kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জাল নোট শনাক্ত করে আসল নোট বুঝে নিন

রিয়াজুল হক

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জাল নোট শনাক্ত করে আসল নোট বুঝে নিন

আগামীকাল ঈদুল আজহা। পবিত্র এই উৎসবের ওপর ভর করেই সারা দেশে পশুর হাটগুলোয় এর মধ্যেই পশু বেচাকেনা জমে উঠেছে।

অনেক হাটেই প্রতিদিন কোটি টাকার ওপরে নগদ অর্থের লেনদেন হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক তাঁদের পশু নিয়ে হাজির হচ্ছেন পশুর হাটগুলোয়। আবার মধ্যস্বত্বভোগীরাও গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে পশু কিনে হাটে বিক্রি করেন। অনেক কৃষক সারা বছর গরু-ছাগল পালন করে থাকেন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে। অতীতে দেখা গেছে, কিছু অসাধু জাল নোট কারবারির অপতত্পরতার জন্য অসহায় কৃষকদের চোখের পানিই হয় একমাত্র সম্বল। অনেকেই বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পশু পালন করেন। জাল নোট কারবারিদের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন তাঁরা। সাধারণ মানুষের কিছুটা সচেতনতার অভাব ও জাল নোট কারবারিদের নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এই সমস্যা সবাইকেই ভাবিয়ে তুলেছে। প্রত্যেকেরই জানা উচিত আসল নোটের বৈশিষ্ট্যগুলো। আনন্দের পূর্বমুহূর্তে জাল নোট কারবারিদের দৌরাত্ম্য দূর করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বড় নোটের ক্ষেত্রে জাল করার ঘটনাগুলো বেশি ঘটে থাকে। এ জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকা মূল্যমানের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিসংবলিত আসল ব্যাংক নোটের কিছু সহজ বৈশিষ্ট্য, যা খালি চোখে দ্রুত বোঝা যায়, আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন—

কাগজ : নোটটি সিনথেটিক ফাইবার মিশ্রিত অধিক টেকসই কাগজে মুদ্রিত।

ইন্টাগ্লিও লাইন : নোটের ডান দিকে আড়াআড়িভাবে ইন্টাগ্লিও কালিতে সাতটি সমান্তরাল লাইন আছে।

অসমতল ছাপা : নোটের সামনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি মুদ্রিত।

অন্ধদের জন্য বিন্দু : ১০০০ টাকার নোটের ডান দিকে অন্ধদের জন্য পাঁচটি ছোট বিন্দু;  ৫০০ টাকার নোটের ডান দিকে অন্ধদের জন্য চারটি ছোট বিন্দু ও ১০০ টাকার নোটের ডান দিকে অন্ধদের জন্য তিনটি ছোট বিন্দু রয়েছে, যা হাতের স্পর্শে উঁচুনিচু অনুভূত হবে।

রং পরিবর্তনশীল হলোগ্রাফিক সুতা : নোটের বাঁ পাশে চার মিলিমিটার চওড়া নিরাপত্তা সুতা; যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো ও ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকা লেখা আছে; সরাসরি দেখলে লোগো ও ১০০. ৫০০ ও ১০০০ টাকা সাদা দেখাবে; কিন্তু পাশ থেকে দেখলে বা ৯০ ডিগ্রিতে নোটটি ঘোরালে তা কালো দেখাবে।

জলছাপ : কাগজে জলছাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি; প্রতিকৃতির নিচে অতি উজ্জ্বল ইলেকট্রোটাইপ জলছাপে ১০০, ৫০০ ও ১০০০ লেখা আছে এবং জলছাপের বাঁ পাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের উজ্জ্বলতর ইলেকট্রোটাইপ জলছাপ রয়েছে।

ব্যাকগ্রাউন্ড মুদ্রণ : ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের সামনের দিকে পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা অফসেটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ রয়েছে।

নোটের পেছন ভাগ : ১০০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে জাতীয় সংসদ ভবন মুদ্রিত আছে, যা হাতের আঙুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে। ৫০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে বাংলাদেশের কৃষিকাজের দৃশ্য মুদ্রিত আছে, যা হাতের আঙুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে। ১০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে ঢাকার তারামসজিদ মুদ্রিত আছে, যা হাতের আঙুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে।

রং পরিবর্তনশীল কালি : ১০০০ ও ১০০ টাকার ডান দিকের কোনায় ১০০০ ও ১০০ লেখাটি সরাসরি তাকালে সোনালি ও তির্যকভাবে তাকালে সবুজ রং দেখা যাবে। ৫০০ টাকার ডান দিকের কোনায় সরাসরি তাকালে ৫০০ লেখাটি লালচে ও তির্যকভাবে তাকালে সবুজ রং দেখা যাবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেজে ‘সহজেই জাল টাকা শনাক্ত করবেন যেভাবে’ বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে কিছু সহজ উপায় উল্লেখ করা হয়েছে। জাল টাকার নোটগুলো নতুন হবে। কারণ জাল টাকার নোটগুলো সাধারণ কাগজের তৈরি; তাই পুরনো হয়ে গেলে সেই নোট নাজেহাল হয়ে যায় বা তা অতি সহজেই বোঝা যায় ।

জাল টাকার নোট ঝাপসা দেখায়। আসল নোটের মতো ঝকঝকে থাকে না। সেটা নতুন হোক আর পুরনো হোক এবং কিছুটা পাতলা বা হালকা ধরনের, যা একজন আরেকজনের কাছ থেকে টাকা লেনদেন করার সময় একটু মনোযোগ সহকারে দেখলেই বোঝা যায়। জাল নোট হাতের মধ্যে নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিলে তা সাধারণ কাগজের মতো ভাঁজ হয়ে যাবে। আর আসল নোট ভাঁজ হবে না। যদিও সামান্য ভাঁজ হয়, তবুও তা জাল নোটের ক্ষেত্রে তুলনামূলক অনেক বেশি। আসল নোট সব সময় খসখসে হবে।

টাকা সব সময় দুটি অংশ দিয়ে তৈরি হয়। টাকার দুই পাশে দুটি নোট জোড়া লাগানো থাকে এবং এটা হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি বলে পানিতে ভেজালেও খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে না । আর জাল নোট পানিতে ভেজানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা ভেঙে যাবে।

নোট জাল করা ও জাল নোট লেনদেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে জাল নোট কারবারির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধন করে জাল নোটের সঙ্গে জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়। পবিত্র ঈদ সামনে রেখে জাল নোট কারবারিদের প্রতিরোধ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কোনো কৃষক বা ব্যবসায়ী তাঁর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল থেকে যেন বঞ্চিত না হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাড়াতে হবে সচেতনতা। দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত এই চক্রের করালগ্রাস থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমাদের সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

riazul.haque02@gmail.com


মন্তব্য