kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিএনপি-জামায়াতের অন্তিম দশা

কর্নেল এস এম শওকত আলী (অব.)

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপি-জামায়াতের অন্তিম দশা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্য হুবহু পাকিস্তানি ধারায় প্রবহমান না হলেও তার যে কিছুটা রেশ নেই, সে কথা কি নিশ্চিত করে বলা যাবে? যেখানে স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম ২০ বছরের মধ্যে প্রায় ১৫ বছরই সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক চর্চা প্রক্রিয়ায় কিছুটা যে ব্যত্যয় ঘটেনি তা দৃঢ় কণ্ঠে বলার সক্ষমতা কই? ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত ছিল (ক্ষণকাল একদলীয় শাসনব্যবস্থা ব্যতীত) ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত সেই গণতন্ত্রের শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের এই দীর্ঘ ১৫ বছরের সামরিক শাসনকাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র গঠনে একটা অভিশপ্তকাল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

সে সময়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিত্রটাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া হয়েছিল একটা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে।

বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট হয়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সমৃদ্ধ হয়ে ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের দুই মন্ত্রী যখন শপথ নিল, তখন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ষোলোকলা পূর্ণ হলো। এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলো। রাজনীতির সমীকরণে বিএনপি জামায়াতের বন্ধনে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে গেল যেন একে অন্যের রাজনৈতিক শক্তির পরিপূরক। কেউ কাউকে ছেড়ে যাওয়া মানে তাদের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ভোটের হিসাব জামায়াতকে নিয়েই আবর্তিত। জামায়াত-বিএনপির সম্মিলিত ভোটের শক্তি দিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত যৌথ শক্তিকে ভোটে পরাস্ত করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ধারণা করা হয়ে থাকে, ২০০১-০৬ সময়কালে চারদলীয় জোট সরকারের অদম্য দুর্নীতি ও অপশাসনই আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অন্যতম প্রধান কারণ।

ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করে। প্রথমত, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বিচারের পথে সব প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে তা নিশ্চিতান্তে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাধার মুখে অবিচল থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারিক প্রক্রিয়া দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যে ধারা অব্যাহতভাবে এখনো এগিয়ে চলছে। এই দুই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে ব্যাকফুটে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং জাতির সামনে উভয় দলের রাজনৈতিক দৈন্য ও বৈকল্য প্রকাশ পায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বিচারিক প্রক্রিয়া চলা অবস্থায়ই দেশের সচেতন মানুষের কাছে একটা বিষয় অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায় যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যায় অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডেপুটি সেনাপ্রধান হিসেবে অভ্যুত্থানের আগে একাধিকবার আলোচনায় বসেছিলেন (কর্নেল ফারুক ও রশিদ তাদের সাক্ষাৎকারে বলেছে যে ১৯৭৫-এর মার্চ মাসে এ বিষয়ে জেনারেল জিয়ার সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়)। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষকেই এ বিষয়ে অবগত করাননি, যেটা তাঁর অবশ্যই করণীয় ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের সেনা অভ্যুত্থানে তিনিই সর্বাধিক বেনিফিশিয়ারি হয়েছেন। সামগ্রিক বিবেচনায় তিনিও যে এ অভ্যুত্থানের পরোক্ষ সহযোগী ও মদদদাতা ছিলেন, সেটি বললে খুব একটা সত্যের অপলাপ হবে না। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর সেনা অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরই তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন, কিন্তু তিনি ওই অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে জেলহত্যা সম্পন্ন করার পর তাদের দেশ ত্যাগে শুধু সহায়তা করেননি, বরং বাংলাদেশের বিদেশি কূটনৈতিক মিশনে তাদের সবার নিয়োগ নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে ভবিষ্যতে খুনিদের বিচারকাজ রহিত করা হয়। এতে প্রতীয়মান হয়, তিনি ওই সব অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তার প্রতি কতটা কমিটেড ও সদয় ছিলেন। এ ছাড়া সেনা সমর্থিত নির্দলীয় সরকারের সময় খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্রদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয়। একপর্যায়ে তারেক রহমান ভবিষ্যতে রাজনীতি না করার অঙ্গীকার করে চিকিৎসার জন্য দেশ ত্যাগ করেন এবং আরাফাত রহমান দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়েই নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির একটা বড় অংশ প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সংস্কারবাদী দল গঠনে প্রবৃত্ত হয়, যার মধ্যে অনেকেই এখনো মূল দলে স্বরূপে ফিরে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা ছিল বিএনপির জন্য রাজনৈতিক হারাকিরি। ২০১৩ সালে হেফাজতকে সমর্থন করে সরকার উত্খাতপ্রচেষ্টাও ছিল রাজনৈতিক ব্লান্ডার। বিএনপির রাজনৈতিক দৈন্য এখানেই থেমে থাকে না। ২০১৫ সালের শুরুতে তিন মাসের অধিককাল পেট্রলবোমা সন্ত্রাস বিএনপিকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।

