kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সময়ের প্রতিধ্বনি

এই অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়

মোস্তফা কামাল

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এই অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়

বাঙালি নাকি আবেগপ্রবণ জাতি। আবার পারিবারিক বন্ধনের ক্ষেত্রেও বাঙালির রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য।

একসময় তো একান্নবর্তী পরিবারও ছিল। সুদীর্ঘকাল এই ধারা অব্যাহত ছিল। এখনো অবশ্য কোনো কোনো পরিবার সে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সন্তানদের বিয়ে হলে মা-বাবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়। একেকটি পরিবার দুই, তিন, চার, পাঁচ টুকরা হয়। কিন্তু কেন?

বউ, শাশুড়ি আর ননদের দ্বন্দ্ব তো একান্নবর্তী পরিবারেও ছিল। কিন্তু কেউ তো তখন সংসার ভাঙার কথা ভাবেনি। তারা সব সময় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ওপরই বেশি জোর দিত। একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতো। সেই ধারা কেন ধরে রাখা সম্ভব হলো না? এখন এমন অবস্থা হয়েছে, পান থেকে চুন খসলেই বলে, সংসার ভাঙ। সংসার ভাঙলেই যেন রাজ্যের শান্তি তারা উপভোগ করতে পারবে। অথচ সেখানে দেখা যায় আরো বেশি অশান্তি।

যে মা-বাবা সন্তান জন্ম দিলেন, তিল তিল করে বড় করে তুললেন, মানুষ করলেন—বিয়ের পর তাঁরাই কেন পর হয়ে যাবেন। সন্তানের প্রতি মা-বাবার যে অধিকার, তা থেকে কেন তাঁরা বঞ্চিত হবেন? আমরা দেখছি, বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধ মা-বাবার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংসারে বয়স্ক মানুষের আর জায়গা হচ্ছে না। অসচ্ছল পরিবারগুলো তো বয়স্কদের ব্যাপারে একেবারেই নির্মম। আয়-রোজগার করার ক্ষমতা নেই বলে তাঁদের মাথা গোঁজারও ঠাঁই নেই। মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারে বয়স্করা নাতি-নাতনি লালন-পালন করে সময় কাটান। তবে অসুস্থ হলে তাঁদের পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। কে চিকিৎসার ব্যয় বহন করবে তা নিয়ে রীতিমতো লড়াই শুরু হয়। কারো এক ছেলে হলে লড়াই হয় স্ত্রীর সঙ্গে। স্বামীর কাছে তার তখন বায়নার পরিমাণ বেড়ে যায়।

আমি এ কথা বলি না যে সংসার ভাঙা কিংবা বয়স্কদের অবহেলার পেছনে কেবল ছেলের বউরাই দায়ী। এ ক্ষেত্রে শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদ-দেবরদেরও ভূমিকা থাকে। নতুন বউ যদি সবার কাছ থেকে সহমর্মিতা পান, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন। পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা ছাড়া কোনো সংসারেই শান্তি আসে না।

আসলে বাঙালি দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবেই ভাঙছে সংসার। বাড়ছে কলহ। প্রতিহিংসা ও পরশ্রীকাতরতা তো আছেই। ‘পরোপকার’ শব্দটি হয়তো বাংলা অভিধান থেকে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে আর আসন গেড়ে বসেছে ‘অনিষ্ট’ শব্দটি। অন্যের অনিষ্ট করেই বাঙালি যেন আনন্দ লাভ করে। কথায় বলে না, নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ! সেটাই বাঙালি এখন ভালো পারে। তারই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সংসার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায়।

আমরা রাজনীতিতে কী দেখতে পাই? দুই নেত্রীর রেষারেষির কারণে দেশের রাজনীতি বিরোধপূর্ণ। দুটি বড় রাজনৈতিক দল পরস্পরকে শত্রু মনে করছে। রাজনীতির দ্বন্দ্ব আঘাত হানছে সমাজ ও পরিবারে। বিরোধপূর্ণ রাজনীতির কারণে দেশের গণতন্ত্র বিপন্ন প্রায়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত। একটি অংশ প্রতিনিয়ত শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ টিকে থাকতে না পেরে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।

অনেকেই বলে থাকেন, পারিবারিক কলহের অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। সত্তরের দশকে তো বাঙালি বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেছে। তখন তো পারিবারিক বন্ধনে কোনো আঘাত পড়েনি। তখনো মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলি ছিল। এখনকার মতো এতটা নিষ্ঠুরতা ছিল না। এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাবলম্বী, তাহলে কলহ কী কারণে?

কোনো কোনো সমাজ বিশ্লেষক মনে করেন, এখন পারিবারিক কলহের অন্যতম কারণ পরকিয়া, অসম প্রেম ও মাদকাসক্তি। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ফেসবুক আসক্তি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পারিবারিক জীবনে। মা-বাবা, ছেলেমেয়ে সবাই ফেসবুক আসক্তির শিকার। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে পারিবারিক কলহ আরো বাড়বে। তবে হিসাবে গরমিল হয় তখন, যখন দেখি একটি কিশোরী মেয়ে কারো প্রেম প্রত্যাখ্যান করলে তাকে হত্যা করা হয়। ছুরিকাঘাত করা হয়। এসিড নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।

গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা এখানে তুলে ধরছি। মাদারীপুরের কালকিনিতে নবম শ্রেণির ছাত্রী নিতুকে হত্যা করে তারই গৃহশিক্ষক মিলন মণ্ডল। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মিলন।

