kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শি চিনপিংয়ের আসন্ন বাংলাদেশ সফর

লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.)

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শি চিনপিংয়ের আসন্ন বাংলাদেশ সফর

বিগত শতাব্দীতেই চীন তাক লাগানো এক বিশাল উত্থান ঘটিয়ে মহাপরাক্রান্ত শক্তিরূপে বিশ্বে আবির্ভূত হয়। একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়।

অদম্য চীন বিরামহীন গতিতে তার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। বিশ্ব অর্থনীতির মহাবিশারদ ও পণ্ডিতরা ভবিষ্যদ্বাণী করে চলেছেন, চীন ২০২৫ সালের মধ্যেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে।

আমার মনে পড়ছে, ২০১০ সালের মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করেন। আবার সে বছরেরই জুন মাসে চীনের উপরাষ্ট্রপ্রধান শি চিনপিং বাংলাদেশ সফর করেন। সেটা গুরুত্বপূর্ণ একটি সফর ছিল। বাংলাদেশ-চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সে সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রেসিডেন্ট শি অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। এর মধ্যে দুই দেশ থেকেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম চীনা রাষ্ট্রীয় নেতার আগমন ঘটে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সালে। তদানীন্তন উপপ্রধানমন্ত্রী (Vice Premier) লি শিয়েন নিয়েন (Li Xien Nien) বাংলাদেশ সফরে আসেন। পরে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং জেনারেল এরশাদের আমলে বাংলাদেশ সফর করেন। প্রেসিডেন্ট লি শিয়েন নিয়েনের সফরই চীনের রাষ্ট্রপতি পর্যায়ে বাংলাদেশে প্রথম সফর।

শি চিনপিংয়ের এ সফর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও বহুল প্রত্যাশিত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চার দশক পূর্তি উপলক্ষে এই সফর গত বছরই হওয়ার কথা ছিল। এ বছর কিছু দেরিতে হলেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে চীনা রাষ্ট্রীয় নেতার এ সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরের প্রাক্কালে আমি (লেখক) কালের কণ্ঠে ‘প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখি (কালের কণ্ঠ, ১১ মার্চ ২০১০)। আমি প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সিংহদ্বার উন্মোচনের বার্তা বহন করে বলে উল্লেখ করি।

২০১০ সাল থেকে ছয় বছরে চীন-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। যোগাযোগ (connectivi) জল-স্থল-অন্তরীক্ষে উন্নয়ন ও বিস্তারের বিশাল সম্ভাবনা এরই মধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। BCIM-EC (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর)-এর বাস্তবায়ন পুরো এই অঞ্চলে অর্থনীতি, যোগাযোগ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটাবে বলে সবাই বিশ্বাস করেন। চীনের সঙ্গে হান রাজবংশের মহা পরাক্রমশালী সম্রাট হান উতি খিস্ট্রপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে তাঁর বিশেষ দূত চাং ছিয়েনকে পশ্চিমের রেশমপথ ধরে বেকট্রিয়ায় (বর্তমান আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য) পাঠিয়ে এই অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, পশ্চিমাঞ্চলের রোডের চেয়ে অনেক আগে চীনের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের রেশমপথ দিয়ে (Eastern Silk Road) বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ছিল। এর অর্থ আড়াই হাজার বছরেরও আগে স্থাপিত হয়েছিল চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক।

শি চিনপিংয়ের এ সফর একটি যুগ সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এর মধ্যেই মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকা সফর করে গেছেন এবং ঢাকা থেকেই তিনি দিল্লি যান। ভারত এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লজিস্টিক এক্সচেঞ্জ অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেছে। এশিয়া প্যাসিফিকের নৌঘাঁটিগুলোসহ সব লজিস্টিক বেস ও ফ্যাসিলিটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য উম্মুক্ত থাকবে। জোটনিরপেক্ষ ভারতের জন্য সামরিক এ জোটভুক্তি তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতিতে এক বড় রকমের পরিবর্তন। চীন ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তিকে এরই মধ্যে তাকে ঘিরে ফেলার এক আক্রমণাত্মক উদ্যোগ বলে মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে এশিয়া প্যাসিফিক পিভোট স্ট্র্যাটেজির কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে।

বিশ্বরাজনীতির এ রকম সমীকরণের প্রেক্ষাপটে চীনের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর বিভিন্ন কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আড়াই হাজার বছরের গভীর সম্পর্ক চীন ও বাংলাদেশের। শতাব্দীতে শতাব্দীতে, যুগে যুগে তা সমৃদ্ধ হয়েছে। ফা হিয়েন (Fa Xien), হিউয়েন সাং (Xuan Zang), অতীশ দীপঙ্কর, অ্যাডমিরাল চাং হ (Zhang He) আমাদের দুই প্রাচীন সভ্যতার যোগাযোগ স্থাপনে, প্রীতি, সম্প্রীতি ও মৈত্রী বন্ধনকে সমৃদ্ধিশালী ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল কালান্তরের সৃষ্টি করেছে।

