kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সেই এমসি কলেজ এই এমসি কলেজ

মোফাজ্জল করিম

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সেই এমসি কলেজ এই এমসি কলেজ

‘সারা ক্যাম্পাস জুড়ে পাতা সবুজ ঘাসের গালিচা। তার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে কালো পিচের ঝকঝকে তকতকে রাস্তা।

যেন সবুজ শাড়ির কুচকুচে কালো পাড়। এখানে-ওখানে নানা রঙের, নানা জাতের ফুলের কেয়ারি। বলতে পারেন, সেই সবুজ শাড়িটির জমিনে নানা রঙের নানা ঢঙের বুটিদার কাজ। কোথাও কোথাও অবিকল একই রকম দেখতে বিরাট আকৃতির পামগাছের সারি। মূল ক্যাম্পাসের পেছন দিকে বিশাল লাইব্রেরি ভবন। ... লাইব্রেরি ভবন পার হয়ে এগিয়ে গেলে কলেজ মিলনায়তন-কাম ছাত্রদের কমনরুম। তার সামনেই একটি নাতিবৃহৎ জলাশয়। ওতে কাউকে কোনো দিন স্নানটান করতে দেখা যায়নি। তবে দুপুরের রোদ টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে ওটার বুকে অসংখ্য রুপালি মুদ্রা ছড়াতে দেখেছি আমি। আর রাতের নির্জনতায় সোনালি জোছনা গায়ে মেখে পরিরা তো এমন জলাশয়েই নাইতে নামে। রোজ কলেজ ছুটির পর চারদিকের সুশান্ত সুনীল নির্জনতায় কলেজের এদিকটা মনে হয় রূপকথার মায়াপুরীর মতো। না, তখন মাদকসেবীদের নামও শোনা যায়নি, ছিনতাইকারীরাও মাটি ফুঁড়ে উদয় হতো না আঘাটা-বেঘাটায় সায়াহ্নের স্তব্ধ সমাহিত রূপটাকে ছিনিয়ে নিতে। তখন অদূরবর্তী ছাত্রাবাসের দুই বন্ধু পুকুরপাড়ে বসে যখন আনমনে ঘাসের ডগা ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা বলত কিংবা অকস্মাৎ শান্ত সরসীর নীরে দুটি নুড়ি ছুড়ে মারত, তখন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নিশ্চয়ই কারো কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না। ’ (মোফাজ্জল করিম : আপন ভুবন, অচেনা আকাশ। )

গত ৩ অক্টোবর, সোমবার থেকে টেলিভিশনের পর্দায় লাগাতার কয়েক দিন সিলেট এমসি কলেজের যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটির এই কদর্য রূপ আমি বা আমার বয়সী কেউ আগে কখনো দেখিনি। হ্যাঁ, বছর কয়েক আগে কিছু দুর্বৃত্ত কর্তৃক এই কলেজের মনোরম ছাত্রাবাসটির কিয়দংশ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলার ঘটনাটিও ছিল এমনি আরেকটি জঘন্য ঘটনা, যার চিহ্নিত অপরাধীরা আজও গ্রেপ্তার হয়নি। কলেজ ক্যাম্পাসে যে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, তা আমাদের মতো এ যুগের ‘অচল আধুলিদের’ কল্পনারও অতীত। ১৯৬০-এর দশকে এমসি কলেজের যে ক্যাম্পাস আমি দেখেছি, যে ক্যাম্পাস আমৃত্যু আমার স্মৃতিতে জেগে থাকবে, তার সঙ্গে টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা ক্যাম্পাসের কোনো মিল নেই। সেই অতুলনীয় ক্যাম্পাসটির একটি খণ্ডচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছি আজকের নিবন্ধের শুরুতেই উদ্ধৃত আমার আত্মজীবনীমূলক একটি গ্রন্থে। এখন অবশ্য বলতে পারেন, সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই।

আমি এই কলেজে শিক্ষকতা করেছি আমার কর্মজীবনের শুরুতে (১৯৬৩-৬৬) তিন বছর। তখন এই কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল আজকের তুলনায় অনেক কম। কত হবে? দুই-তিন হাজার? কিংবা আরো দু-তিন শ বেশি? আর এখন তো শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৩-১৪ হাজার। তখন এটা ডিগ্রি কলেজ ছিল বটে, তবে মাস্টার্স কোর্স ছিল না। এটা ডিগ্রি কলেজ সেই শুরু থেকেই, যখন আমার আব্বা কলেজের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন (১৯২২-১৯২৬)। আমার সদ্যপ্রয়াত আদরের অনুজ রেজাউল করিমও ছাত্র ছিল এই কলেজের (১৯৬৮-৭০)। তবে এই ঐতিহ্যবাহী কলেজের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি আমার।

