kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এপার-ওপার

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ও সার্কের ভবিষ্যৎ

অমিত বসু

অন্যান্য   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়।

দুই দেশের মৈত্রী উধাও। যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব সীমান্তে। ১৮ সেপ্টেম্বর শনিবার ভোর সাড়ে ৫টায় পাক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদের হামলায় নিহত ১৮ ভারতীয় জওয়ান। কাশ্মীরের সীমান্ত শহর উরিতে ঘুমের ঘোরে থাকা সেনারা বুঝতেই পারেনি এমন আক্রমণ হতে পারে। ডিউটি বদলের সময় আচমকা আঘাত। পুড়ে মৃত্যু ১৪ জনের। চারজনের দেহান্ত গুলিতে। লড়তে গিয়েও পারেনি। ভারতীয় জওয়ানদের অপ্রস্তুত থাকার মুহূর্তটাই বেছে নিয়েছিল জঙ্গিরা। জানত, প্রত্যাঘাতের সুযোগ থাকবে না। তাদের কাছে ছিল চারটি একে-৪৭ রাইফেল, চারটি আন্ডার ব্যারেল গ্রেনেড লঞ্চার।

বিশ্ব স্তম্ভিত। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় সব দেশের তীব্র নিন্দা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষুব্ধ। ভাষণে তার প্রতিফলন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সামাল দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ। কাশ্মীরকে আন্তর্জাতিক ইস্যু করার চেষ্টাও কাজে আসেনি। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব বান কি মুন শরিফের কথার তোয়াক্কা না করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, কাশ্মীর নিয়ে কোথাও সমস্যা থাকলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মেটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসংঘের কিছু করার নেই।

কোণঠাসা পাকিস্তান বন্ধু খুঁজে হতাশ। কেউ হাত বাড়াচ্ছে না, ফিরেও তাকাচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি যে পাকিস্তান একাই নষ্ট করছে, সে বিষয়ে কারো বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই। পাকিস্তানের টার্গেট এখন বাংলাদেশ আর ভারত। রাজনৈতিক শিকড় উপড়ে সন্ত্রাসের আগুন জ্বালতে চায়। সন্ত্রাস ছাড়া রপ্তানি করার আর কিছু নেই। রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইলম গম্ভীর তীব্র আক্রমণ শাণিয়েছেন পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে। তিনি জানিয়েছেন, এই দেশটি আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিলের কোটি কোটি ডলার সরিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের পুষতে খরচ করে। সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানের রাস্তায় অবাধে ঘুরে বেড়ায়। রাষ্ট্রের মদদে, প্রশাসনের অনুমোদনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে তহবিল সংগ্রহ করে। তাই পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র ঘোষণা করা উচিত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যখন রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় দ্বিচারিতাপূর্ণ হিতোপদেশ দান করেছেন, তার কিছুক্ষণ আগেই তাঁর দেশের দূতকে ডেকে সতর্ক করতে বাধ্য হয়েছে দিল্লি। কারণ, তাদের প্রত্যক্ষ মদদ, প্রশ্রয়েই উরিতে ১৮ ভারতীয়ের প্রাণ শেষ। তীব্র শ্লেষে শরিফকে বিদ্ধ করে গম্ভীর বলেন, সুদূর অতীতের জ্ঞানচর্চার বিশ্বনন্দিত কেন্দ্র তক্ষশীলাকে পাকিস্তান এখন সন্ত্রাসবাদ শিক্ষার পীঠস্থানে পরিণত করেছে। সারা বিশ্বের উৎসাহী সন্ত্রাসবাদীরা সেখানে গিয়ে পাঠ নিচ্ছে।

এসব কথা মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না নওয়াজ শরিফের। সন্ত্রাসীদের শাসন করার ক্ষমতা যে তাঁর নেই, তা তিনি ভালো করেই জানেন। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিছু বলা বা করা শরিফের সাধ্যের বাইরে। মোদির সঙ্গে সখ্যের মর্যাদা তিনি রাখতে পারলেন না। মোদি লাহোরে তাঁর বাড়িতে যান। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ঘনিষ্ঠ পড়শির মতো আত্মীয়তা স্থাপন করেন। সেসব হাওয়ায় মেশাল। সন্ত্রাসীরা প্রমাণ করল পাকিস্তানে একজন প্রধানমন্ত্রী আছেন ঠিকই। তিনি কেউ নন, আমরাই সব।

চাপে পড়ে উরিতে সন্ত্রাসী হামলার দায় অস্বীকার করতে চাইছে পাকিস্তান। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়া ইসলামাবাদে বিদেশি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আমরা ভারতের ভালো চাই। উরিতে কেন হামলা করব। এই আক্রমণে আমাদের কী লাভ। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তান বদ্ধপরিকর। এমন ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করা ভারতের বহুদিনের অভ্যাস। কাশ্মীরে হিংসার আগুন নেভাতে পারছে না ভারত। সেটা কী পাকিস্তানের দোষ। কাশ্মীর সমস্যার সমাধান চায় না তারা।

জাকারিয়া যা বলেছেন তাতে বিন্দুমাত্র সত্য খুঁজে পাননি সাংবাদিকরা। তাঁরা উল্টো প্রশ্ন তুলেছেন, ৮ জুলাই কাশ্মীরের অনন্তনাগে হিজবুল মুজাহিদীন নেতা বুরহান ওয়ালি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান শোকদিবস পালন করল কেন। জঙ্গির মৃত্যুতে পাকিস্তানের অশ্রুপাতের কারণ কী। জাকারিয়া জবাব দিতে পারেননি।

পাকিস্তান ইন্ধন দেওয়া বন্ধ না করলে কাশ্মীরে শান্তি ফেরানো যে সম্ভব নয়, সেটা স্পষ্ট বুঝেছেন মোদি। পাকিস্তানকে ঠাণ্ডা করার দাওয়াই খুঁজছেন। তেমনি একটি দাওয়াই ছিল সীমান্ত রেখার ওপারে জঙ্গি ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। ১৯৪৮ ও ১৯৬৫ সালে দুই দেশের যুদ্ধ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিকে ঘিরে। তিনবার হার মেনেও বাংলাদেশ, কাশ্মীরকে ভুলতে পারছে না পাকিস্তান। অবস্থা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব নওয়াজ শরিফের। উরির জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভারত ক্রমেই আক্রমণাত্মক হবে।

ঘটনা কোন দিকে গড়াবে তার ওপর নির্ভর করছে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ভবিষ্যৎ। হাতে সময় কম। পাকিস্তানের মনোভাব না বদলালে বিপদ। ১৯৮৫ সালে ঢাকার শীর্ষ বৈঠকে সার্কের আত্মপ্রকাশ। সার্ক প্রতিষ্ঠার পর দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়। শান্তি পাকিস্তানের পছন্দ নয়। বাংলাদেশ ও ভারতে সন্ত্রাস রপ্তানি করে সার্কের কবর খুঁড়ছে। সার্কের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য