kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভিন্নমত

মি. ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাইরের বিশ্ব

আবু আহমেদ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মি. ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাইরের বিশ্ব

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। অনেক আমেরিকান ভোটারের কাছে, বিশেষ করে হোয়াইট ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের অনুপযুক্ততাই উপযুক্ততা।

তারা বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দারুণ অপছন্দ করে। আর তারাই হলো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ লবির বড় সমর্থক। তারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি আছে, সেই শক্তিকে সুবিধামতো ব্যবহার করতে হবে। তাদের সমর্থন পেয়েই তো ওবামার পূর্বসূরি জর্জ ডাব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমেরিকার ইতিহাসে জর্জ বুশ একজন যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবে অনেক দিন খ্যাত হয়ে থাকবেন। তিনি যে দলের ও গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের নিউকন (New Conservatives) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। জর্জ বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডিক চেনি এবং দেশরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন ডোনাল্ড রামসফিল্ড। তাঁরা দুজন বিশ্বকে অনেক মিথ্যা কথা শুনিয়েছিলেন। তাঁদের আসল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের জন্য একটা সফট টার্গেট খুঁজে বের করা এবং ইরাক তাদের নজরে ছিল সেই সফট টার্গেট। আজও রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় এলে বিশ্বের যেসব স্থানে যুদ্ধ হচ্ছে সেগুলো আরো তীব্রতা লাভ করবে। কোনো রিপাবলিকান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্ব থেকে যুদ্ধ তাড়াবেন এমনটি আশা করা যায় না।

ইরাকের তেল হয়তো বুশ গং হস্তগত করতে পারেনি, কিন্তু একটি অগ্রসরমাই উন্নত আরব দেশকে তারা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। আজ রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প বলছেন ইরাক-সিরিয়া-লিবিয়া থেকে কোনো শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। হায় পর, বিশ্ব বিবেকের প্রতি কত বড় নিষ্ঠুরতা! কে তাদের শরণার্থী বানাল? কারা লিবিয়া ধ্বংস করল? কারা মিথ্যা কথা বলে ইরাক আক্রমণ করল? ট্রাম্পরা কি পারবেন ইরাক ও লিবিয়াকে আগের অবস্থানে নিয়ে যেতে? হোয়াইট সুপ্রেমেসি (White Supramacy) স্লোগান তত জোরে দেওয়া না হলেও ট্রাম্প ক্যাম্পেইন কিন্তু প্রকারান্তরে আমেরিকান ভোটারদের সেটাই বোঝাতে চাইছে। সব হোয়াইট একত্র হয়ে ট্রাম্পকে ভোট দিলে তিনি নিশ্চিত জয়ী হবেন। ওই সব ক্যাম্পেইনারের ভাষ্য হলো, ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন হলেন বারাক ওবামার ডান হাত। তাঁকে ভোট দেওয়া মানে ওবামাকে তৃতীয়বারের মতো ভোট দেওয়া। ট্রাম্প দারুণভাবে মুসলিমবিদ্বেষী, তিনি তো বলেই ফেললেন, কোনো মুসলমানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না। পরে অবশ্য একটু সরে এসে বলতে শুরু করেছেন, না, শুধু দোষী ও দুষ্ট মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে আসতে দেওয়া হবে না। সবাই তাঁকে পাগল বলছে। তবে সেই পাগলের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট জগতের বড় অংশের সমর্থন আছে। বিশ্বে এখন ১.৫ বিলিয়ন মুসলমান আছে। কোনো সুস্থ লোক কি বিশ্বাস করবে তাদের সঙ্গে বৈরিতা সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে? ট্রাম্প এ-ও বললেন যে তিনি অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানোর জন্য মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করবেন। সেই দেয়াল নির্মাণের ব্যয়টা বহন করতে হবে মেক্সিকোকে। এই ট্রাম্প আবার বলে বেড়াচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক জেনারেল অথর্ব। তাঁরা এ পর্যন্ত আইএসকে পরাজিত করতে পারেননি। এই ট্রাম্প আবার এ-ও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আইএসকে পরাজিত করতে যত যুদ্ধ করছে তার ব্যয় বহন করতে হবে আরব দেশগুলোকে। অবশ্য ট্রাম্প জয়ী হলে ইরাক-সিরিয়ায় আবারও স্থল সৈন্য পাঠাবেন কি না সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তবে মনে হয় না ট্রাম্প অতটা পাগলামি করবেন। কারণ জর্জ বুশ-ডিক চেনি তো ইরাকে পরাজিত হয়েই সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের এত বড় উপকার করেছেন যে তিনি আরো বেশি ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগে ইরাক-আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য ফিরিয়ে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় কম শিক্ষিত, অপেক্ষাকৃত অভদ্রলোকদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। বারাক ওবামা কৃষ্ণাঙ্গ বটে। তবে তিনি শিক্ষিত ও রুচিবান। যুক্তরাষ্ট্রকে আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে ওবামার মতো আরেকজন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার জন্য। ট্রাম্প জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের হাঁকডাক বেড়ে যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র হাঁকডাক বেশি দেয় দুর্বলদের প্রতি। রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের হাঁকডাক শোনা যায়নি। কারণ রাশিয়া শক্তিধর দেশ। পারমাণবিক বোমার অধিকারী। রাশিয়ানরা যদি ইউক্রেনের আরো কিছু অংশও দখল করে নিয়ে নেয় তাতেও ওয়াশিংটনের হুংকার ততটা বড় হবে না। সেই একই অবস্থা চীনের ক্ষেত্রেও। চীনকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের যত ভয়। চীনের উত্থান সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। চীন পাকিস্তানকে বড় রকমের সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিচ্ছে। সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য হলো নস্যি। তাই তো যুক্তরাষ্ট্র শোরগোল না করে অনেকটা চুপিসারে পাকিস্তান থেকে সরে এসে ভারতকে চীনবিরোধী বলয়ে একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে।

