kalerkantho


বই উৎসব ও আগামীর বাংলাদেশ

মো. শহীদ উল্লা খন্দকার

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বই উৎসব ও আগামীর বাংলাদেশ

নতুন বই হাতে নিলে কেমন আনন্দ, দুই মিনিট চোখ বন্ধ করে শৈশবে ফিরে গেলে তা স্ফটিকের মতো দেখতে পাওয়া যায়। নতুন বই হাতে নিলে সব পাতা না উল্টে পারা যায় কি? শৈশবে তো নয়ই, পরিণত বয়সেও অনেকেই পারেন না।

শৈশবে স্কুলপ্রেমী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছেই নতুন বই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বছরের প্রথম দিনের বই উৎসব দেখে মুগ্ধ হননি, এমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না। আর এখন চলছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বই যে মানুষকে টানে সেখানে পা রাখলেই তা মূর্ত হয়।

এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে আধুনিক সমাজে বই ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা যায় না। কেননা বই-ই মানুষের মনের দুয়ার খুলে দেয়, জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে, ভেতরে আলো জ্বেলে দেয়। মনুষ্যত্ব অর্জনেরও বড় পথ বই পাঠ। বই পাঠ আসলে মানুষের একটি অপরিহার্য উপাদান। মূলত মানসিক উত্কর্ষ সাধনে বই পাঠের কোনো বিকল্প নেই।

কথায় আছে, জ্ঞানের কোনো সীমা নেই। চৌহদ্দি নেই। জ্ঞান অসীম, অফুরন্ত, কোনো পাঠে বা দানে হ্রাস পায় না; বরং যত জ্ঞান লাভ করা যায় ততই মনের শ্রীবৃদ্ধি  ঘটে। একটু নিরীক্ষণ করলেই আমরা দেখতে পাব—সব যুগেই বই পাঠের বিকল্প ছিল না, ভবিষ্যতেও নেই। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে শুরু আজ পর্যন্ত মানুষ বই পড়ে। বই সর্বাবস্থায়ই আমাদের সহায়ক শক্তি। বই জীবনকে আলোকিত করে, বিকশিত ও পরিপূর্ণ করে। বই থেকে আমরা যা গ্রহণ করি তা জ্ঞান, প্রজ্ঞা কিংবা বিদ্যা। বই ছাড়া এর কোনোটাই সম্ভব নয়। যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন বই পড়ব? জবাবে বলব, বই পড়ব জ্ঞান বিকাশ, জ্ঞানপিপাসা ও জ্ঞানজিজ্ঞাসা মেটানোর জন্য। বই পড়ব ভদ্র, শালীন, মার্জিত ও সংস্কৃতিবান হওয়ার জন্য। সর্বোপরি বই পড়ব পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য।

কোমলমতি শিশুদের শৈশবকে রঙিন করছে পাঠ্য বই। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ চিনতে এখন আর ভুল হয় না শিক্ষার্থীদের। বছরের শুরুর দিনে সরকার বিনা মূল্যে বই দেবে—এ সহজ হিসাবও তাদের মুখস্থ। কারণ সরকার বই দেওয়ার বিষয়টিকে এখন রেওয়াজে পরিণত করেছে। আজ সন্তানের হাতে নতুন বই দেখে খুশি হচ্ছেন মা-বাবা। আগে নতুন বছরে এসে মার্চ-এপ্রিল নাগাদ নতুন বই পাওয়া যেত, তা-ও টাকা দিয়ে কিনতে হতো। কিন্তু এখন দিন বদল হয়েছে। আর এ পরিবর্তনের দিশারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার দূরদর্শী চিন্তার কারণে বছরের শুরুর দিনে নগর থেকে গ্রামে—সর্বত্রই বই উৎসবের আমেজ, এ দৃশ্য ভালো লাগার, এ দৃশ্য ভালোবাসার। বিনা মূল্যে পাঠ্য বই বিতরণের আট বছরে সরকারের অর্জন অনেক। যার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এবার সাড়ে চার কোটি শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ৩৬ কোটিরও বেশি বই। যাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে, এই শিশুরাই তো ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। তাদের জনসম্পদে পরিণত করছে সরকার। একযুগ আগেও বিনা মূল্যে পাঠ্য বই বিতরণ ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু সেই অসাধ্য সাধন করে চলেছে শেখ হাসিনার সরকার।

