kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শিক্ষার মধ্যেই কি মামদো ভূত লুকিয়ে?

মো. জাকির হোসেন

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শিক্ষার মধ্যেই কি মামদো ভূত লুকিয়ে?

এত দিন জেনে এসেছি, শর্ষের মধ্যে ভূত। এখন দেখছি শিক্ষার মধ্যেই মামদো ভূত! শেওড়াগাছের শাকচুন্নিও ঢুকে পড়েছে শিক্ষার মধ্যে।

আর্টিজান বেকারির হত্যাকাণ্ড স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতম জঙ্গি হামলা। আর্টিজান হত্যাকাণ্ড শুধু কিছু নিরীহ আহাররত মানুষের ওপর আক্রমণ নয়; এটি ধর্ম, মানবতা ও বাংলাদেশের উন্নয়ন-সম্ভাবনার ওপরও চরম আঘাত। আর্টিজানের ধাক্কা না সামলাতেই জঙ্গিরা হামলে পড়ে বৃহত্তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠানের জন্য দেশ-বিদেশে খ্যাত শোলাকিয়ায়। আর্টিজান ও শোলাকিয়ার আগে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গি হামলা চলে আসছে। বিশেষ করে ব্লগার, প্রকাশক ও ইসলাম ধর্মের অনুসারী নয় এমন ব্যক্তিদের কুপিয়ে, গলা কেটে হত্যা প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হলে সভা-সেমিনার, পত্রপত্রিকার কলাম আর টেলিভিশনের টক শোতে জঙ্গিবাদের জন্য একতরফা মাদ্রাসা শিক্ষা ও দারিদ্র্যকে দায়ী করা হতো। আর্টিজান ও শোলাকিয়া হামলার পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা ও হামলাকারীরা উচ্চবিত্ত পরিবারের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-গ্র্যাজুয়েট—এ পরিচয় উদ্ঘাটিত হওয়ার পর দৃশ্যপট মৌলিকভাবে পাল্টে যায়। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের জন্ম, বিস্তার ও প্রতিরোধ নিয়ে নিত্যনতুন তত্ত্ব, তথ্য ও প্রচার-প্রচারণার জটিল হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। এরই মধ্যে বিদেশের মাটিতে বসে বাংলাদেশে আরো হামলা চালানোর হুমকি দেয় জঙ্গিরা। হুমকিদাতাদের ভিডিও প্রকাশিত হলে জানা যায়, এরা সবাই উচ্চশিক্ষিত। পুলিশের সাম্প্রতিক জঙ্গিবিরোধী ব্লক রেইড ও প্রতিরোধ যুদ্ধে যে জঙ্গিরা আহত-নিহত হচ্ছে তাদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড, মদদদাতা ও হামলায় প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা) শিক্ষার্থী-গ্র্যাজুয়েট হওয়ায় সবার দৃষ্টি এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জঙ্গি প্রতিরোধক বহুমাত্রিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ আর ওয়াজ-নসিহতে ব্যস্ত। অন্যদিকে এর মধ্যেই বারোয়ারি কাজের ভারে ন্যুব্জ পুলিশের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়েছে দেশের লাখ লাখ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ওপর নজরদারি করা। পুলিশের এখন নতুন দায়িত্ব সকাল-বিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা তথ্য সংগ্রহ করা।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবলই কি জঙ্গি তৈরির কারখানা? এখান থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের একটা বড় অংশ দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নয় কি? পিটিয়ে, কুপিয়ে, ছুরিকাঘাতে, রগ কেটে জখম বা পঙ্গু করে দেওয়া, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হল দখল, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ছাত্রী নিপীড়ন, শিক্ষক লাঞ্ছনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সিংহভাগই শিক্ষার্থী। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেকেই ভ্রাতৃহন্তারক, নৃশংস খুনি বা ঘৃণ্য অপরাধী হয়ে ওঠে। তাহলে আমাদের উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ ঘাতক হওয়ার, চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ হওয়ার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রও নয় কি? তথাকথিত আন্দোলন-সংগ্রামের নামে নিরীহ মানুষ হত্যার সঙ্গে শিক্ষিত সম্প্রদায়ই তো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়ণের পথে যারা প্রধান অন্তরায়, গণতন্ত্রের চলার পথকে যারা বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে তারা কেউ অশিক্ষিত লোক নয়। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন করে যারা একে কলুষিত করেছে, রাজনীতিকে যারা লাইনচ্যুত করেছে তারা কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত নয়।

