kalerkantho


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

ব্যক্তিমালিকানার অবারিত স্বীকৃতিতে সম্পদবৈষম্য অবশ্যম্ভাবী হয়

ড. সা’দত হুসাইন

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্যক্তিমালিকানার অবারিত স্বীকৃতিতে সম্পদবৈষম্য অবশ্যম্ভাবী হয়

আয় ও সম্পদবৈষম্য নিয়ে সম্প্রতি অনেক লেখালেখি হচ্ছে। আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই।

সবাই খুব উদ্বিগ্ন। দেশের কী হবে, বিশ্বের কী হবে? সম্পদবৈষম্যের কারণে দেশ ও পৃথিবী রসাতলে যাবে। এসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো সাজানো হয় ভয়ংকর রূপ দিয়ে, যাতে পাঠক তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত হয়। এ চেষ্টা বহুলাংশে সফল হয়েছে। ধারণা জন্মেছে, বিশ্বের সম্পদ গুটিকয়েক লোকের হাতে এমনভাবে জড়ো হয়েছে যে বাদবাকি কোটি কোটি লোক যিকঞ্চিৎ সম্পদ বিলি-বণ্টন করে কোনো রকমে বেঁচে আছে। সে বণ্টনও সমতার ভিত্তিতে না হওয়ার কারণে শত শত কোটি লোক অর্ধাহারে-অনাহারে কালাতিপাত করছে। সম্পদবৈষম্য আরো প্রকট হবে এবং বিশ্বের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী না খেয়ে মারা যাবে।

বাস্তবে তেমন দেখা যাচ্ছে না। চরম অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।

খাদ্যাভাব কমেছে। যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত, অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত দেশগুলো বাদ দিলে অন্য সব দেশে কোনো দুর্ভিক্ষ নেই। দরিদ্র লোকজন দুবেলা খেতে পাচ্ছে, যা কয়েক দশক আগে সম্ভব ছিল না। যে আটজন লোকের হাতে বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে অক্সফামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা যেমন খেয়ে-পরে আনন্দ-উৎসবে দিন কাটাচ্ছে, এর বাইরে বিশ্বের অন্তত ৮০ কোটি লোক যাদের হাতে উপার্জনক্ষম উদ্বৃত্ত সম্পদ রয়েছে, তারাও খেয়ে-পরে পরম আনন্দে রয়েছে (ব্যক্তিগত মানসিক দুঃখ বাদ দিয়ে)। আটজন ধনকুবের এত দিনে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, আমানসিও ওর্তেগা, কার্লোস স্লিম হেলু, ল্যারি এলিসন, জেফ বেজোস, মাইকেল ব্লুমবার্গ ও মার্ক জাকারবার্গ। সাধারণ ব্যবসা অথবা আইটি সেক্টরে কর্মরত থেকে তাঁরা বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন। ভবিষ্যতে তাঁদের ধনসম্পদ আরো বাড়বে।

একটি কল্পচিত্রের অবতারণা করছি। আমরা ধরে নিতে পারি যে এই আটজন জীবন্ত সত্তা ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। তাঁরা জোর করে পৃথিবীর সম্পদের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) নিয়ে চলে গেছেন। এখন বাকি সম্পদ (৫০ শতাংশ) দিয়ে পৃথিবীর বাসিন্দাদের চলতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর বাসিন্দাদের কী হবে? তাদের একাংশ কি না খেয়ে মরে যাবে? তাদের জীবনের গতি কি দৃশ্যমানভাবে শ্লথ হয়ে যাবে? পৃথিবীতে আনন্দ-আয়োজন, উচ্চমাপের জীবনযাপন, আধুনিক প্রযুক্তির স্বস্তিদায়ক প্রয়োগ, যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন ও প্রয়োগ, মহাকাশ অভিযান, দীর্ঘ সেতু বা সুউচ্চ ভবন নির্মাণ কি বন্ধ হয়ে যাবে বা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পাবে? আমার ধারণা, এসব কর্মতৎপরতা, কর্মচাঞ্চল্য, আনন্দ-আয়োজন বন্ধ হবে না। আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগে এর পরিমাণ যা ছিল, তা থেকে লুট হওয়ার পর অবশিষ্ট অর্ধেক সম্পদ দিয়ে অধিকতর আনন্দ-আয়োজন, কর্মতৎপরতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। আরো জটিল প্রশ্ন হচ্ছে, সেই অর্ধেক সম্পদও কি আকর্ষণীয় সমতার ভিত্তিতে জনসাধারণের মধ্যে বণ্টন করা হবে?

