kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার মান

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার মান

আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বৈতরণী পার করা এখন খুব একটি কঠিন কাজ নয়। কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও পাসের হার বেড়েছে।

আগের মতো তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থী পাওয়া এখন দুষ্কর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে; কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম—এমনও আমরা লক্ষ করি। দিনে দিনে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমলেও শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা যাচ্ছে না। বৈতরণী পারের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক তারতম্য রয়েছে। যেমন, কলা ও সামাজিক অনুষদভুক্ত কোনো বিষয়ে পাস করতে যে পরিমাণ শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয় তার চেয়ে ঢের বেশি লাগে অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে। শিক্ষা সহজ—এ অর্থে সব বিষয়কে বোঝায় না। ফলে মেধা ও শ্রমের নিয়ামকে বিষয় নির্ধারণের প্রয়োজন পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটলে হোঁচট খেতে হয়। কষ্টে বৈতরণী পার করা গেলেও ফল ভালো হয় না। কারো কারো ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে।

সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ধারণা বহুকাল থেকে। প্রাথমিক বিদ্যালয় আগ থেকে সরকারি, তবে মাধ্যমিক ও কলেজ স্তরে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান ছিল এবং এখনো আছে। রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধারণা থাকলেও সরকারীকরণের বদৌলতে তা কমে এসেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি হলেও গত দুই দশকে বিভিন্ন নামে বেসরকারি ও সরকারি সাহায্যপুষ্ট ও দাতা সংস্থার সহযোগিতা এবং ব্যক্তি উদ্যোগেও পরিচালিত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। এদের মধ্যে প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, কিন্ডারগার্টেন, ব্র্যাকসহ অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার বিদ্যালয় অন্যতম। মজার বিষয় হলো, এদের অনেকের প্রতি সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে তাদেরও বই দেওয়া হয়। তাদের নিজস্ব পাঠ্যপুস্তক রয়েছে, তবে জাতীয় কারিকুলামের আওতায় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। বেতনসহ অন্যান্য বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে এক অন্য রকম পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এখানে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। এরা সরকার থেকে বেতন পায় বিধায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে তাদের মান ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলা যায় না। কলেজের ক্ষেত্রে একই ধারণা প্রযোজ্য। মফস্বলের বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে এবং তারা তুলনামূলকভাবে অন্যদের চেয়ে ভালোও করছে। এখানে সমস্যা বহুদিন থেকে। নিয়োগপ্রক্রিয়া ও পরিচালনা পরিষদ ঢেলে সাজানোর জন্য বহুবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে; কিন্তু কার্যত ফল ভালো হচ্ছে না। বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয়ের সংখ্যাও বাড়ছে।

আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ ও সহজীকরণের কাজ শুরু হয় মূলত ১৯৯২ সাল থেকে। এ সময় সরকারি পর্যায়ে দুটি বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, যেখানে সব সরকারি ও বেসরকারি কলেজকে এর আওতায় আনা হয়। আর একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন প্রণয়ন করা। এ দুটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় এবং সহজও হয়। শুরুতে কম হলেও ক্রমান্বয়ে বেসরকারি কলেজগুলোয় উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে অনার্স, মাস্টার্স ও অন্যান্য বিষয় চালু হয়, যা আমাদের শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে বড় এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষকের অভাবসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষা অপরিপক্ব হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে ডিগ্রি অর্জনের বিষয়ে পরিণত হয়।

উচ্চশিক্ষার জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের পর ২০১০ সালে এসে এর সংশোধন করা হয়। সরকারি পর্যায় থেকে আইন মেনে চলার জন্য এর উদ্যোক্তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে সাফল্য নিতান্ত কম। আইনের অধিকাংশ ধারাই কার্যকর হয় না। এমনকি যেগুলো মৌলিক ও বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তারও বাস্তবায়ন নেই। হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেকের নামমাত্র নিজম্ব ক্যাম্পাস রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। তাদের মধ্যে রয়েছে মালিকানা ও ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব। রয়েছে সনদ-বাণিজ্যের মতো অভিযোগ। এ পর্যন্ত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তার মধ্যে কোনোটিই তারা পুরোপুরি দূর করতে সক্ষম হয়নি। তবে এর একমাত্র ও প্রধানতম কারণ হতে পারে তাদের ব্যবসায়িক মনোভাব। যদি তা-ই না হতো, তাহলে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে সমস্যা কোথায়; যদি তা-ই না হতো, তাহলে মালিকানা নিয়ে সমস্যা কেন; যদি তা-ই না হতো, তাহলে ট্রাস্টি বোর্ডে কেন সমস্যা? তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা উচিত, অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন—স্কুল ও কলেজে যে পরিমাণ সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এর পরিমাণ শূন্য। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি এখন ভেবে দেখা যেতে পারে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়লে সমস্যা হয়। কেননা এখানকার যাবতীয় খরচ আসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারালে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি মনে করে তার পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব নয়, তবে কেন ভর্তি হওয়া? আর কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের ভর্তি না করানো। এতে বাণিজ্য বন্ধ হবে এবং শিক্ষার মান বাড়বে। আমার জানামতে, কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে মেধাবীদের বেছে নিচ্ছে। তারা পারলে অন্যরা কেন পারবে না।   আইন মেনে চলা ও নিয়মতান্ত্রিক পথ অবলম্বনের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বিষয়াদির মধ্যে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। এতে অনেক সমস্যা এমনিতেই কেটে যাবে। পাবলিক ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার দূরত্ব কমানো যাবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য