজর দেওয়ার কারণে। যুদ্ধশেষে মিত্রশক্তির প্রধানরা ফিলিস্তিনিদের কবরে ঢুকিয়ে ভ্রাম্যমাণ ইহুদিদের জন্য একখণ্ড ভূমি বরাদ্দ করে ইসরায়েলি ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। বিস্ময়কর যে এ ব্যবস্থার অন্যতম সমর্থক সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা যোসেফ স্ট্যালিনও হতভাগ্য, আরেক ভ্রাম্যমাণ জাতিগোষ্ঠী আরব-ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রহীন অবস্থার দিকে ফিরে তাকাননি।

বিষয়টি কার্যকর করা হয় জাতিসংঘের খবরদারিতে। যে জাতিসংঘ এখন অবিচারের শিকার ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে, সেই বিশ্ব সংস্থাও তখন ফিলিস্তিনিদের বাসস্থান ব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামায়নি, তাদের জন্য স্থায়ী রাষ্ট্রের ব্যবস্থা করা দূরে থাক।

নির্দিষ্ট জাতিসত্তার প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ আন্তর্জাতিক পরিপ্রক্ষিতে মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও ফিলিস্তিনি সমস্যাটির ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

আর এ সমস্যা যেহেতু মূলত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সৃষ্টি, হয়তো তাই ইঙ্গ-মার্কিন পরাশক্তি ফিলিস্তিনি সমস্যা নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামায়নি। ঘামায়নি তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে। সাম্রাজ্যবাদের বড় তরফ তথা বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ইসরায়েলি লবির প্রাধান্য, অনেকের মতে ওয়াশিংটনের অন্ধ ইসরায়েলপ্রীতির কারণ। তা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় রাষ্ট্রপ্রাধান্যের ভুবনে বিপরীত ভিন্নধর্মীয় চরিত্রের একটি খণ্ড রাষ্ট্রের জন্য পরাশক্তিগুলোর এত মাথাব্যথা হবে কেন?

তারা ইসরায়েলের আণবিক অস্ত্রশক্তি নির্বিচারে মেনে নেবে কিন্তু মানবে না ইরানের বেলায়, মানবে না উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে। বরং ইসরায়েলি মেধা ও চাতুর্য পরাশক্তির রাজনৈতিক দাবা খেলায় সহায়ক মিত্রশক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। ইসরায়েল পরাশক্তির এ দুর্বলতা নিজ স্বার্থে বরাবর কাজে লাগিয়েছে। লাগিয়েছে আধিপত্যবাদী জবরদস্তির বসতি বিস্তারে। তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে আরববিরোধী প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি। এক সময়কার ফিলিস্তিনি চরমপন্থা অজুহাত মাত্র।

তাই কিছু সময় আগেকার ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিচুক্তি এবং উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের গাজা ভূখণ্ডে সাময়িক রাষ্ট্রিক আস্তানার ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার ঘোরবিরোধী ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতা সবাই। কিছুটা নমনীয় চরিত্রের শিমন পেরেজ থেকে কট্টর নেতানিয়াহু এ ক্ষেত্রে এক নৌকার যাত্রী। তা ছাড়া ইসরায়েলি রাজনীতিতে রক্ষণশীলতার বিপরীতে সমাজতন্ত্রী কোনো প্রভাব লক্ষ করা যায় না। একধরনের অত্যাধুনিক ধর্মীয় রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে সচল ইসরায়েল। প্রগতিবাদী চেতনার কোনো প্রকাশ নেই সেখানে।

আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ইহুদি মাত্রেরই রাজনৈতিক মত-পথ-নির্বিশেষে ইহুদি-সোভিনিজমের পাশাপাশি ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি একাত্মতা পোষণ এবং ইসরায়েলের অন্যায়-অত্যাচারের মুখেও তাদের প্রতি নীরব বা সরব সমর্থন। তাই যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিভূ ইহুদি চিন্তাবিদ বা মননশীল বুদ্ধিজীবীকে ইসরায়েলি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায় না। একালে এর বড় উদাহরণ গণতান্ত্রিক বিশ্বের মননশীল চিন্তার প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত নোয়াম চমস্কি। আধিপত্যবাদী আগ্রাসন বা স্বৈরাচারী অনাচারের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার চমস্কিকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বর্বরতার প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না। নীরবতাই সেখানে শ্রেয় বিবেচিত।

