kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাফল্য

মিল্টন বিশ্বাস

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাফল্য

ইতিহাসের কলঙ্ক মুক্তিতে আরো একটি সাফল্য এলো। ন্যায্য বিচার পাওয়ার সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।

যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খারিজ করে দিয়েছেন। কাসেম হলেন ষষ্ঠ যুদ্ধাপরাধী, যাঁর সর্বোচ্চ সাজার রায় কার্যকরের পর্যায়ে এসেছে। এই ব্যক্তি হলেন জামায়াতের পঞ্চম শীর্ষ নেতা, বিচারের শেষ ধাপেও যাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হলো। প্রকৃতপক্ষে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ বাংলাদেশ ও বিশ্বের কাছে একটি আস্থার সংস্থায় পরিণত হয়েছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষী হাজির করা এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রায় প্রদান ও সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে মামলা পরিচালনায় নির্ভীক থাকায় ট্রাইব্যুনালের সব সদস্য প্রশংসা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে রায় কার্যকর করার সময় শেখ হাসিনা সরকারকেও বিভিন্ন চাপ সামলাতে হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দেয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ১৮ নভেম্বর তাদের ফাঁসির রায় ঠেকাতে পাকিস্তানকে সরব হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল পাকিস্তান জামাত-ই-ইসলামের আমির সিরাজুল হক। অন্যদিকে পৃথিবীর ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিরাও অপরাধীদের পক্ষাবলম্বন করেন। ভয়ভীতি, চাপ উত্তীর্ণ হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের রায় ঘোষণা এবং রায় কার্যকর করার সাফল্যে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে উদ্ভাসিত নক্ষত্র।

জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের পর মীর কাসেম ছিলেন আলবদর বাহিনীর তৃতীয় প্রধান ব্যক্তি। তাঁর জোগানো অর্থেই স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে শক্ত ভিত্তি। দেড় বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুই অভিযোগে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড এবং আট অভিযোগে সব মিলিয়ে ৭২ বছরের কারাদণ্ড হয়।  

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান। একাত্তরে তাঁর নির্দেশেই চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিসসংলগ্ন এলাকায় হিন্দু মালিকানাধীন মহামায়া ভবন দখল করে নাম দেওয়া হয় ডালিম হোটেল। সেখানে গড়ে তোলা হয় বদর বাহিনী চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঘাঁটি এবং বন্দিশিবির। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়, যাদের লাশ পরে ফেলে দেওয়া হতো চাক্তাই চামড়ার গুদামসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে। পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান জামায়াতকে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংঘ নাম বদলে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু করলে মীর কাসেম তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। ১৯৮০ সালে মীর কাসেম সরাসরি জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দেন। দলে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ১৯৮৫ সালে হন জামায়াতের শুরা সদস্য। ২০১২ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত মীর কাসেম দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনেরও চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০১০ সালের ২৯ জুন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে গ্রেপ্তার করার মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে’র কাজ শুরু হয়। একই দিন যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর সাকা চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২৩ সেপ্টেম্বর একই অভিযোগে সুবহানকে আটক করা হয়।

২০১৩ সাল ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে গতিশীল কার্যক্রমের বছর। এ বছর ২১ জানুয়ারি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর পলাতক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন একই আদালত। যদিও পরে আপিলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি একই দলের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। অবশ্য পরে আপিলে এই অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ৯ মে জামায়াতে ইসলামীর অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। ১ অক্টোবর একই অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। অন্যদিকে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ টি এম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির রায় ঘোষিত হয়। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুস সুবহানকে ফাঁসির আদেশ দেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই দিন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। ২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলবদর কমান্ডার জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক। এটি গঠন করা হয়েছে বৈশ্বিক আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত রোম স্ট্যাটিউটের কাঠামো অনুসারে। ফলে এই বিচারপ্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ। যে কেউ গিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। উপরন্তু বিশ্বে বাংলাদেশের এই ট্রাইব্যুনালই একমাত্র যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল, যেখানে বিবাদীরা বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারে।

‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ নিজেদের মর্যাদার ব্যাপারেও সতর্ক। ২০১৪ সালের ২ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় আদালত অবমাননার দায়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে জরিমানা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সাজা হিসেবে রায় ঘোষণার দিন তাঁকে ট্রাইব্যুনালে পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অবশ্য ২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি আদালত অবমাননার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বার্গম্যানের বিষয়ে বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ১৪ জন তাঁদের বিবৃতির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’কে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে রাত-দিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। সেখানে তাঁদের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না। বরং তাঁদের সাফল্যে আজ আমরা গৌরবান্বিত।   

লেখক : অধ্যাপক  এবং পরিচালক, জনসংযোগ

তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

writermiltonbiswas@gmail.com

 


মন্তব্য