সাত বছরে কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেননি। হঠাৎ করে জন কেরি এসে ঢাকায় হাজির। সেই একই লক্ষ্য, চীনবিরোধী বলয়ে ভারতের পাশে বাংলাদেশকে পাওয়া। কিন্তু এই পাশে পাওয়ার জন্য ভারত যত রকমের মূল্য আদায় করছে বাংলাদেশ কি জানে তার মূল্যটা কত এবং কিভাবে মূল্যটা আদায় করতে হবে? যুক্তরাষ্ট্র যদি দেখে যে ভারতকে হাতে রাখলেই বাংলাদেশকেও হাতে রাখা যায়, তাহলে বাংলাদেশ উপযুক্ত মূল্য পাবে না। বাংলাদেশকে তার অবস্থান আলাদাভাবে জানান দিতে হবে। বাংলাদেশের অবস্থানটা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তবে সত্য হলো চীন বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে যতটা সাহায্য করতে পারবে সেটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আশা করা যায় না। বাংলাদেশকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির স্তরে পৌঁছতে হলে চীনের সাহায্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে কে প্রেসিডেন্ট হবেন, কে হবেন না—সেটা এখনই বলা যাবে না। হিলারির দিকে ভোটারদের সমর্থন বেশি। তবে হিলারিকে তাঁর দুর্বল পয়েন্টগুলো ছাড়ছে না। প্রাইভেট মেইল সার্ভার ব্যবহার করে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে রাষ্ট্রীয় কাজ চালিয়েছেন। ট্রাম্প শিবির বলছে, এটা বিশ্বাস ভঙ্গ। হিলারি বলছেন, তিনি এ ব্যাপারে জানতেন না যে এতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁস হতে পারে। ট্রাম্প বলছেন, দেখুন এই অজ্ঞ মহিলাকে কিভাবে ভোট দেওয়া যাবে? এই ট্রাম্প তাঁর ট্যাক্স ফাইলকে পাবলিক করতে আজতক অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। দোষ হিলারির ছোট হলেও সংবাদমাধ্যম বড় করে সেটা তুলে ধরছে। আর ট্রাম্প যে অনৈতিক অনেক কথা দিনরাত বলে চলেছেন সে ব্যাপারে সংবাদমাধ্যম অতটা দৃষ্টি দিচ্ছে না। হিলারির ভোটাররা হলো মূলত মধ্যম শ্রেণির কিছু হোয়াইট ভোটার, কালো, হিসপানিক ও এশীয়রা। তারা যদি ভোটের দিন (৮ নভেম্বর) দলেবলে ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যায় তাহলে মি. ট্রাম্পের জয়ী হওয়া মুশকিল। কিন্তু হিলারি কি তাঁর ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিতে পারবেন? ওয়ার লবি ও গান লবিস্টরা ট্রাম্পের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এ অবস্থায় হিলারির শক্তি হলো অতি সাধারণ আমেরিকানদের সমর্থন। তবে বিশ্ব অবাক হবে না মি. ট্রাম্প জয়ী হয়ে গেলে। কারণ হলো, এই আমেরিকান ভোটাররাই তো জর্জ বুশের পক্ষেও ভোট দিয়েছিল। সেদিন যদি আল গোর জয়ী হতেন তাহলে অত সহজে ইরাক যুদ্ধ শুরু হতো না।

বহির্বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে অতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তবে তারা যেকোনো ফলের জন্যই তৈরি। এর কারণ হলো, আমেরিকা কতটা খারাপ করতে পারে তা তো তারা জর্জ বুশের সময়ই দেখে ফেলেছে। ট্রাম্প তো অন্তত বুশের চেয়ে খারাপ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতিতে-সামরিক শক্তিতে এক নম্বরে আছে বহুদিন ধরেই। চীনের উত্থান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ দিলেও সামরিক ক্ষেত্রে সেই চ্যালেঞ্জ দেওয়া আজও বহুদূরে। যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বরে আছে, থাকবে যত দিন বাইরের বিশ্বের মেধাগুলো তাদের দেশে গিয়ে থাকতে পারবে, তাদের দেশে গিয়ে গবেষণা করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ ল্যাবগুলোই (Research Labs) এই দেশকে আরো বহু বছর অন্তত এক নম্বর অবস্থানে ধরে রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ লোক সেই দেশের ওয়ার লবির লোকদের থেকে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ লোক অন্য দেশের সাধারণ লোকদের মতোই পরিশ্রম করে আয়-রোজগার করে।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য