বন্ধুপ্রতিম, ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ চীন। চীন সম্পর্কে কিছু লিখতে গেলেই চীনের সুপ্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস ও বাংলাদেশের সঙ্গে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে সম্প্রীতি ও মৈত্রী বন্ধনের কথা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে, যা এক দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রায় পাশাপাশি চীনের অবস্থান। বাংলাদেশ ও চীন অতি নিকট প্রতিবেশী দেশ। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বিভাজনের যে ভূখণ্ড, তা আয়তনে অনেক ছোট, প্রায় ১০০ কিলোমিটারের মতো দূরত্বের। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, আড়াই হাজার বছরেরও আগে আমাদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমাদের বহু দূরের পূর্বপুরুষরা পরস্পর যোগাযোগ করেছিল। সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। আদান-প্রদান করেছিল। হিমালয় ডিঙিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন ফা হিয়েন, শুয়ান জাং, ই চিং। তেমনি বাংলাদেশ থেকে ঢাকার সন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চীন গমন করেন। তিনি তিব্বতে ভগবান বুদ্ধের অমিত বাণী—অহিংসা পরম ধর্ম, সর্বজীবে দয়া—তিব্বত অঞ্চলজুড়ে হেঁটে হেঁটে প্রচার করেন। ১৬ বছর তিব্বতে ধর্ম ও জ্ঞান প্রচার করে সেখানেই মহাপ্রয়াণ করেন। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শান্তির দূত মহান সমুদ্র পর্যটক ও বিশ্বশ্রেষ্ঠ নাবিক অ্যাডমিরাল চাং হ শত জাহাজের বহর নিয়ে ৩০ হাজার নাবিক সহকারে সাতটি আন্তসমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন। এশিয়া ও আফ্রিকার ৩০টি দেশ ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। অ্যাডমিরাল চাং হর বিশাল নৌবহর কমপক্ষে দুইবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। সুবা বাংলার শক্তিমান শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ তাঁর রাজধানী সোনারগাঁর পানাম নগরীতে বিশাল বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা সভার আয়োজন করে তাঁকে স্বাগত জানান। সুবা বাংলার সুলতানদের সঙ্গে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে পরাক্রান্ত মিং সম্রাটদের সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সমৃদ্ধি ও মৈত্রীর মাপকাঠিতে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে চীন-বাংলা সম্পর্কের সুতায় টান পড়ে। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের আধিপত্য বিস্তৃত হয়। এক পর্যায়ে তা স্তিমিত হতে হতে ছিন্ন হয়ে যায়। ব্রিটিশরা বাংলাদেশসহ পুরো ভারতবর্ষ অধিকার করে বিশাল উপনিবেশ স্থাপন করে। A Jewel in the crown। তেমনি চীনেও ইউরোপের উপনিবেশবাদী দেশগুলো আধিপত্য গড়ে তোলে। বাংলা ও চীনের ঐতিহাসিক গভীর সম্পর্কে ছেদ পড়ে। দুই দেশেরই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত হয়।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সুপ্রাচীনকাল থেকে চীন নৌ ও স্থলশক্তিতে অত্যন্ত বলবান দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র ইতিহাসে অন্য কোনো দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেনি। অন্য কোনো দেশ দখলে নেয়নি। আধিপত্য বিস্তার করেনি। বরং সব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এসেছে। প্রাচীন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চীন আজ পর্যন্ত অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি এবং শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে সহাবস্থানে দৃঢ় বিশ্বাস করেছে। ‘পঞ্চশীলা রাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে বিশ্ব আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্মিত এবং বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা সুরক্ষিত। ’ চীন এই মহান নীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে চোখ ফেললে আমরা দেখতে পাই, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির পর একাধিকবার চীন সফর করেন এবং মাসাধিককাল চীনে অবস্থান করেন। তিনি চীনের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, দর্শন ও বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অভিভূত হয়ে ওঠেন। আধুনিক ইতিহাসে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ১৯৫৬ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা সফর করেন। প্রেসিডেন্ট লিউ শাও চি ১৯৬৬ সালে আবারও ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশের জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চীন সফর করেন এবং চেয়ারম্যান মাও জে দং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ও মার্শাল চু তের সঙ্গে মিলিত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন। ম্যাডাম সু চিং লিং (ম্যাডাম সান ইয়ােসন) ১৯৬৭ সালে ঢাকা সফরে আসেন। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এমনই একটি সময়ে মাও জে দংয়ের আমন্ত্রণে চীন সফর করেন এবং চৌ এন লাইসহ কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন করেন।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটে ১৯৭৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে। জিয়ার দৃষ্টি ছিল পূর্বমুখী। সেই সময় চীনের শীর্ষ নেতা চেয়ারম্যান মাও জে দং ও চৌ এন লাই জীবিত ছিলেন। আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর থেকে বরাবরই চমৎকার। দিনে দিনে তা নিবিড় হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে। এই সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ভিন্ন মতাদর্শের ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একটি iconic, role model হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিরাজ করছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে চীন প্রভূত সহযোগিতা করে চলেছে।  

