kalerkantho


সাদাকালো

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে কেন নির্মম পুলিশি হামলা

আহমদ রফিক

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে কেন নির্মম পুলিশি হামলা

রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তেল-গ্যাসবিষয়ক জাতীয় কমিটির সঙ্গে সরকারের মতভেদ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে এ প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে।

জাতিসংঘের ইউনেসকো এ প্রকল্পের পরিবেশবিরোধী তথা সুন্দরবনবিরোধী ভূমিকার কারণে তাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন এই তো কয় দিন আগে। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনের ওপর নজর পড়েছে ভূমিখেকো শিল্পপতিদের। তারা হামলা চালাতে শুরু করেছে সুন্দরবনের আশপাশে অবস্থিত জমির ওপর। সুন্দরী সুন্দরবন এখন মহাসংকটের মুখে। এ উপলক্ষে একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম, ‘সুন্দরবনের চারপাশে জমি কিনছে শতাধিক শিল্পগোষ্ঠী। ’ ভোগীদের টানাটানিতে সুন্দরবনের বিপর্যস্ত অবস্থা।

অথচ সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকা সংরক্ষণ উপযোগী ‘সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

এর দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরকে। এ দপ্তরটিকে কেন জানি না বরাবরই দুর্বল বলে মনে হয়। দায়িত্ব পালনে মেরুদণ্ড সোজা করে বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে দাঁড়াতে পারে না। এর কারণ কি প্রতিপক্ষ প্রতাপশালী, প্রভাবশালী বলে?

তাই সুন্দরবন এলাকার সংরক্ষিত জমিও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের কাছে। বিপদ সুন্দরবনের কানের কাছে এরপর ঘণ্টা বাজাতে শুরু করবে। আর অবস্থাদৃষ্টে পরিবেশ অধিদপ্তর হয়তো সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি চেয়ে ওপরমহলে চিঠি চালাচালি করবে। এর মধ্যে যা ঘটার ঘটে যাবে। বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক। এ অবস্থার শোচনীয় পরিণাম বোঝাতে অনেক দিন আগে একটি দৈনিকে লিখেছিলাম একটি উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ : ‘দেহতন্ত্র যদি হতো আমলাতন্ত্র’। সে ক্ষেত্রে বেঁচে থাকা সত্যি মুশকিল হতো।

সুন্দরবনের বস্তুত এমনই অবস্থা। তাই এ নিয়ে লেখালেখি কম হচ্ছে না। কিন্তু অবস্থার বড় একটা পরিবর্তন ঘটছে না। সুন্দরবন নিয়ে ভাবনার কারণ আর কিছু নয়, জাতীয় জীবনে এর গুরুত্ব। গুরুত্ব প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে শক্তিমান প্রাচীরের অনড়তা নিয়ে অবস্থান নেয় বলে। তাতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমে।

দুই.

সত্যি আমাদের জাতীয় জীবনের দুর্যোগ-বিনোদনে এক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন। প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এতটা গৌরচন্দ্রিকার কারণ আসলে সুন্দরবনবিনাশী প্রস্তাবিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বিরুদ্ধে সংঘটিত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের বেধড়ক মারমুখী হামলা।

পূর্বোক্ত তেল-গ্যাস কমিটি দীর্ঘদিন ধরে এ প্রকল্প বন্ধ করার জন্য সরকারের উদ্দেশে আবেদন-আহ্বানের পর একাধিকবার ঢাকা-বাগেরহাট লংমার্চ, প্রতিবাদ জানানোর পর এবার ২৬ জানুয়ারি অর্ধেক বেলা হরতালের আহ্বান জানায়। পত্রপত্রিকার খবরে প্রকাশ, হরতালের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। ছিল না কোনো হিংসাত্মক তৎপরতা।

