kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিএনপির সমস্যা সক্ষমতায় নয়, আদর্শে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপির সমস্যা সক্ষমতায় নয়, আদর্শে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

রাজনীতিতে বিএনপি এক কঠিন সময় পার করছে। দীর্ঘ ৩৮ বছরের রাজনীতির ইতিহাসে এমন সময় বিএনপির কখনো ছিল কি না সন্দেহ।

তারা তাদের রাজনীতি নিয়ে সূক্ষ্ম ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক এবং তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা পরামর্শ দিচ্ছেন কিভাবে এ অবস্থা থেকে দলকে এগিয়ে নেওয়া যায়। দলের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করছেন। কিন্তু কারণগুলোর মধ্যে মূল কারণকেই অনেকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না বা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। দু-একটি কারণ এতটাই বড় যে অন্যগুলোকে গৌণ মনে করা খুবই স্বাভাবিক। গুম, খুন, মামলা, হামলা রাজনীতিতে সচরাচর ঘটনা মনে করা হয়। তবে সাংগঠনিক দুর্বলতা, কমিটি গঠনে সমস্যা, সিনিয়রদের মূল্যায়ন না করা কিংবা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকার ব্যর্থতাও কারণ বটে, তবে তার দায় বিএনপির নিজের অন্য কারো নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ওপরের সমস্যাগুলো সব দল কমবেশি অতিক্রম করছে। বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন সব সময় কমবেশি সরকারি দল করে আসছে। বিরোধী দল এর মধ্যেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যে কারণেই হোক, বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকা যেমন একটি কারণ, তার চেয়ে বড় কারণ আদর্শ থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়া, রাজনীতিতে ক্রমাগত ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন ইস্যুতে দোদুল্যমানতায় ভোগা, যা তাদের আজ এক কঠিন জায়গায় নিয়ে এসেছে।

এরশাদের পতনের পর বিএনপি সংখ্যার বিচারে তিনবার ক্ষমতায় ছিল; কিন্তু শাসন করেছে দুইবার। আমরা যদি তাদের দুইবারের শাসনামলকে সূক্ষ্মভাবে বিচার করি, তাহলে দেখতে পাই প্রথমবার তারা ক্ষমতায় এসেছিল তাদের নিজস্ব যোগ্যতার বলে। বিএনপির আসনসংখ্যা ছিল ১৪০, আওয়ামী লীগ ৮৮ আর জামায়াত ১৮। সে সময় বিএনপির ওপর জামায়তের প্রভাব ছিল ক্ষীণ। বিরোধী দল আওয়ামী লীগও অনেক আসন পায়। গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরুর দিকে এমনটি কাম্য ছিল। সে সময় ছাত্রদল-শিবির সম্পর্ক ছিল দা-কুমড়ার মতো। ধর্মান্ধ চেতনার বাইরে ছিল ছাত্রদল। ছাত্রদল-ছাত্রলীগের মধ্যে সমস্যা থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু উভয়ের শত্রু ছিল শিবির। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তাদের আসনসংখ্যা ছিল ১৪৬, বিএনপির ১১৬ এবং জামায়াতের কমে এসে দাঁড়ায় মাত্র তিনে। আসনসংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ অনেক আসন পায় এবং ছোট একটি দল ও স্বতন্ত্র সদস্যকে নিয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপির শাসনামলে নির্বাচন নিয়ে মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতা এবং ভোটারবিহীন ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করার পরও তারা অনেক আসন পায়। তাদের সঙ্গে অন্যান্য দলের রাজনৈতিক জোট ছিল; কিন্তু অন্য দলে বিলীন হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। মোটা দাগে আদর্শিক রাজনীতির ভেতর বিএনপি কমবেশি ২০০১ সাল পর্যন্ত ছিল।