পাশাপাশি এ কথা সত্য যে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিমান রাজতন্ত্রী আরব দেশগুলোকে ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতি জাতিগত সমধর্মিতা সত্ত্বেও তাদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে বলিষ্ঠ প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখা যায় না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শিবির বিবেচনা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পায়। এবং ফিলিস্তিনবিরোধী সাম্রাজ্যবাদকে সমর্থন করতে তাদের বাধে না। ফিলিস্তিনিরা এজাতীয় রাজনৈতিক দাবা খেলার শিকার। এ এক জাতিগত ট্র্যাজেডি, যেমন দেখা যায় কুর্দি জাতিসত্তার ক্ষেত্রেও।

দুই

অসম রাজনীতির এজাতীয় অবিচারের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে একদা দেখা গেছে, ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামী ইয়াসির আরাফাতের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির গোপন ষড়যন্ত্র, ইসরায়েল-বিরোধিতার শিড়কবাকড় কেটে ফেলার তাগিদে ফিলিস্তিনিদের প্রধান রাজনৈতিক মুখপাত্র ইয়াসির আরাফাতকে শক্তিহীন করার চক্রান্ত, শেষ পর্যন্ত তাঁকে কৌশলে সরিয়ে ফেলার সফল চক্রান্ত ঠিকই কার্যকর করা হয়েছে। আরাফাতের মৃত্যু স্বাভাবিক, না তিনি গোপন হত্যাকাণ্ডের শিকার, সাম্রাজ্যবাদীদের কল্যাণে এ ধাঁধার অবসান ঘটেনি। সত্য আর কখনো বেরিয়ে আসবে না। যেমন উদ্ঘাটিত হয়নি জন কেনেডি ও রবার্ট কেনেডির হত্যাকাণ্ডের রহস্য। এই হলো গণতন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র।

এখন বিশ্বরাজনীতিতে, এর উচ্চমহলে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিত্য বর্বরতা এবং গাজা ভূখণ্ডে ইহুদিদের লাগাতার বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক সামান্য মাত্রায় সোচ্চার। কিছুকাল আগেকার ডানা ঝটপটানিও এখন বড় একটা শোনা যায় না। জাতিসংঘ অবশ্য ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নড়েচড়ে বসায় ক্রুদ্ধ হুমকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর। এর কোনো প্রতিবাদ শোনা যায়নি পেন্টাগনের পক্ষ থেকে। অর্থাৎ জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি সমর্থন সত্ত্বেও মার্কিন হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেনি।

এ অবস্থায় হঠাৎ করেই ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস ঢাকা সফর করে গেলেন। আশ্চর্য, এ ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনো উচ্চবাচ্য লক্ষ করা গেল না। এমনকি সংবাদপত্র মহলেও আকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চঞ্চলতা দেখা যায়নি। অথচ ফিলিস্তিনিদের আপন ভূখণ্ডে ন্যায্য অধিকারের দাবি নিয়ে বাংলাদেশি জনতা ও রাষ্ট্রযন্ত্র দল-নির্বিশেষে বরাবর সোচ্চার ছিল। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে এ সমর্থন যতটা গণতান্ত্রিক চেতনার টানে, তার চেয়ে বেশি ধর্মীয় একাত্মতার ভিত্তিতে। এ এক অদ্ভুত মানসিকতা বাংলাদেশি শিক্ষিত শ্রেণির।