বাংলাদেশে এমন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস, দপ্তর আছে কি যেখানে দুর্নীতিবাজরা সংখ্যায় বড় ও দৃশ্যমান নয়? রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে যারা দালান-সেতু নির্মাণ করে, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যারা সে টাকা মেরে দেয় আর ফেরত দেয় না, ব্যক্তিগত লাভের জন্য এ অপরাধমূলক আত্মসাতে যারা সহযোগিতা করে তারা কেউ লেখাপড়া না জানা বা অর্ধশিক্ষিত কৃষক, শ্রমিক, ভাংগাড়ি ফেরিওয়ালা, রিকশা-ঠেলাগাড়িচালক নয়; তাদের সবাই শিক্ষিত, আরো স্পষ্ট করে বললে উচ্চশিক্ষিত।

সরকারি অফিসে ফাইল আটকে মানুষকে জিম্মি করে যারা অর্থ আদায় করে আর রাস্তায় অস্ত্র ঠেকিয়ে যারা দস্যুতা-ছিনতাই করে এ দুয়ের মধ্যে বেশি পার্থক্য আছে কি? দস্যুতা-ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতরা অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত হলে হতেও পারে কিন্তু সরকারি অফিসের ফাইল আটককারীরা সবাই শিক্ষিত। অবৈধ হুন্ডি আর অবৈধ উপায়ে দেশের কয়েক লাখ কোটি টাকা পাচার করে যারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেকেন্ড হোম গড়ে তুলেছে তারা সবাই শিক্ষিত। বছরখানেক আগে বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেকেন্ড হোম গড়ে তোলা যে ৬৪৮ জনের তালিকা নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের মধ্যে রাজনীতিক ৩৮৩ জন এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী আর ব্যবসায়ী ২৬৫ জন। প্রাইভেট, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার নামে যারা প্রতারণা করছে, দিনের পর দিন যারা ক্লাস নেয় না, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব স্ফীতির জন্য যারা বছরজুড়ে নানা প্রজেক্ট-কনসালট্যান্সি করে বেড়াচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের নামে কয়েকটি সভা-সেমিনার আর বিদেশে প্রমোদভ্রমণ করে বিল-ভাউচার বানিয়ে যারা কোটি কোটি টাকা হাপিশ করে দিচ্ছে তারা সবাই তো উচ্চশিক্ষিত।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংখ্যাগতভাবে বেড়েছে কয়েক গুণ, কিন্তু মামদো ভূত আর শাকচুন্নির খপ্পরে পড়ে শিক্ষার গুণগতমান, মূল্যবোধ আর নীতিনৈতিকতা হারিয়ে গেছে তার চেয়ে বহু গুণ। ফলে একদিকে সার্টিফিকেটধারী গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বেড়েছে আর অন্যদিকে মানবিক মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত কমেছে। যে শিক্ষা জঙ্গি, দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, দুর্বৃত্ত রাজনীতিক, জনগণের অর্থলোপাটকারী, অর্থপাচারকারী, বৈধতার মোড়কে রাষ্ট্রের সম্পদ আত্মসাৎকারী তৈরি করে সে শিক্ষার মধ্যে লুকিয়ে থাকা নীতিনৈতিকতা ও মানবিকতাখেকো ভূত তাড়ানোর চিকিৎসা না করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, জিপিএ ৫ পাওয়া ও সার্টিফিকেটধারী গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাওয়া যেতে পারে, তা আখেরে বিপদ বই মঙ্গল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

একসময়ের ভুবনখ্যাত তক্ষশীলা, বিক্রমশীলা, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার উত্তরসূরি বাংলাদেশের শিক্ষার মান, মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতা কেন, কেমন করে লুপ্তপ্রায় হলো তা অবশ্যই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও গবেষণার দাবিদার। তবে শিক্ষার সঙ্গে কয়েক দশকের আত্মীয়তার সম্পর্কের সুবাদে এটা অনুভব করতে পারি, যে শিক্ষা মস্তিষ্ক থেকে গলা দিয়ে হৃদয়ের করিডরে পৌঁছে না, সে শিক্ষার মানবিক আদর্শ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক মানুষ তৈরির সক্ষমতা সীমিত হতে বাধ্য। দেশপ্রেম, ভালোবাসা, সততা ও মানবিকতার বসতবাড়ি হৃদয়ের বন্দরে, মস্তিষ্কের বন্দরে নয়।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

hossain@justice.com


মন্তব্য