kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শুভবোধ ও চেতনার জাগরণ ঘটাবে ক্রীড়াঙ্গন

ইকরামউজ্জমান

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শুভবোধ ও চেতনার জাগরণ ঘটাবে ক্রীড়াঙ্গন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদের উত্থান ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলছে—এটা চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি আর অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে। সন্ত্রাসী তত্পরতা নিয়ে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন, পাশাপাশি ইতিবাচক দিক হলো, এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চারও।

সন্ত্রাস বা জঙ্গি কর্মকাণ্ড দমন করতে যেসব প্রক্রিয়ার দরকার, সেটা এখন সর্বত্রই আলোচিত হচ্ছে। জঙ্গিবাদের উত্পত্তির কারণ, এর ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করার প্রশ্নে দেশের মানুষ রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে সবাই সম্মিলিতভাবে সংঘবদ্ধ। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এর জন্য সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ ও সংগঠন কাজ করছে।

বাংলাদেশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে। বিভ্রান্ত তরুণ ও যুবকদের কিভাবে সুপথে ফেরানো যায় সেই উদ্যোগ নিয়ে ভাবা হচ্ছে। সমস্যার সমাধান রাতারাতি হবে না। সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বাস্তবতার আলোকে বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নিতে হবে।

কেন তরুণ ও যুবকরা সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকেছে, এর পেছনে অবশ্যই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ আছে। বলা যায়, মূলত বিভিন্ন ধরনের হতাশা থেকেই তারা এদিকে যাচ্ছে। ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সমাজ উন্নয়নের কর্মীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে কেন তরুণ ও যুবকরা সন্ত্রাসী তত্পরতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে! সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ইতিহাসচর্চার অনুপস্থিতি। শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে বৈষম্য, দুর্বলতা ও বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি। অভিভাবকদের ভূমিকা ও তাঁদের দায়দায়িত্ব। বলা হয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে। কিভাবে বাড়ানো সম্ভব সেটাও বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা।

সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ক্রীড়া ও ক্রীড়াঙ্গনের ভূমিকা কারো অজানা নয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলার নিয়মিত চর্চাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ক্রীড়াচর্চা সুস্থ জীবনবোধের জন্ম দেয়। ক্রীড়ার নির্মল বিনোদনের মধ্যে আছে আত্মবিশ্বাস, একে অপরকে জানা, কাছে টানা, সহমর্মিতা ও ঐক্যবদ্ধতা। তরুণ ও যুবকদের নৈতিক উন্নয়ন, তাদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং দেশপ্রেমের স্ফুরণ ঘটাতে ক্রীড়াচর্চার ভূমিকা অপরিসীম। ক্রীড়াই পারে দেশের উদ্যমী ও তারুণ্যদীপ্ত যুবশক্তিকে একত্র করার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও সুশৃঙ্খল জাতি গঠন করতে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের উত্থান ও সন্ত্রাসের যে ভয়াবহতা বিরাজ করছে, এর গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসার স্বীকৃত স্থান হলো ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রীড়াচর্চা। মনে করি, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এখন সময়ের দাবি কিশোর, তরুণ ও যুবকদের খেলাধুলায় অনুপ্রাণিত করা। এদের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি আকৃষ্ট করা।

বলা হচ্ছে, কিশোর, তরুণ ও যুবকরা ভীষণভাবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ধরনের ভিডিও গেমসের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে নিঃসঙ্গতা ও হতাশা। অবসরে বালক, কিশোর, তরুণ ও যুবকদের এ ছাড়া করার কী আছে? তারা তো চাইলেও পারছে না খেলার চর্চায় অংশ নিয়ে নির্মল বিনোদনের খোরাক জোটাতে! খেলার মাঠ কোথায়, কোথায় ব্যায়ামাগার? ফাঁকা জায়গা কোথায় (যখন লিখছি কানে ভেসে এলো উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের খেলার মাঠে মাসব্যাপী আকর্ষণীয় মেলা)। যেখানে বিকেলে বিভিন্ন খেলা খেলতে পারবে। প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে হাই স্কুল ও কলেজের মাঠ দখল করে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান সব সময় চলে। পার্কের মধ্যে যাত্রার পালা হয়। খেলা বন্ধ করে স্টেডিয়ামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, গরু-ছাগলের হাট বসে—এর কোনো প্রতিকার নেই। কেউ কেউ বলেন, একটা বড় অংশের মধ্যে বিরাজ করছে ক্রীড়াবিমুখতা! কেন এই ক্রীড়াবিমুখতা—এর কারণ জানার চেষ্টা নেই। দেশজুড়ে শিক্ষাঙ্গনের ক্রীড়াঙ্গনে বিরাজ (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ) করছে একটা সংকুচিত ভাব! আগে উৎসাহের সঙ্গে যতটুকু খেলার চর্চা ছিল এখন তা আর নেই। অপ্রিয় শোনালেও এটা সত্য।

৪৫ বছর ধরে যদি শিক্ষাঙ্গনের ক্রীড়াঙ্গন এবং বৃহত্তর সমাজের ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, সঠিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো, তাহলে এখনকার দুঃখজনক পরিস্থিতির এত ভয়াবহ চিত্র দেখতে হতো না!

এখনো সময় আছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করা হোক। দেশজুড়ে খেলাধুলার বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা হোক, যে পরিবেশে আকৃষ্ট হয়ে ক্রীড়াঙ্গনে ছুটে আসবে কিশোর, তরুণ ও যুবকরা। তারা তখন অনেক কিছুই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ক্রীড়াঙ্গন ও খেলার চর্চার প্রতি আকৃষ্ট হবে।

সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে পুরো বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে দেশ ও জাতির স্বার্থে। বুঝতে হবে সুস্থ ক্রীড়াঙ্গনের কোনো বিকল্প নেই। ক্রীড়া, শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে সম্মিলিতভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে লক্ষ্য স্থির করে কাজ করতে হবে। আর তা হলেই সম্ভব হবে তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে শুভবোধ ও চেতনার জাগরণ ঘটানো।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


মন্তব্য