এবার মাহমুদ আব্বাসের ঢাকা সফরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়ার দুর্বল দৃশ্য থেকে শুধু অবাকই লাগছে না, ভাবতে হচ্ছে এর পেছনে রাজনৈতিক খেলা বা কার্যকারণটা আসলে কী? অথচ এখন তো বাংলাদেশিদের ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রসঙ্গে আরো সোচ্চার হওয়া দরকার। কারণ নৈরাজ্যিক চেতনার অতি বৃহৎ শিল্পপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন হোয়াইট হাউসে ক্ষমতায় আসীন। তাঁর হাতে রাজনীতি—রাজনীতির চাকা বিষমদিকে ঘুরতে শুরু করেছে।

তাঁর ইসরায়েল তোষণনীতি বাঁক নিতে যাচ্ছে বিশেষ করে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান—এই তিন ধর্মবিশ্বাসীদের চোখে পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের অধিকার নিয়ে বিতর্কিত ঘোষণায়। জেরুজালেম নিয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি দ্বন্দ্ব আজকের নয়। ইয়াসির আরাফাতের আমলে একসময় এ বিষয়টি বিতর্কের তুঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছে ছিল। এর মধ্যখানে আল-আকসা মসজিদ। যেটা পারলে ইহুদিরা সন্ত্রাসী হামলায় উড়িয়ে দেয়।

কিন্তু ছাড়বে কেন মুসলমানরা। বিশেষ করে সুন্নি মৌলবাদী গোষ্ঠী। কাজেই ট্রাম্প জেরুজালেম সমস্যার একপেশে সমাধান ঘটাতে চাইলে নতুন করে জ্বলবে আগুন। রাজনীতিমনস্ক মানুষ তাই ট্রাম্পের ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এতটা আগ বাড়িয়ে কথা বলতে এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেখা যায়নি। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক পদক্ষেপে সবার ঊর্ধ্বে, সবাইকে ছাড়িয়ে। নৈরাজ্যিক রাজনীতির শিরোমণি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

আগেই বলেছি, জেরুজালেম নিয়ে বিতর্ক ও সন্ত্রাসী ঘটনা আজকের নয়। কোনো পক্ষই তার অধিকার ছাড়তে নারাজ। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে কয়েক পা এগোলে, তা বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান এ দুই পক্ষেরই জেরুজালেমে অধিকার মেনে নেওয়া। জেরুজালেমের একাংশে রাজধানীভিত্তিক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে বাংলাদেশের একদা সমর্থন জোরালো ভাষায় আবারও উচ্চারিত হওয়া দরকার।

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসের অপেক্ষাকৃত নীরব ঢাকা সফর অনেকটা নিভৃতে শেষ হলো। এ সফরে ঢাকার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সংবাদপত্র মহলে কোনো প্রকার চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো না। রাষ্ট্রিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনি স্বার্থের পক্ষে কোনো রাষ্ট্রিক ঘোষণাও প্রকাশ পেল না। অথচ ট্রাম্পের রাজনৈতিক জামানার বিবেচনায় ঢাকায় ফিলিস্তিনি অধিকারের ইস্যুটি জোরে উচ্চারিত হওয়া দরকার ছিল। দৈনিকগুলোতে একাধিক প্রতিবেদন ও উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ ছাপা হওয়া অপরিহার্য ছিল। তাঁর সম্মানে লালগালিচা সংবর্ধনা তো কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দরকার জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন।

ঢাকায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সমর্থনে গঠিত বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠন এবং বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি অধিকারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সভা, মানববন্ধন ইত্যাদি প্রতিবাদী তৎপরতার মাধ্যমে ইস্যুটিকে জাগিয়ে রাখা এবং আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনা। সেই সঙ্গে সরকারকে এ বিষয়ে আরো সোচ্চার হতে আহ্বান জানানোও জরুরি কর্তব্য। জেরুজালেমকে রক্ষণশীল ইহুদিবাদের একতরফা মুঠো থেকে নিরাপদ রাখতেই হবে। এ ক্ষেত্রে আরব দুনিয়ারও এগিয়ে আসা উচিত।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য