ফিরে আসি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে জামায়াতের ভূতপূর্ব আমির গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামীসহ প্রথম সারির অন্য নেতারা বন্দি হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত হয়। এর মধ্যে গোলাম আযম ৯০ বছরের সাজা খাটা অবস্থায় কারাগারে মৃত্যুবরণ করে এবং আমৃত্যু দণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত সাঈদী সাজা ভোগ করছে। অন্যদিকে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং সর্বশেষ মীর কাসেম আলী যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাদের কৃত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়। প্রথম সারির নেতারা বন্দি হওয়ার পর দল ও সিনিয়র নেতাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি বিবেচনা করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করে। প্রথমত, এই যুদ্ধাপরাধ বিচারকাজ বন্ধ করার জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করে শক্তিশালী বিদেশি লবিস্ট নিয়োগ করে; দ্বিতীয়ত, কাদের মোল্লার ফাঁসি ও সাঈদীর বিচারের পর সর্বশক্তি নিয়োগ করে দেশের মধ্যে প্রায় গৃহযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াস চালায়; তৃতীয়ত, দেশকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর করার জন্য তারা এবং তাদের সমমনা সংগঠনের সদস্য দ্বারা ব্লগার হত্যাসহ বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করায়; চতুর্থত, নব্য জেএমবির মতো কিংবা আইএসএস বা আল-কায়েদা মতাদর্শীদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি করা; পঞ্চমত, যুদ্ধাপরাধী সিনিয়র নেতারা সাজাপ্রাপ্ত হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে নৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ায় প্রকাশ্য নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে নিজেদের আপাতত নির্বাসিত রেখে সুযোগের অপেক্ষায় দিন গোনা। এ ছাড়া বিএনপির প্রতিটি কর্মকাণ্ড কিংবা অপকর্মকাণ্ডে চোখ বন্ধ রেখে সমর্থন দেওয়া। সব মিলিয়ে তাদের স্বাভাবিক রাজনীতিতে দেউলিয়াত্ব বিরাজ করছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো আওয়ামী লীগের অবস্থান অন্য সব দলের সম্মিলিত ওজনের চেয়েও কিছুটা বেশি বললে অত্যুক্তি হবে না। যদিও বর্তমানে দলটি বঙ্গবন্ধু সৃষ্ট দলের সংগ্রামী, লড়াকু, আপসহীন ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে অনেকটাই কক্ষচ্যুত। বিগত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে অন্তর্দ্বন্দ্বে মাঠপর্যায়ে কয়েক শ নেতাকর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তথাপি স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী এবং স্বাধীনতা-উত্তর অতি স্বল্প সময়ে সংবিধান প্রণয়ন করে জাতিকে দিকনির্দেশনা প্রদানকারী এ দলই বাংলাদেশের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতিতে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস। এ দলের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, তাই যখনই দলটি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে, অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দল থেকে অনেক বেশি সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি এ দলের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছে। এর মধ্যে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বেশ কিছু সফলতা অর্জন করলেও এখনো যে তাদের সম্মুখে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট


মন্তব্য