সমতার ভিত্তিতে সম্পদ বণ্টন করতে হলে সম্পূর্ণরূপে ভিন্নতর পদ্ধতির সম্পদব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে বর্তমানে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার অবারিত স্বীকৃতি রয়েছে। এর রাজনৈতিক প্রতিরূপ (Counterpart) হচ্ছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদ, তা উপার্জিত, বৈধভাবে অনুপার্জিত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, যাই হোক না কেন তার সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। এ ব্যবস্থায় সম্পদশালী ব্যক্তিরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হন। সম্পদশালী হওয়া কোনো লজ্জার কারণ হয় না, বরং তা গর্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। একে কৃতিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়।

ব্যক্তিমালিকানা যদি অলঙ্ঘনীয় অধিকার রূপে স্বীকৃত হয়, তবে সম্পদবৈষম্য গড়ে ওঠা হবে এর অনিবার্য পরিণতি। অর্থনীতির একটি সোজা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ধরুন, আপনার উপার্জনকারী সম্পদের পরিমাণ পাঁচ কোটি টাকা। এ পরিমাণ টাকা বাংলাদেশে লক্ষাধিক লোকের আছে। এ সম্পদ যদি আপনি সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনা সহযোগে বিনিয়োগ মাধ্যমে (Savings Instrument) খাটান, তাহলে আপনার মাসিক আয় হবে আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকা। এর থেকে মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করলে আপনি বর্তমান বাজারদরেও দৃশ্যমান বিলাসী জীবন যাপন করতে পারেন। তাহলে প্রতি মাসে আপনার উদ্বৃত্ত থাকবে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা, বছরে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর আপনার সম্পদ বেড়ে যাবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। আমরা আশা করব যে এ টাকা আপনি আয়-উপার্জনকারী বিনিয়োগে খাটাবেন। এর থেকে পরের বছর আরো মুনাফা আসবে। এভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে আপনার মুনাফা, সম্পদ ও আয় বাড়তে থাকবে। বাড়তি আয়ের একাংশ ট্যাক্স হিসেবে সরকার কেটে নেবে। তার পরও অনেক টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যাবে। প্রতিবছরই আপনার সম্পদ ও সমৃদ্ধি বাড়তে থাকবে।

পৃথিবীর শীর্ষ আট ধনপতি ছাড়াও কথিত ‘মুক্তবিশ্বে’ মুক্তবাজার অর্থনীতির বদৌলতে লাখ লাখ ধনকুবের সৃষ্ট হয়েছেন, যাঁরা তাঁদের বিশাল ধনসম্পদের ওপর বসে গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। বলা যায়, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। যেহেতু নিজেদের সম্পদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁদের স্বাধীনতা রয়েছে, বিনিয়োগ থেকে আয়-উপার্জন করার অধিকার রয়েছে এবং অর্জিত আয় ভোগ ও পুনর্বিনিয়োগ করার সুযোগ সংরক্ষণ করার ব্যাপারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেহেতু শূন্য উদ্বৃত্তের দরিদ্র জনগণ ও ধনকুবের গোষ্ঠীর আয় ও সম্পদবৈষম্য দিন দিন বেড়ে যাবে। যদি আমরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিপূরক মুক্তবাজার অর্থনীতি, যা এক অর্থে পুঁজিবাদেরই নামান্তর, অনুসরণের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তবে সম্পদ ও আয়বৈষম্য দেখে আমাদের কাতর হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি আমাদের পছন্দকৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি।

দাভোস, সুইজারল্যান্ডে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ব-অর্থনৈতিক ফোরামে আয় ও সম্পদবৈষম্যকে মানবসমাজের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে এ বছর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো—১. আয় ও সম্পদবৈষম্য বৃদ্ধি; ২. পরিবর্তনশীল জলবায়ু; ৩. সামাজিক মেরুকরণ বৃদ্ধির প্রবণতা; ৪. সাইবার হামলার ঝুঁকি এবং ৫. বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি। ২০১৬ সালের প্রধান পাঁচ সমস্যার মধ্যে আয় ও সম্পদবৈষম্য অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সে বছরের প্রধান সমস্যাগুলো ছিল—১. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যর্থতা; ২. গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার; ৩. সুপেয় পানির সংকট; ৪. বড় আকারের অনিচ্ছাকৃত অভিবাসন ও জ্বালানির দামের অভিঘাত। আয় ও সম্পদের বৈষম্য গত বছরও প্রকট আকারে বিরাজ করেছে। কিন্তু বিশ্বের অভিজাত (Elite) সম্প্রদায় একে ভয়ংকর সমস্যা মনে করেনি। এ বছর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা অনুধাবনের পরিবর্তন ঘটেছে। তবে যারা এই বৈষম্যের মূল হোতা তাদের বিরুদ্ধে অভিজাত সম্প্রদায়ের গুরুতর অভিযোগ নেই। তাদের অস্বস্তি একটি, এই আট ব্যক্তি তাদের তুলনায় অনেক বেশি ধনী।

