kalerkantho


কার আত্মহত্যা সাথীর না শিক্ষাব্যবস্থার?

ইসহাক খান

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কার আত্মহত্যা সাথীর না শিক্ষাব্যবস্থার?

চীন দেশে একজন মহান মানুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নাম মাও সে তুং।

কলেজে পড়ার সময় তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি। তাঁর কিছু লেখাও পড়েছি সে সময়। এখন আবার বলা হচ্ছে, চীনা ভাষায় তাঁর নামের উচ্চারণ হবে মাও জে দং। নামের হেরফেরে মানুষটি কিন্তু বদলে যাচ্ছে না। তিনি সেই মানুষটি রয়ে গেছেন। তিনি একটি কথা বলেছিলেন, খুবই মূল্যবান কথা। মনীষীরা তাঁর সেই কথা নানা জায়গায় উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করেন। আমিও তাঁর বাণীটি ধার করে লেখাটি শুরু করছি। তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা। আবার কোনো কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী। ’

তেমনি একটি মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে আমার বুকে চেপে বসেছে। ভুলতে পারছি না এই মৃত্যুর কথা। ভুল বলেছি, মৃত্যু নয় আত্মহত্যা। সম্প্রতি অষ্টম শ্রেণির একটি ছাত্রী পরীক্ষার ফি এবং বেতন পুরোপুরি শোধ করতে না পারায় স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক তাকে শাস্তি হিসেবে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখলে সাথী নামের মেয়েটি অপমানে, অভিমানে, লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

খবরের কাগজে খবরটি পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। এ আমরা কোথায় বাস করছি? এই কী আমাদের প্রিয় সোনার বাংলা। সরকার প্রতিবছর বিনা মূল্যে কোটি কোটি টাকার বই বিতরণ করে। অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তির কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা যখন হাই স্কুলের ছাত্র ছিলাম, তখন দেখেছি ছাত্রদের বেতনেই শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো। সরকার থেকে আর কোনো সুবিধা শিক্ষকরা পেতেন না। এখন তো তাঁরা বেতনের পুরো টাকা সরকার থেকে পান। তার পরও সামান্য কিছু টাকার জন্য শত শত ছাত্রছাত্রীর সামনে শাস্তি দেওয়া অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ, অমানবিক এবং মর্মভেদী। যা সাথী মেনে নিতে পারেনি। এই অপরাধে শাস্তি দেওয়া মানে তাদের দারিদ্র্য নিয়ে পরিহাস করা। সবাই সব কিছু মানতে পারে না। সাথীও এই অপমান মেনে নিতে পারেনি। আমি সাথীকে কোনোভাবেই দায়ী করছি না। আবার আত্মহত্যাই সব সমস্যার সমাধান তাও বলতে চাচ্ছি না। সাথী আত্মহননের মাধ্যমে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে জাতি হিসেবে আমরা কতটা পশ্চাৎপদ। কতটা নির্মম।

ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদি ইউনিয়নের মধ্য বাগাদি গ্রামে। সেই গ্রামের দিনমজুর দেলোয়ার হোসেন শেখের তিন কন্যার মধ্যে মেজো কন্যা সাথী। মাত্র ৮০ টাকার জন্য ওই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন স্যার সাথীসহ কয়েকজন দরিদ্র ছাত্রীকে শাস্তি হিসেবে শত শত ছাত্রছাত্রীর সামনে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে মনে করিয়ে দিয়েছে, তোরা ফকির। তোদের জন্য শিক্ষা নয়। কথাটা মুখে বলেননি স্যার। কিন্তু তাঁর এই অমানবিক কাজটি মূলত এই অর্থই বহন করে। অন্য সবার থেকে সাথী হয়তো একটু আলাদা। তাদের এই দারিদ্র্য নিয়ে শিক্ষকের নির্মম পরিহাস সে সহ্য করতে পারেনি। সবাই সব কিছু পারে না। এই অপমানও সহ্য করতে পারেনি অভিমানী মেয়েটি। দুই হাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে কতটা ভঙ্গুর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কতটা নির্মম আমাদের সমাজ। একজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীর পিতৃতুল্য। তাঁর কাছে সব শিক্ষার্থী সমান। সন্তানের মতো। তিনি কী করে এমন নির্দয়, নির্মম, অমানবিক হতে পারলেন?

আমি নিজের জীবনে এমন বিপর্যয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। তখন আমি কলেজে পড়ি। আমি ছিলাম সচ্ছল পরিবারের সন্তান। হঠাৎ করে আমাদের পরিবারে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। আমার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সামনে পরীক্ষা। আমি ফরম ফিলাপের টাকা জোগাড় করতে পারছিলাম না। আমি সারাক্ষণ মন মরা থাকতাম। কোনো কিছু আমার ভালো লাগত না। ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকতাম। আবদুল মান্নান নামে আমাদের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। তিনি সবে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে কলেজে জয়েন করেছেন। তিনি আমাকে পছন্দ করতেন। একদিন আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে তোমার? সব সময় দেখি তুমি বিষণ্ন মুখে বসে থাকো। স্যারের কথায় আমি নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম। বললাম, ‘স্যার, আমার আর লেখাপড়া করা হবে না। ’

‘কেন?’

আমি সংক্ষেপে আমাদের পরিবারের বিপর্যের কথা বললাম। তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন। জানতে চাইলেন, ফরম ফিলাপের লাস্ট ডেট কবে? আমি বললাম, ‘স্যার আজই লাস্ট ডেট। ’

তিনি কালবিলম্ব না করে পকেট থেকে টাকা বের করে আমাকে নিয়ে অফিসে গেলেন। তিনি নিজের হাতে আমার ফরম ফিলাপ করে দিয়ে বললেন, ‘এবার বাড়ি যাও। মন দিয়ে পড়বে। আমি তোমাকে অনেক ওপরে দেখতে চাই। ’ স্যার, আমি কত ওপরে উঠেছি আমি জানি না। সেদিন যে আপনি আমার ওপরে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন তা আমি কখনো ভুলিনি, ভুলব না।

আলাউদ্দিন স্যার আপনি শিক্ষক নামের অযোগ্য। সোজা কথায় শিক্ষক নামের কলঙ্ক। আপনি গোটা শিক্ষকসমাজকে কলঙ্কিত করেছেন। কাগজে দেখেছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আপনাকে গ্রেপ্তার করেছে। বিচারে আপনাকে শতবার ফাঁসি দিলেও সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না, যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। তার পরও দৃষ্টান্ত সৃষ্টির জন্য আপনার এই অপকর্মের বিচার হওয়া দরকার।

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার 


মন্তব্য