kalerkantho


নির্বাচন কমিশন কেমন দেখতে চাই

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাচন কমিশন

কেমন দেখতে চাই

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করিবেন সেই রূপসংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার লইয়া বংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দান করিবেন। ’ আরো বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন থাকিবেন’।

নির্বাচন কমিশন গঠন ও তাদের কাজের বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। এর আগে নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে একমাত্র ২০১২ সাল ছাড়া অন্যগুলো সার্চ কমিটির মাধ্যমে হয়েছে এমন কোনো নজির নেই। ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সেই সময় সার্চ কমিটিতে আওয়ামী লীগসহ ২৩টি দল নাম প্রস্তাব পাঠালেও বিএনপিসহ ১৬টি দল কোনো প্রস্তাব পাঠায়নি। এবারের সার্চ কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গুরুত্ব বহন করে এবং ব্যাপক সাড়া পায়। যে ৩১টি রাজনৈতিক দল মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে দেখা করেছিল, তার  মধ্যে ২৫টি দল নাম প্রেরণ করেছে, দুটি শুধু মতামত দিয়েছে এবং বাকিরা নাম ও প্রস্তাব কোনোটাই দেয়নি।

নির্বাচন কমিশন গঠন করার এখতিয়ার শুধু রাষ্ট্রপতির। তিনি কোন প্রক্রিয়ায় এটা গঠন করবেন তাও তাঁর নিজস্ব বিষয়। অতীতে ঠিক সার্চ কমিটি ছাড়াই নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়, কিন্তু তেমন প্রশ্ন ওঠেনি।

আবার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়েও তেমন প্রশ্ন তোলা হয়নি। পরাজিত রাজনৈতিক দল ও তাদের জোট সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগের কথা বললেও তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। তার অন্যতম কারণ নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া। প্রশ্ন উঠেছে উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে। কেননা উপনির্বাচনগুলো নির্বাচিত সরকারের অধীনে হয়। তখন প্রভাব খাটানোর বিষয় থাকে।

কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৭ সালের আজকের মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ অনেক মানসম্মত এবং আমাদের বিশ্বাস রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখবে। কেননা বড় সফলতা হলো, সার্চ কমিটি এরই মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও দক্ষ-অভিজ্ঞ লোকদের মতামত গ্রহণ করেছে এবং এখনো করছে। তারা নিজেরা যেমন দক্ষ, তেমনি বিভিন্ন দিক দিয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকদের নিয়ে কমিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা করছে। সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন ও এর প্রয়োগ করেছে এমন ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ করছে। এতে সুবিধা হলো, গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি ও তাদের কাজে লাগানো এবং সর্বোপরি সাফল্য অর্জন। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সার্চ কমিটিতে বিএনপিসহ বেশির ভাগ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মতামত ও নাম দিয়েছে। অর্থাৎ কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব থাকার বিষয়টি চলে এসেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি ভালো সংকেত। এত দিন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এমন দাবি করে আসছিল। সব দলের প্রেরিত নাম হয়তো কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না ঠিক, কিন্তু  যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের প্রেরিত নাম হবে। এটিও কম নয়, তবে গণতন্ত্র, প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের স্বার্থে বড় রাজনৈতিক দল ও তাদের জোট থেকে প্রেরিত নামের অন্তত একজনকে কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং কমিশন নিয়ে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ আর হয়তো থাকবে না।

সংবিধানে বলা হয়েছে, কমিশন তার দায়িত্ব পালনে স্বাধীন থাকবে এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে। এখানেই আস্থার বিষয়টি চলে আসে। অতীতে নির্বাচিত সরকারের সময় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সুতরাং কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এমন পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও সরকারের। এখানে বড় বিষয় দেখা দেয় কমিশনের দক্ষতা নিয়ে। অন্যান্য কাজের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কাজটি সহজ নয়। এ কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত কমিশনের একাধিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। তার প্রথমত প্রশাসনিক ও আইনগত দক্ষতা দরকার। দরকার একাডেমিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে দক্ষতা। প্রশাসনিক দক্ষতা ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি দ্রুত ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া যায় তাহলে কমিশন পরিচালনা করা সহজ হয় না। আইনকানুন সম্পর্কেও তাঁদের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এমন দৃঢ়চেতা কমিশন গঠন করা উচিত, যাতে সব ধরনের ভয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কমিশন দায়িত্ব পালন করতে পারে। দুর্বলচিত্তের লোকদের দিয়ে কোনোভাবেই কমিশন গঠন করা উচিত নয়।

একজন মানুষের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যদি তাঁর বহিঃপ্রকাশ না ঘটান এবং আমরা যদি কোনোভাবে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খুঁজে না পাই, তাহলে তিনি কেন কমিশনার হতে পারবেন না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক ভাবনা ও চেতনা বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও চেতনা বাদ দিয়ে কোনো রাজনৈতিক চেতনা হতে পারে না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, অনেক রাজনৈতিক দলের মধ্যে এগুলো নেই এবং কারো কারো মধ্যে এগুলোর যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ চেতনার বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে থাকতে পারে না। অতীতেও আমরা ভালো কমিশন পেয়েছি এবং আমাদের বিশ্বাস এবারে আমরা ভালো কমিশন পাব। বাংলাদেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল যেহেতু এগিয়ে এসেছে এবং সার্চ কমিটি সমাজের বিশিষ্টজনের মতামত গ্রহণ করছে সেহেতু একটি সুন্দর ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কমিশনের আশা আমরা রাখতে পারি। আমাদের লক্ষ্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া, সেখানে কমিশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরও উচিত কমিশনকে সহায়তা করা এবং তাদের গঠনমূলক মতামত দেওয়া। আর কমিশনের উচিত মতামতগুলোকে আমলে নিয়ে সঠিকভাবে কমিশনকে পরিচালনা করা। এমন সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় থাকলে আমাদের বিশ্বাস, নতুন কমিশন আগামী সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করতে সক্ষম হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 


মন্তব্য