এই আট ধনকুবের সাধারণ ধনবানদের তুলনায় একটু ভিন্নতর। এরা সবাই সম্মানিত ব্যক্তি, তাঁরা আধুনিক উদ্যোক্তা। তাঁদের উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান হয়েছে এবং হচ্ছে। আমাদের জানামতে, তাঁরা কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত নন। জাজ্বল্যমান শঠতা বা অপতৎপরতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থসম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন—এমন অভিযোগও তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠেনি। বরঞ্চ সুযোগ পেলে তাঁরা জনকল্যাণে সম্পদ ব্যয় করেছেন এমন কথাই শোনা যায়। সে জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বা সুধীসমাজের ক্ষোভ নেই। সাধারণ মানুষ একধরনের শ্রদ্ধা ও প্রশংসার সঙ্গে তাঁদের স্মরণ করে। সমস্যা হচ্ছে পরিবেশটি এত সহজ, সরল ও সুন্দর নয়। হাতে উদ্বৃত্ত টাকার পরিমাণ বেড়ে গেলে অনেকের মধ্যে অপকর্মের প্রবণতা জেঁকে বসে। আরো অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর প্রয়াসে তারা উদ্বৃত্ত অর্থের একাংশ ব্যয় করার পরিকল্পনা করে। এ টাকা দিয়ে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নির্বাহী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করে। ফলে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, জোত-জমি দখলের মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়ে তারা মানুষের চরম ক্ষতি সাধন করে। শান্তিশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত করে আতঙ্ক-অস্বস্তিতে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত, জর্জরিত করে। সম্পদবঞ্চিত সাধারণ মানুষ অপরাধীচক্রের ধনবল জনবলের সামনে দাঁড়াতে পারে না। মুখ বুঁজে অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। আয় ও সম্পদবৈষম্যের এই অভিঘাত ভয়াবহ। এ আশঙ্কার কারণে আয় ও সম্পদবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা দায়িত্বশীল নাগরিকের জন্য অবশ্যকরণীয় হয়ে দাঁড়ায়।

আয় ও সম্পদের নিরিখে জনগণকে মোটামুটি তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—ক. যাদের আয়সম্পদ এত কম যে তাদের পক্ষে বেঁচে থাকাই কষ্টকর। অর্ধাহারে-অনাহারে, কখনো বা গৃহহীন অবস্থায় থেকে তারা মানবেতর জীবনযাপন করে; খ. যাদের আয়সম্পদের পরিমাণ এমন যে তারা খেয়ে-পরে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে, তবে অর্থবহ সঞ্চয় করার মতো উদ্বৃত্ত তাদের নেই। অতএব বছরান্তে সঞ্চয় বা উদ্বৃত্ত বাড়ারও কোনো অবকাশ নেই; গ. সঞ্চিত মূল অর্থ না ভেঙে খেয়ে-পরে আরামে-আয়াসে চলার পরও বছরান্তে যাদের উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে; উদ্বৃত্তের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়তে থাকে। শেষোক্ত গ. শ্রেণির ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্য দুই শ্রেণির ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদের বৈষম্যের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অনুসৃত ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’তে এরূপ ঘটাই স্বাভাবিক।

সমস্যাটি মূলত মানবিক ও সামাজিক। কোনো ব্যক্তির কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা থাকা সত্ত্বেও একশ্রেণির জনগোষ্ঠী অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করবে, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ অবস্থার জন্য দরিদ্রগোষ্ঠীর একাংশ নিজেরা দায়ী হলেও খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা যায় না। আর যারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও (Working poor) ভালোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার সংস্থান করতে পারছে না, তারা কোনো না কোনোভাবে শোষণ-বঞ্চনার শিকার। তাদের প্রতি অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনার নিরসন ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ‘ক্ল্যাসিক্যাল’ অর্থনীতিবিদরা সহজ সমাধান বাতলে দিয়ে বলবেন, ধনীদের আয় ও সম্পদের একাংশ অনুদান (Transfer) হিসেবে বিলিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা যেতে পারে, সরকার এর চেয়ে বেশি কিছু করতে গেলে অর্থনীতিতে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটবে, যা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারকে বিঘ্নিত করে পরিণামে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মানবিক সমস্যাকে তারা তেমন একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। তারা বিশ্বাস করে, খাটাখাটনি ও দর-কষাকষি করে যে ব্যক্তি পর্যাপ্ত অর্থ রুজি করতে পারে না, তার ভালোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার সংকুচিত  হবে। একে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলে অর্থনীতি সচল থাকবে। দুস্থজনকে অনুদান বা হস্তান্তরের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করা যথার্থ হবে। তাত্ত্বিক দিক থেকে অবস্থানটি যৌক্তিক মনে হলেও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অমানবিক মনে হয়। অনুসৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার খোল-নলচে পাল্টে একে নতুনভাবে বিনির্মাণের আবশ্যকতা জোরালো হয়ে ওঠে।

সক্রেটিসের অমোঘ মন্ত্র ‘Know thyself’ (নিজেকে জানো) বড় সোচ্চার হয়ে কানে বাজছে। বিশ্বের সুধীসমাজ যখন মুক্তবাজার অর্থনীতি, ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদ অর্জন ও তা সংরক্ষণের অবারিত অধিকার শিরোধার্য মেনে নিয়ে বিশ্ব সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তখন আয় ও সম্পদবৈষম্যের মাত্রা দেখে হা-হুতাশ করাকে একধরনের স্ববিরোধিতা বলাই যৌক্তিক হবে। উত্তরে তাঁরা হয়তো মিন মিন করে বলবেন, ‘Contradiction is man, consistency is demand of others on him.’

 

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও

পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য