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক, ভূকৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থান এমন যে তা আঞ্চলিক কৌশলগত ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এমনকি বৈশ্বিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ সেতু হিসেবে অবস্থান করে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ, আবার তেমনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারও দেশ। এশিয়ার দুই দানবপ্রমাণ দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান। একটি বৃহৎ উদীয়মান রাষ্ট্র ভারত। আরেকটি ১০০ কিলোমিটারের দূরত্বে শান্তিকামী-শান্তিবাদী-বন্ধুত্বপরায়ণ মহাচীন, যা এরই মধ্যে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছে।

চীনের সূর্য আজ মধ্যগগনে। চীনে এখন  high noon। অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্যে চীন বিস্ময়কর অবস্থান নির্মাণ করেছে। চীন এক বেল্ট-এক রোড ও সামুদ্রিক নবতর সিল্ক রোড পুনর্নির্মাণ উদ্যোগের বাস্তবায়নে প্রতিবেশী সব দেশ নিয়ে এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর মধ্যেই চীন এআইআইবি (AIIB-Asian International Investment Bank) প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ এর সদস্য হয়েছে। ভারত এ সমৃদ্ধ এআইআইবির সদস্য। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আধুনিক যোগাযোগ ও ভৌতকাঠামো নির্মাণে এআইআইবি ভবিষ্যতে বিশাল অর্থের জোগান দেবে।

শি চিনপিং বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তাঁর এই সফর শুভ হোক, সুন্দর, হোক, সফল হোক। আমাদের দুই দেশের নতুন নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত আরো উন্মোচিত হোক কামনা করি। চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অর্থবহ সহযোগিতা করে চলেছে। এই সহযোগিতা আরো বিস্তৃত হোক, আরো মজবুত-ব্যাপক হোক, সুসংহত হোক, দৃঢ় হোক। বাংলাদেশ নিজের শক্ত পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক—চীন তা দেখতে চায়। চীন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম ও নিরাপত্তায় আরো শক্তিশালী দেখতে চায়। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশ আরো বড় ভূমিকা রাখুক, কামনা করে।

আমার মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাস। আমি তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। চীনা সামরিক বাহিনীর আমন্ত্রণে চীন সফরে যাই। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল চীনের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান জিয়াং জেমিনের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হওয়ার। প্রেসিডেন্ট জেমিনের সঙ্গে আলাপের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি আশির দশকে দীর্ঘ সময় চীনে থেকেছেন। তখনকার চীন আর আজকের চীনের মধ্যে অনেক তফাত। এই কয়েক দশকে চীনে অনেক পরিবর্তন এসেছে, চীন আধুনিক হয়েছে। আমাদের নেতৃত্বেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেক তরুণ নেতৃত্বে এগিয়ে এসেছে। এদের অনেককেই আপনি তখন দেখেননি। আমি শুনেছি, বাংলাদেশেও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ঢাকার স্কাইলাইন বদলে গেছে। আসলে পৃথিবী সব সময় পরিবর্তনশীল। কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও আপনি কি বলতে পারেন একটি বিষয়ে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি এবং কখনো ঘটবেও না?’ তিনি বলে চললেন, ‘সেটা চীন ও বাংলাদেশের সম্প্রীতির সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রতি চীনের নীতির সম্পর্ক। এ নীতির কোনো পরিবর্তন নেই, কখনো পরিবর্তন হবেও না। চীন সব সময় সব সংকটে, দুঃসময়ে ও দুর্দিনে বাংলাদেশের পাশে থাকবে, তার সম্প্রীতি ও সহযোগিতার হাত সদা সম্প্রসারিত রাখবে। ’ আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের কথাগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা ও স্পষ্টতা লক্ষ করি। তাঁর আন্তরিকতা ও উষ্ণতা আমার হৃদয় স্পর্শ করে।