১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সব শিশুর বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। সদ্য স্বাধীন দেশে অর্থের অভাব থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু সে বছর ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ৪০ লাখ বিনা মূল্যের বই ছাপিয়ে তা বণ্টন করেন। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থীর জন্য বিনা মূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি চালু করেন। পরে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদেরও বই দেওয়া শুরু হয়। ২০১৩ সালে তিনি ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। এ বছর আরেকটি অসাধ্য সাধন করেছেন। প্রথমবারের মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিনা মূল্যে ব্রেইল বইয়ের ব্যবস্থা করেছেন। এক হাজার ২০১ জন শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে ১১টি বিষয়ে ৯ হাজার ৭০৩টি বই। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকার নৃগোষ্ঠী শিশুদের হাতে প্রথমবারের মতো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাদরি ও গারো—এই পাঁচটি ভাষার বই তুলে দেওয়া হয়েছে।

এ দেশে প্রতিটি সকাল আসে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। আর সেই সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রতিদিন গ্রাম কিংবা শহরে এভাবে জ্ঞানের আলোর দীক্ষা নিতে ছুটে যায় শিশুরা। কারণ শিক্ষা এখন সুযোগ নয়, অধিকার। আর বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার। গরিব অথবা সামর্থ্যবান সবার সন্তানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভের সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগকে ত্বরান্বিত করতে সরকার এক কোটি ৩০ লাখ শিশুর উপবৃত্তির সংস্থান রেখেছে। চালু রয়েছে স্কুলফিডিং কর্মসূচি। সম্ভাবনার স্রোতেই এখন শিক্ষার তরী, যা আমাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ সৃষ্টিতে শুধু আশাবাদীই করে তুলছে।

প্রাথমিক শিক্ষার বাতিঘর জ্বালিয়ে রাখছেন প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক। তাঁদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, তথ্য-প্রযুক্তির দক্ষতা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সনাতন পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে মাল্টিমিডিয়া পদ্ধতিতে পাঠদান চলছে। আধুনিক পদ্ধতিতে আনন্দময় পরিবেশে পড়ানোর সঙ্গে শিশুরা প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এসব তথ্য আমাদের আশাবাদী করে তুলছে আরো। চারদিকে বিনষ্ট হওয়ার যেসব উপকরণ ছড়িয়ে আছে, তার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। তার পরও এই কঠিন পথটিতেই টিকে থাকতে হবে আমাদের। দেশকে উন্নত বিশ্বের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে যথার্থ শিক্ষার বিকল্প নেই। অন্যদিকে আমাদের লক্ষ্য শিশুদের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বাঙালি জাতির গৌরবগাথা, শৌর্যবীর্যের ইতিহাস, মেধাকে শাণিত করতে হবে এসবে, যাতে তাদের মনে সব কিছুর ঊর্ধ্বে জেগে থাকে দেশপ্রেম। সে ক্ষেত্রে বেশি বেশি বই পড়া ও পড়ার সুযোগ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে হাঁটছি আমরা। শিক্ষা খাতে বিপ্লব সাধিত হচ্ছে। শিল্প-সাহিত্য, খেলাধুলায় ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখাচ্ছে বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা। দেখছি নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সমগ্র বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। এ  গতি অপ্রতিরোধ্য। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শত বাধা পেরিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে বাংলাদেশ—এ আমাদের বিশ্বাস।

 

লেখক : সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার


মন্তব্য