kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

কোথায় হারিয়ে গেল

ফজলুল করিম

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই/আজ আর নেই’। মান্না দের কণ্ঠে এই গানটি যখন মনে পড়ে, তখন আমরা সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই।

ফিরে গিয়ে আমরা রোমন্থন করি সেই দিনগুলো হারিয়ে গেল কেন। কেন সামান্য ব্যবধানে মানুষে মানুষে আজ এত দূরত্ব। দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে সম্পর্কের বন্ধনে, আত্মীয়তার সঙ্গে আত্মীয়ের। সময়টা কি খুব বেশি দিনের? মোটেই বেশি দিনের নয়। স্বাধীনতার পূর্ব দিনগুলোতে হারিয়ে যাওয়া সজীব দিন। স্বাধীনতাপরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে স্খলন শুরু হয়েছে। বর্তমানে গভীরভাবে দেখা দিয়েছে। বোনে বোনে, শালা-দুলাভাই, মামা-ভাগ্নে, পিতা-পুত্র এমনকি মা-সন্তানের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই দূরত্ব প্রতিদিন ক্রমাগত বাড়ছে।

সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টির পেছনে যুক্তিসংগত কারণ আছে। কিন্তু সেই যুক্তিযুক্ত যুক্তি আমাদের কতটা সুখী করেছে। মানুষ সবাই টাকার পেছনে ছুটছে। একটাই লক্ষ্য কম সময়ে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এ এক অভিনব প্রতিযোগিতা। একদিন এক বন্ধু বললেন, ‘মাত্র এক যুগ আগে আমার এক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। একদিন তার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় আত্মীয়ের কাছ থেকে মোবাইল নম্বর নিয়ে ফোন করি। কিন্তু সে আমাকে চিনতে পারেনি। ’ এই না চেনার জন্য দায়ী কে? আমরা সবাই। একদিন হয়তো আমাদেরও কোনো আত্মীয়কে অনেক রেফারেন্স দিয়ে আইডেন্টিটি দিতে হবে। প্রশ্ন হলো এই দূরত্ব কেন?

ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে আন্তরিকতা। আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চা শুরু করেছি। সেটা মোটেই আমাদের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এই স্বার্থপরতার বিষবৃক্ষ এখন মূলোৎপাটন করতে না পারলে ভালোবাসা অঙ্কুরে আঘাত করবে। একসময় ভালোবাসা হয়ে যাবে নির্বাসিত। ভালোবাসার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় মনে পড়ল দিল্লির সম্রাট শাহজাহানের কথা।  

সম্রাট শাহজাহান বেগম মমতাজের স্মৃতি ধরে রাখতে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন। ২২ হাজার শ্রমিক ২২ বছর কাজ করে তাজমহল নির্মাণ করেছিল, যা হয়েছিল সপ্তমাশ্চর্যের একটি। সম্রাট শাহজাহানের  ছেলে আওরঙ্গজেব সম্রাট হলে শাহজাহানকে বন্দি করেন। এই ইতিহাস সবার জানা।

আমরা চাই সুসম্পর্কের একটি বাসযোগ্য পৃথিবী। সম্রাট শাহজাহান নেই কিন্তু তাঁর তৈরি তাজমহল আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সম্রাট শাহজাহানের মনে বন্দিত্বের কষ্ট ছিল কিন্তু ভালোবাসার কোনো কষ্ট ছিল না। আমাদের মধ্য থেকে ভালোবাসা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে স্বার্থের। নইলে আত্মীয়ের সঙ্গে আত্মীয়ের, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর দূরত্ব কেন? সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সৃষ্টি হয় সন্তানের সঙ্গে পিতা-মাতার দূরত্ব। একই বাড়ি থেকে বাংলাদেশে অসংখ্য সৃজনশীল মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। অধিক সন্তানের মা হয়ে কষ্টে সন্তানদের মানুষ করে রত্নগর্ভা মা হয়েছেন। তাহলে আমরা পারছি না কেন? কোথায় আমাদের ব্যর্থতা, কোথায় আমাদের বাধা, কোথায় আমাদের শূন্যতা, এ জবাব কে দেবে। কাউকে না কাউকে দিতে হবে কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধ সোনালি সেই দিনগুলো থেকে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি কেন? দরকার নামক বস্তু আমাদের পেছন থেকে টেনে ধরে আছে। আমাদের মেমোরির ইরেজ করে দিচ্ছে সোনালি সেই দিনগুলোকে। কত দরকার? এই দরকারকে নিয়ে কবিগুরু লিখেছিলেন, ‘বড়ো কঠিন, বড়ো কুিসত—এই দরকার নামক দৈত্যটা। ’ মানুষের দরকার আছে, এই কথাটা ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে, হা করতে করতে পৃথিবীর বেশির ভাগ গ্রাস করে ফেলেছে। প্রকৃতিও কেবল দরকারের সামগ্রী, মানুষও কেবল দরকারের মানুষ হয়ে আসছে।

দরকার মেটাতে গিয়ে দরকারি বস্তুগুলো রেখে অদরকারি জিনিসগুলো আমরা বেছে নিচ্ছি। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে দূরত্ব। এই দূরত্ব কি কোনোভাবেই দূর করা যায় না? কেউ কি দূর করতে পারবে না? পারবে, আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ পারবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। দূরত্ব দূর করতে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

অতীতে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা কম থাকায় পরিবারের চাষাবাদের জমির আয় দিয়ে সংসারের খরচ চলে যেত। মানুষকে বিদেশ যাওয়ার কথা ভাবতে হতো না, ভাবতে হতো না কর্মের কথা। হতে হতো না কর্মজীবী মানুষ। এখন মানুষ বেড়েছে, চাষাবাদের জমির পরিমাণ কমেছে। মানুষকে সে কারণেই কর্মের পথে যেতে হয়েছে। কর্মময় জীবনে ব্যস্ততা বেড়েছে। সংসারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে কর্মজীবনে সময় দিতে হচ্ছে বেশি। সে কারণে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ইচ্ছা থাকলেও যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এটাও সত্য। যা সত্য, তাকে মেনে নিতেই হবে। এর মধ্যেও মানুষ ইচ্ছা করলে ব্যতিক্রমী হতে পারে। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বের করতে পারে সময় আর সে সময়ই সোহার্দ্য স্থাপনের সময়। আমরা ক্রমাগত অমঙ্গলের পথে পা দিচ্ছি। সবার শুধু দরকার। এত দরকার যে অন্যের দরকারে মাথা ঘামানোর সময় নেই। দরকার চিরকালই থাকবে। দরকার নামক দৈত্যটা যেন আমাদের গ্রাস করে না ফেলে।

এর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী? ফেসবুক, ইন্টারনেটে সময় একটু কমিয়ে মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। গুগলসের ম্যাপে সন্তানদের পৈতৃক ভিটা না দেখিয়ে সরেজমিনে সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তবেই তৈরি হবে মমত্ববোধ, তৈরি হবে সৌহার্দ্য, যা এখন আমাদের জন্য বেশি প্রয়োজন। নইলে আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে ধরে রাখতে পারব না। চিরতরে হারিয়ে যাবে আমাদের ঐতিহ্য। হারিয়ে যাবে সংস্কৃতি। চেনা মানুষ হবে যাবে অচেনা। সেটা কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়, এমনকি নিজের জন্যও নয়।

 

লেখক : প্রবীণ নাট্যকার


মন্তব্য