চীনের প্রতি পূর্ণ আস্থাবান বাংলাদেশের জনগণ প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের এ সফরকে অনেক বড় করে মূল্যায়ন করে। আশা করে এ সফরের অনেক সাফল্য, আশা করে অনেক অর্জন এবং এ অর্জন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় আরোহণের। এ সাফল্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে চীনের সহযোগিতার সিংহদ্বার উন্মোচনের।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক, অনেক বিস্তৃত, বহুবিধ ও বহুমাত্রিক। চীন আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে; আরো এগিয়ে আসার প্রত্যাশায় আমরা গভীর আগহে তাকিয়ে আছি। আমাদের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, ক্রীড়া ইত্যাদি বিষয়ে চীন অর্থবহ উন্নয়ন ঘটাতে পারে। চীন এরই মধ্যে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বৃহৎ মৈত্রী সেতু নির্মাণ করেছে। পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। যমুনা বক্ষে আরেকটি সেতুসহ নদীমাতৃক বাংলাদেশে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে চীন প্রয়োজনীয় সব সেতুর নির্মাণ কাজ করতে পারে। ঢাকার ভয়াবহ যানজট নিরসনে পাতাল রেল ও একই সঙ্গে আকাশ রেলপথ নির্মাণ করতে পারে। চট্টগ্রাম-কুনমিং সরাসরি যোগাযোগসহ বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা  BCIM-EC বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য চীনকে আরো এগিয়ে আসার অনুরোধ করা যেতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে চীন সম্প্রতি রেল যোগাযোগব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন করেছে। বিশ্বের দ্রুততম ট্রেনের (ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার) প্রযুক্তি উদ্ভাবন চীনই করেছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ রেল যোগাযোগব্যবস্থা (পেইচিং থেকে তিব্বত) চীনই নির্মাণ করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে অবস্থিত কয়লা খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন করে কয়লা জ্বালিত আরো অনেক প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করতে পারে। চীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে আমাদের সহযোগিতা করতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রটি রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এমনি চীনের সহযোগিতায় আরেকটি পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্র নির্মিত হতে পারে। চীন সরকার বিশেষভাবে আগ্রহী তাদের উদ্যোগে, অর্থায়নে ও কারিগরি সাহায্যে বঙ্গোপসাগরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠায়; যেমনটি তারা পাকিস্তান, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় করেছে। চীনের কাছ থেকে আমরা সাগরবক্ষের তেল ও গ্যাস উত্তোলনেও সহযোগিতা নিতে পারি। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। এ সমস্যা নিরসনে আমাদের রপ্তানি বাড়াতেও চীনের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ (FDI) আসতে পারে। চীনের জন্য স্পেশাল ইকোনমিক জোন ও জয়েন্ট ভেঞ্চার মহাপরিকল্পনা এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন কৃষি ক্ষেত্রে অতি উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড রাইস উদ্ভাবনসহ যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তার প্রযুক্তি আমাদের হস্তান্তর করতে পারে।

সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী, যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করতে চীনের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রয়োজন। আমাদের সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, বিমানবাহিনীর জঙ্গি জাহাজ ও নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ আরো সমৃদ্ধ করা অপরিহার্য। চীনা মুক্তিফৌজের উদার সহযোগিতা আমরা কামনা করি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করতে। বাংলাদেশের নীল-অর্থনীতি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে চীন বিশাল সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারে। আমাদের সমুদ্র সম্পদ সংরক্ষণে ও তেল-গ্যাস উত্তোলন ও আহরণে চীনের সহযোগিতা আমরা প্রত্যাশা করি।

শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর আমাদের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ জটিল যুগ সন্ধিক্ষণের কঠিন ক্রান্তিতে দাঁড়িয়ে। অনেক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে। পথে অনেক বাধা। সাগরে উত্তাল ঢেউ। বিশাল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ও অভিশপ্ত। আজ নদীমাতৃক বাংলাদেশের সব নদ-নদী স্রোতহারা, পানিশূন্য। সাগরবক্ষে ঝড়। বাংলাদেশের আজ প্রয়োজন চীনের মতো ঐতিহ্যবাহী মহান এক বন্ধুর নিবিড় নৈকট্য ও পারস্পরিক সমঝোতা এবং সম্পর্কের গভীর উষ্ণতা। প্রয়োজন বিশ্বস্ত বন্ধুর উদ্দীপক অনুপ্রেরণা ও বিশাল আস্থা। প্রয়োজন সাহসী ও উদার, নিরবচ্ছিন্ন ও বহুমাত্রিক সহযোগিতা। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ও চীনের জনগণ প্রতীক্ষমাণ।

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান


মন্তব্য