রংপুরে ২২ মাস বয়সী শিশুকন্যা আরিফাকে হত্যা করেন পাষণ্ড বাবা আলাল হোসেন। গত রবিবার পুলিশ আরিফার লাশ উদ্ধার করে। ফরিদপুরে ফারদিন হুদা মুগ্ধকে মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় সে তার মা-বাবাকে গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তারা এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। একই ধরনের ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে। সুমিত চৌধুরী এইচএসসি পরীক্ষায় পাস না করায় তার বড় ভাই বকাঝকা করেছিলেন। আর তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে সে তার মা কুমকুম চৌধুরীকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

রাজশাহীতে মা সাত বছরের শিশুকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। খুলনায় সত্বাবা আবু সাইদ সরদারের হাতে নিহত হয় পাঁচ বছরের শিশু সিয়াম। তার মা তখন ঘরে ছিলেন না। জানা যায়, শিশু সিয়াম খুব কাঁদছিল। কান্না থামাতে ব্যর্থ হয়ে আবু সাইদ তাকে কষে থাপড় মারেন। এতে সে জ্ঞান হারায়। এ অবস্থায় শিশুটিকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে বাইরে চলে যান আবু সাইদ। মা ঘরে ফিরে দেখেন তাঁর শিশুপুত্র মরে পড়ে আছে।

দেশে এ ধরনের অমানবিক ও নিষ্ঠুর ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। কিন্তু সব খবর মিডিয়ায় আসে না। যা আসে সেগুলোই আমরা জানতে পারি। বাকি অনেক নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতার খবর আমরা জানতেও পারি না।

কিন্তু কেন এ ধরনের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতা? পারিবারিক কলহ কি এতই নিষ্ঠুর করে তুলেছে মানুষকে?

এত বেশি অমানবিক হয়ে গেছে মানুষ! যদিও মানবিকতার অনেক উদাহরণ আমাদের আছে। এত এত নেতিবাচক খবরের মধ্যেও যখন পত্রিকায় পাতায় দেখি নিজের সন্তানকে বাঁচিয়ে চলে গেলেন মা, তখন আমাদের নতুন করে আশা জাগে।  

পদ্মার তীব্র স্রোত আর ঢেউয়ের তোড়ে তিন বছরের সন্তান নিয়ে ডুবে যাচ্ছিলেন নাটোরের বাসিন্দা তানজিলা। একপর্যায়ে তানজিলা সন্তানকে বাঁচাতে মাথায় তুলে নেন। ভাসমান অবস্থায় তানজিলা ও তাঁর সন্তানকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিশুটির জ্ঞান ফিরলেও তানজিলার ফেরেনি।

এটাই তো সত্য। মা তো এমনই। নিজের জীবন দিয়ে তিনি সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু সেই সন্তান যদি কোনো কারণে মায়ের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করে, তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

আমি সমাজবিজ্ঞানী নই। লেখালেখি ও সাংবাদিকতা আমার জগৎ। আমার অভিজ্ঞতা বলে, মানুষের মধ্যে মানবতা ও সহমর্মিতা তৈরি হয় পরিবার থেকে। একটা শিশু প্রথম শিক্ষা নেয় পরিবার তথা মা-বাবার কাছ থেকে। তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশু সময়ে যে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেভাবেই মানুষ পরিচালিত হয়। শিশু সময়ের কোনো ভুল শিক্ষা জীবনকে বিপথগামী করতে পারে।

মা-বাবা মানবিক হলে সন্তানও মানবিক হবে। সব ক্ষেত্রে এটাই যে ধ্রুব সত্য, তা নয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মা-বাবার মানবিক গুণাবলিতে সন্তান প্রভাবিত হয়। অন্যকে সহযোগিতা করা, অন্যের প্রতি সদয় হওয়া ও সহমর্মিতা দেখানোর যে শিক্ষা, তা মা-বাবাকেই দিতে হয়।

আমি যদি আমার মা-বাবাকে সম্মান না করি, তাঁদের অবজ্ঞা-অবহেলা করি, তাঁদের প্রতি সদয় না হই, তাহলে আমার সন্তানও আমার সঙ্গে তেমন আচরণই করবে। আমি নির্দয় হলে আমার প্রতিও আমার সন্তান নির্দয় হবে—এটাই প্রকৃতির বিধান।

আমাদের প্রত্যেকের উচিত সন্তানদের সবার আগে মানবতার শিক্ষা দেওয়া। তাদেরকে বেশি সময় দেওয়া, বেশি বেশি মেশা, গল্প করা, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া। তাদের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মানসিকতা তৈরি করা। তা না হলে সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেও কোনো লাভ হবে না। সন্তান মানুষের মতো মানুষ হবে না।

এ ক্ষেত্রে সরকার ও গণমাধ্যম কিছু ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ যেহেতু অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত, তাই তাদের সচেতন করে তোলার জন্য প্রচারণা চালাতে পারে। সচেতনতার অভাবেও মানুষ অনেক সময় নিষ্ঠুর কাজ করে বসে। আবার অজ্ঞতা থেকেও অনেক ভুল করে।

একটি আদর্শ সংসার গড়তে না পারলে আদর্শ সমাজ কিংবা আদর্শ রাষ্ট্র হবে কী করে? আসুন, আমরা সবাই নিজেদের শোধরাই এবং সন্তানদের শোধন করি।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com   


মন্তব্য