সে যুগে ছেলেদের মধ্যে উদ্দামতা, উচ্ছলতা ও প্রাণপ্রাচুর্যের কমতি ছিল না। তবে উচ্ছৃঙ্খলতা, যথেচ্ছাচারিতা, সীমালঙ্ঘন, এসব ছিল না। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো, ক্ষেত্রবিশেষে জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ ভ্রাতার মতো। খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতাম বলে কোনো কোনো ছাত্রের সঙ্গে বন্ধুর মতোও মিশেছি। তাতে কোনো দিন কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। লেখাপড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কারণে যারা আসত, তাদের জন্য তো আমার বাসগৃহও ছিল অবারিত দ্বার।

অর্ধ শতাব্দী আগে আমাদের সমাজব্যবস্থা ছিল রীতিমতো প্রাচীনপন্থী। সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে নিষেধের পাল্লাই ছিল বেশি ভারী। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, এভাবে চলতে পারবে না, ওভাবে বলতে পারবে না। শুধু না আর না। আর এটা বেশি প্রযোজ্য ছিল মেয়েদের বেলায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমরা যখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি তখন অবস্থা ছিল আরো করুণ। ‘এই যে শুনছেন? আপনার নোটটা দেবেন?’ এই কথাটা বলতেই একটা ছেলে বা মেয়ের গলা শুকিয়ে যেত। এমসি কলেজের ছেলেমেয়েরাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আজকাল শুধু ঢাকা নয়, মফস্বলের ছেলেমেয়েরাও কত সহজভাবে মেলামেশা করে। পরস্পরকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে ‘আপনি-তুমি’র বেড়া ভেঙে অনেকেই একেবারে ডবল-ট্রিপল প্রমোশন নিয়ে তুই-এ নেমে গেছে। ব্যস্ত রাজপথে হাত ধরে চলাচল করছে, খুনসুটি করছে। আর ষাটের দশকে এমসি কলেজের কোনো ছাত্র বা ছাত্রী এসব কল্পনাও করতে পারত না। যখন ক্লাস শুরু হওয়ার ঘণ্টা পড়ত তখন মেয়েরা তাদের কমন রুম থেকে বের হয়ে শিক্ষকের পেছনে পেছনে মাথা নিচু করে ক্লাসে যেত। কথাবার্তা বলত মৃদুস্বরে নিজেদের মধ্যে। আর শ্রেণিকক্ষে তাদের বসার জন্য পৃথক বেঞ্চ নির্ধারিত থাকত। কলেজে তাদের সারা দিন কাটত কমন রুম নামক একটা অপরিসর কামরায় এবং ক্লাসে। ব্যস, এ পর্যন্তই। ক্যাম্পাসে হাঁটা-চলার কোনো অধিকার ছিল না তাদের। এখনকার শিক্ষার্থীরা হয়তো বিশ্বাসই করবে না কী রকম একটা ‘রেজিমেন্টেড’ জীবন ছিল তখনকার মেয়েদের। সুস্থ মন-মানসিকতা বিকাশের জন্য নিশ্চয়ই এটা একটা ভালো ব্যবস্থা ছিল না।

তবে হ্যাঁ, এত নেতিবাচক পরিবেশের মধ্যে অবশ্যই একটা জিনিসের নিশ্চয়তা ছিল। তা হচ্ছে, নিরাপত্তা। মেয়ে স্কুলে গেছে বা কলেজে গেছে, আর মা বাসায় বসে গেছেন জায়নামাযে তসবিহ্ জপতে : আল্লাহ, মেয়েটা যেন ভালোয় ভালোয় ফিরে আসে, এই অবস্থা সে আমলে ছিল না। রাস্তাঘাটে বখাটেদের উত্পাত, ‘ইভ টিজিং’, এগুলো বড় একটা শোনা যেত না। আর এখন তো ভয়াবহ অবস্থা। সমাজে যত দিন পর্যন্ত প্রকৃত শিক্ষার বিস্তার না ঘটেছে, ‘শিষ্টের দমন ও দুষ্টের পালন’ এই নীতির অবসান না হচ্ছে, সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধ গড়ে না উঠছে, তত দিন পর্যন্ত এসব সামাজিক ব্যাধির মূলোত্পাটন সম্ভব নয়। অন্য কথায়, তত দিন পর্যন্ত আমরা সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়ে উঠব না।

নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতনসহ অন্যান্য জঘন্য অপরাধ দিন দিন বেড়ে চলার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এসব অপরাধের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। আর বিচার না হওয়ার কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক প্রয়োজনে পেশিশক্তির লালন ও আইনের শাসনের অভাব। একজন অপরাধী যখন দেখে সে যে অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা করছে, সেই একই অপরাধ করে অন্য আরেকজন দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে চলছে, আইনের হাত সে ব্যক্তির দিকে বাড়ানো হচ্ছে না, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃৃপক্ষের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সে নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন সে নিজেও ‘লাইন’ খুঁজে বের করে। আইনের এই যে যথেচ্ছাচার প্রয়োগ, এটা সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ নেই—এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে।

আসুন, এবার এমসি কলেজের পবিত্র অঙ্গনকে সম্প্রতি কলঙ্কিত করেছে বদরুল আলম নামক যে নরপশু তার দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। পত্রপত্রিকার তথ্যানুযায়ী সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রটি নাকি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের একজন বেশ বড়সড় নেতা। তার আমলনামায় দেখা যাচ্ছে সে খাদিজা আক্তার নার্গিসকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আগেও মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করেছে, যার ফলে গণধোলাইয়ের শিকারও হয়েছে। আর যেহেতু সে সরকারের সমর্থনপুষ্ট একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা, অতএব প্রেম নিবেদন, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া ও পরিণতিতে গণধোলাইয়ের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের হাতে রাজনৈতিক কারণে তার প্রহৃত হওয়ার কল্পিত কাহিনী দাঁড় করিয়ে রাতারাতি বিবাদী থেকে বাদী সেজে যায় পুলিশের খাতায়। তারপর আবার নতুন উদ্যমে নেমে পড়ে খাদিজাকে জোর করে প্রেমে রাজি করানোর মিশনে। কিন্তু এবারও খাদিজা তার মতো একটা অপদার্থের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় সে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় মেয়েটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার। একটা বিকৃত মস্তিষ্ক জঘন্য ক্রিমিন্যাল না হলে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণে কেউ একটি মেয়েকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, অপরাধী অনেক প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে অগ্রসর হয়, যাতে করে বোঝা না যায় নিহত ব্যক্তি কিভাবে, কার হাতে নিহত হলো। তদন্তকারী সংস্থার ঘাম ছুটে যায় রহস্যের কূল-কিনারা করতে। কিন্তু বাপের বেটা একখানা বদরুল! সে ওসব ফন্দি-ফিকিরের ধারেকাছেও গেল না। এমনকি রাতের আঁধার, নির্জন স্থান, লোকচক্ষুর অন্তরাল, এ সবকিছুরই দরকার মনে করল না সে। মেয়েটি দিনে-দুপুরে পরীক্ষার হল থেকে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে বের হয়ে এসে যখন কলেজের পুকুর পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে—হয়তো মেয়েদের কমন রুমে যাবে বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করে একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে—তখনই পাষণ্ডটি চাপাতি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। তারপর ক্রমাগত মাথায়, শরীরে  ও হাতে-পায়ে সেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে লাগল। মেয়েটির ‘ও মাইগো, ও মাইগো’ (ও মাগো, ও মাগো) আর্তচিত্কারে কে এগিয়ে এলো? না, এক মোবাইল ফোনের চিত্রগ্রাহক। ‘এগিয়ে এলো’ কথাটা ঠিক হলো না। সে নিরাপদ দূরত্বে থেকে পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করল। আর ওই সময় আশপাশে যারা ছিল তারাও প্রায় সবাই পরীক্ষার্থী। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দৌড়ে যায় আক্রমণকারীকে পাকড়াও করতে। কিন্তু ওই দুর্ধর্ষ খুনিটা নাকি চাপাতি হাতে তাদের দিকে ধেয়ে আসে। তারা তখন বাধ্য হয় পিছু হটতে।