এ অবস্থায় সংবাদপত্রে কথিত ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশি তাণ্ডব’ আমাদের বিস্ময়ের কারণ। সেই সঙ্গে বেদনাবোধ। পুলিশের এজাতীয় চণ্ড আচরণ সেই পাকিস্তানি জমানার শুরু (১৯৪৭-আগস্ট) থেকে দেখে আসছি। অভিজ্ঞতাও কম হয়নি। অবশ্য সেই পুলিশ ছিল বিদেশি শাসনের নীতি ও উত্তরাধিকার বহন করা শাসনযন্ত্রের রাজনৈতিক লাঠিয়াল।

একাত্তরে সেই বাঙালি পুলিশেরই দেখেছি ভিন্ন চেহারা, যে চেহারা-চরিত্র স্বাদেশিকতার আবেগে সিক্ত। সে স্বাদেশিকতার টানে অনায়াসে প্রাণ দেওয়া চলে। দিয়েছেন বহু পুলিশ কর্মচারী, কর্মকর্তা। জাতীয় পর্যায়ে মূল্যবান সে দান। মুক্ত স্বাধীন দেশে সে পুলিশ বাহিনীতে আমরা দেখতে চেয়েছি সততা, দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা, জাতীয় কর্তব্য পালনে রাজনীতি-নিরপেক্ষ অবস্থান, সর্বোপরি দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি।

কিন্তু জনগণের নিরাপত্তা-রক্ষক এই বাহিনীর অংশ বিশেষের ভূমিকা, অপরাধ-দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আমাদের হতাশ করেছে। প্রায়ই কাগজে পড়তে হয় তাদের কোনো কোনো সদস্যের নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি। এসব পড়ে ভাবতে হয়, আমরা কী চেয়েছিলাম আর কী পেলাম! যুক্তিসংগত প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য!

ঘটনা সম্পর্কে একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে যে বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে তা বাস্তবিকই মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক। সর্বোপরি তা যে ন্যায়নীতিবিরোধী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবেদনে প্রকাশ : ‘গত বৃহস্পতিবার আধাবেলা শান্তিপূর্ণ হরতালে রাজধানীর শাহবাগে মারমুখী পুলিশ সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজনকে রাস্তায় ফেলে অমানুষিকভাবে পিটিয়েছে। ’

প্রতিবেদন মতে, ‘কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক’। আর ‘হরতালকারীদের মারধরের ফুটেজ তুলতে গিয়ে পুলিশের ব্যাপক মারধরের শিকার হয়েছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল’ ইত্যাদি। ওই দৈনিকের সম্পাদকীয়তে এ ঘটনা উপলক্ষে বলা হয়েছে, হরতাল চলাকালে বিনা উসকানিতে সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজনকে বেধড়ক পেটানোর কথা। শনাক্ত করা হয়েছে এক সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্যকে। প্রথমোক্তজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির হরতালে বিনা উসকানিতে কেন পুলিশের তরফে ডাণ্ডাবাজিতে অতিউৎসাহ? প্রথমত, এরা রামপাল আন্দোলনের সক্রিয় ও তাদের মধ্যে অনেকে বামপন্থী রাজনীতিতে আস্থাবান বলে পুলিশের এই বর্বর আচরণ? ঘটনার পরদিন একাধিক সংবাদপত্রে পুলিশি নির্মমতার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

বড় কথা, এ হামলা থেকে বাদ যাননি কর্তব্যরত পত্রিকা ও টিভি সাংবাদিকরা। স্বভাবতই ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ সাংবাদিক মহল। একটি দৈনিকে খবরের শিরোনাম—‘পুলিশি আক্রোশে সাংবাদিক’। সাংবাদিক নির্যাতনের কারণেই সম্ভবত ঘটনার তদন্তে পুলিশের তিন সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। এ সম্পর্কে পূর্বোক্ত সম্পাদকীয়তে এমন আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে যে সরকারের শাসন মেয়াদের শেষ পর্যায়ে কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্য সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে এজাতীয় হামলা চালিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থাকে যে একটি পুরো পুলিশ টিম কি এমন সরকারবিরোধী অবস্থান নিতে পারে?