২০০১ সালের নির্বাচনে রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। বিএনপি তার আদর্শ থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে নির্বাচন করায় বিএনপি এককভাবে ১৯৩ ও জামায়াত ১৪টি আসন পায়। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটলেও ৬২ আসন লাভ করে। নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ থাকলেও শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা ক্ষমতাসীনদের দারুণভাবে পেয়ে বসে। নির্বাচনে দলীয় আদর্শ যেমন ভোটারদের কাছে ক্রিয়াশীল থাকে, তেমনি সাধারণ ও নিরপেক্ষ ভোটারদের কাছে সরকারের কর্মকাণ্ড বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতা গ্রহণের পর বদলে যেতে থাকে বিএনপির চরিত্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অধ্যায় ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপির শাসনামল। এ সময়ে বিএনপি তার আদর্শ থেকে যেমন পুরোপুরি বেরিয়ে আসে, তেমনি ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। দলের নিজস্বতা চরমভাবে হারায় বিএনপি। কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে শোনা যায় যে ছাত্রদল ও শিবিরকে আমি আলাদাভাবে দেখি না; যদিও সরকার পরিচালনার প্রেক্ষাপটে এমনটি স্বাভাবিক ছিল। যে শিবির ছিল তাদের বড় শত্রু, মাত্র এক দশকের মাথায় তারা বড় মিত্র বনে যায়। নিজস্বতা হারানোর এক বড় পথ তৈরি করে। বিএনপি আর পেছনে ফিরে যেতে পারেনি; যার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে, যেখানে তাদের আসন ৩২-এ নেমে আসে। ক্ষমতাসীন দল জোটগতভাবে ২৬৩টি আসন লাভ করে।

রাজনীতিতে একগুঁয়েমি আচরণ সব দলের কমবেশি ছিল; কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত, দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা এবং অস্পষ্টতার মধ্যে বসবাস যে দলকে কতটা খারাপ অবস্থায় নিয়ে যায় তার জ্বলন্ত প্রমাণ আজকের বিএনপি। যেকোনো রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তন হতে পারে। মানুষের জনমতও সময় সময় রূপ বদলায়। আমাদের দুর্ভাগ্য, বিএনপি তার আদর্শ থেকে দূরে সরে এসেছে ঠিক; কিন্তু এতটাই দূরে এসেছে যে তার নিজস্বতা বলতে আর কিছু থাকছে না। দীর্ঘদিনের ব্যর্থতাকে এখন সহজে মোকাবিলা করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির বিচারে যেখানেই হাত দিচ্ছে সেখানেই সমস্যা হচ্ছে। ধারণা করা হয়েছিল নতুন কমিটি হলে সমস্যা কেটে যাবে, দল চাঙ্গা হবে; কিন্তু তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না, বরং দ্বন্দ্ব আরো বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, পদ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভালো পদ না পাওয়া নিয়ে নাখোশ ইত্যাদি। এমন অবস্থায় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান অনেকে। সন্দিহান দলের সক্ষমতা নিয়েও। কিন্তু সব কিছু বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ, উত্তরণের কোনো পথ বের করার চেষ্টা আমাদের চোখে পড়ছে না। বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসনের উদ্দেশে এক খোলা চিঠিতে অনেক ভালোমন্দ কথা বলেছেন। কথাগুলো আমলে নিলে তো আদর্শহীন, দিকভ্রষ্ট ও কৌশলী মনোভাব নিয়ে দল টিকে থাকতে পারে; কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং ক্ষমতায় যাওয়া সহজ হয় না। বিএনপি থেকে চলে যাওয়া দলগুলো বারবার একই কথা বলছে; কিন্তু বিএনপি কোনো কর্ণপাত করছে না। তাদের প্রতি মানুষের আস্থা না থাকার কারণ হতে পারে তাদের আদর্শহীন মনোভাব, বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা। আরো বড় বিষয় কৌশলী মনোভাব পোষণ করা এবং অনেক কিছু খোলাসা না করা। বর্তমানে বিএনপি যেভাবে এগোচ্ছে তাতে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মনোবল আরো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরো হতাশ হতে পারে তারা। তারা ঐক্যের ডাক দিয়েছিল; কিন্তু তেমন সাড়া পায়নি। মাত্র একটি দল চা-চক্রের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে, তবে সেই দলের পরামর্শ ও মতামত নেওয়ার মতো মনোভাব তাদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। যদি থাকত, তাহলে অন্যরা এগিয়ে আসত। মোটকথা বিএনপির রাজনৈতিক ভাবনার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি না। তাদের হয়তো নিজস্ব হিসাব-নিকাশ রয়েছে, তবে সময় যতই গড়াবে ততই আরো বেশি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে। তখন তাদের কৌশলী মনোভাব কতটুকু সফল হবে তা বলাই বাহুল্য। সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়ন ও আদর্শ মুখ্য বিষয় হলে সামনে ক্ষমতাসীনদের ঠেকানো কঠিন হয়ে দেখা দেবে। বড় একটি বিষয় এখনো আসছে না আর তা হলো নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়টি। এখানে বিএনপিকে স্পষ্ট করতে হবে তারা কী চায়। রাজনীতিতে আদর্শের চর্চা বেড়ে গেলে অন্যান্য সমমনা দলকে কাছে টানা সহজ হবে এবং বাড়বে জনসমর্থন। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য