এখানেই আমার ‘দুইখান কথা’ আছে। একটা তুমুল শোরগোল তুলে ‘এই খবরদার’ ‘ধর্ ধর্’ ইত্যাদি ধ্বনিসহ একদল যুবক পাল্টা ধাওয়া দিলে ওই চাপাতি-বীর কি লাঙ্গুল উঁচিয়ে পালাত না? সে  তো অপরাধী। আর অপরাধীদের হিংস্রতা, উন্মত্ততা যত প্রবলই হোক না কেন তাদের সৎ সাহস বা নৈতিক বল (‘মরাল কারেজ’) তো থাকে শূন্যের কোঠায়। ‘যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। আর তা ছাড়া সে তো ছিল একাকী। তার হাতে বন্দুক-পিস্তল বা অন্য কোনো আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল না। একজন অপরাধীকে এক শ জন সাহসী তরুণ একটা শক্ত চ্যালেঞ্জ তো ছুড়ে দিতে পারত। তাতে মেয়েটির মাথায়, শরীরে, হাতে-পায়ে হয়তো এতগুলো চাপাতির কোপ পড়ত না।

জানতে পারলাম, উপস্থিত তরুণরা একটু পরেই সাহস সঞ্চয় করে আবার ছুটে যায় ঘটনাস্থলে এবং কাপুরুষটাকে পাকড়াও করে। অতঃপর অকুস্থলেই তার প্রাপ্য উত্তম-মধ্যম তাকে বুঝিয়ে দেয় আচ্ছাসে। কিন্তু ততক্ষণে অসহায় মেয়েটির ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তাই বলছিলাম, ছেলেদের এই ‘রি-অ্যাকশন টাইমটা’ আরেকটু কমিয়ে আনতে পারলে এবং নিজেদের ভেতর ‘যা হবার হবে, ধর্ শা-কে’ জাতীয় ‘জোশ’ আরো উদ্দীপ্ত করতে পারলে ঘটনা হয়তো শুরুতেই সামাল দেওয়া যেত। জীবনে কখনো কখনো ডাকাবুকো, ‘ডেয়ারডেভিল’ হতে হয়, হওয়া ভালো। নইলে অন্যায় প্রতিরোধ করার শক্তিটা আসবে কোত্থেকে। ‘মানবের তরে এই পৃথিবী, দানবের তরে নয়’—এই বিশ্বাসটা আমরা অবশ্যই হারাতে চাই না।   

আরেকটি কথা। সব কিছু তরুণরা করবে, তারা আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ, তারা সন্ত্রাস দমন করবে, তারা দুর্নীতি ঠেকাবে, খাদিজাদের বাঁচাবে—এসব কথা বলে সব দায়-দায়িত্ব তরুণদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা বুড়ো হাবড়ারা নাসিকায় তৈল প্রয়োগ করে পরম সুখে নিদ্রা যাব, এসব লম্বা লম্বা কথায় আমি বিশ্বাস করি না। তরুণরা অবশ্যই তাদের যখন যা কর্তব্য তা করবে। তাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব নিজেদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। তার জন্য জ্ঞানার্জনের কোনো বিকল্প নেই। তা তাদের করতেই হবে। সেই সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, নিজেদের অন্যায় থেকে হাজার মাইল দূরে রাখতে হবে, খাদিজাদের বাঁচাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবই মানলাম। কিন্তু বদরুলদের যারা সৃষ্টি করছে, তাদের দায়িত্বটা কি শুধু কোনো অঘটন ঘটলে ‘বদরুল আমাদের কেউ নয়, তার নেতাগিরি আগেই শেষ হয়ে গেছে’ বলে ব্রিফলেস লইয়ারের মতো গলাবাজি করা পর্যন্তই? তনু হত্যাকারী, সাগর-রুনিদের হত্যাকারী, শিক্ষকদের লাঞ্ছনাকারী, নিজ দলীয় প্রতিপক্ষদের হত্যাকারী, দখলকারী, চান্দাবাজ চান্দুদের দমন করা সেটাও কি তরুণরাই করবে? সব রাজনৈতিক দল এগুলো বন্ধ না করে শুধু নিজেদের লাভক্ষতি হিসাব করে প্রশ্রয় দিলে, অপরাধীকে আড়াল করলে, আরো অনেক তনু, আরো অনেক খাদিজার কপালে দুঃখ আছে। দ্রুত বিচার করুন, বিচার করে জেল-জরিমানা-ফাঁসি দিন, দেখবেন এ দলে ও দলে যেখানে যত বদরুল আছে পালাবার পথ পাবে না।

আর অরণ্যে রোদন হবে জেনেও বলতে চাই—এবং বারবারই বলব—সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবাই মিলে সর্বদলীয় সম্মেলন করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিন : কোনো অন্যায়কে, কোনো অপরাধকে, কোনো অবিচারকে আমরা প্রশ্রয় দেব না, প্রতিরোধ করব, অপরাধী যেই হোক, যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে শূলে চড়াব। পারবেন?

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com


মন্তব্য