যাই হোক, আমরা দেখতে চাই পুলিশি তদন্তে কোন সত্য বেরিয়ে আসে। এরই মধ্যে হরতাল আহ্বানকারী জাতীয় কমিটি গত সোমবার বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। পুলিশি তাণ্ডবের প্রতিবাদে এই ঘোষণা। ‘পুলিশি দমন-পীড়নে আন্দোলন বাড়বে’—এমনই ধারণা সংগঠকদের। তাঁরা আরো ভবিষ্যৎ কর্মসূচির পরিকল্পনা করছেন। লক্ষ করার বিষয় যে পুলিশি হামলায় মারাত্মকভাবে আহত বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আন্দোলনের পক্ষে তাঁদের সাহসী প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে। অন্যদিকে সাংবাদিকরা পুলিশি হামলা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন সাংবাদিকরা।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির মতে, ‘পুলিশি দমন-পীড়নে আন্দোলন আরো বাড়বে। ’ আমাদের মনে হয়, এই অপ্রয়োজনীয় হামলার নির্মমতা পুলিশ বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলের দুর্বলতার প্রতীক। বায়ান্নর ২১-২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ একই রকম মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিল অকারণ গুলিবর্ষণে। তাতে আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, প্রত্যন্ত এলাকায়।

তিন.

বৃহস্পতিবারের ঘটনা শুধু কর্তৃপক্ষের দুর্বলতাই নয়, যুক্তিবিরোধী, রীতিনীতিবিরোধী, অসহিষ্ণুতা ও দায়িত্বহীনতারও পরিচায়ক। পুলিশের এ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বই উজ্জ্বল হবে না। বরং এটাই প্রমাণিত হবে যে সরকার কোনো ধরনের ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রকাশে অনিচ্ছুক।

প্রসঙ্গত, এ সম্পর্কে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে তেল-গ্যাস কমিটি যেসব বিজ্ঞান-প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেছে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা দরকার। আজই আমাদের একটি দৈনিকে কলকাতার এক সাংবাদিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন। ভারতে যে এজাতীয় পদ্ধতির বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এ বিষয়টি সরকার আমলে নিচ্ছে না কেন? এ ঘটনাই তো উল্লিখিত পদ্ধতির অগ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশ পেয়েছে আজকের একটি দৈনিক সংবাদপত্রে। শিরোনাম—‘চীনে শতাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের নির্দেশ। ’ রয়টার্স পরিবেশিত এ সংবাদ কলামে বলা হয়েছে, ‘দেশব্যাপী দূষণ ও ধোঁয়াশার পরিপ্রেক্ষিতে চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ১৪ জানুয়ারি এই নির্দেশ জারি করেছে। ’ লক্ষ করার বিষয় যে চীন সরকার নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চীনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে কানাডাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন পিস’। অন্যদিকে চীন এ ক্ষতি পোষাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎস সন্ধান করছে। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি-বাতাস ও সূর্যালোকের ওপর নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা শুরু করেছে, যাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্রমশ কমিয়ে একেবারে বন্ধ করে দেওয়া যায়।

মহাদেশীয় প্রতিবেশী চীন যখন পরিবেশ রক্ষার তাগিদে নির্মাণাধীন প্রকল্প বাতিল করতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিয়ে, তখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের পরিবেশদূষণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। ভারতও একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে, তাহলে আমরা কেন এ বিপজ্জনক পথে পা বাড়াব? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিক আবেগ বর্জন করে বিকল্প পথের চিন্তাভাবনা করবে আশা করি। পুলিশি হামলা সমস্যা সমাধানের পথ নয়। এ ক্ষেত্রে সঠিক পথ সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তিবাদী বিজ্ঞাননিষ্ঠ বিচার-বিবেচনা ও পরিবেশ স্বার্থ রক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য