kalerkantho


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

সোজা পথে চলা বড় কষ্টকর উল্টো পথে তাড়াতাড়ি পৌঁছা যায়

ড. সা’দত হুসাইন

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সোজা পথে চলা বড় কষ্টকর উল্টো পথে তাড়াতাড়ি পৌঁছা যায়

সন্ধ্যায় মতিঝিল অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলার প্রাথমিক ধকল সামলে যখন কাকরাইল মসজিদের সামনে গাড়ি থামল তখন আহরাজ চৌধুরীর বুঝতে বাকি থাকল না যে আজ শেরাটন ক্রস করা একটা প্রাণান্তকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। প্রায় প্রতিদিনই তাকে এ অভিজ্ঞতার শিকার হতে হচ্ছে। কাকরাইল মসজিদের মোড় থেকে শেরাটন পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। গাড়ি একটু চলে, তারপর আবার ১৫-২০ মিনিট থেমে থাকে। গাড়ি কখন চলবে আর কত সময় পর শেরাটন পার হওয়া যাবে—এ ব্যাপারে কিছুই বলা যাবে না। অসহ্য এ অপেক্ষা, মাঝেমধ্যে মনে হয় মাঝরাতের আগে বোধ হয় বারিধারা ডিওএইচএসের বাসায় পৌঁছানো যাবে না। এ জায়গাটায় কেন এতক্ষণ বসে থাকতে হয় তার কারণ আজ পর্যন্ত বোধগম্য হয়নি। সন্ধ্যার পর সেক্রেটারিয়েট, মতিঝিল থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমের লোকজন বাড়ি ফেরে। এটি তখন ঢাকা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। বিশেষ ব্যবস্থায় শেরাটন থেকে উত্তর দিকে যান-প্রবাহ নির্বিঘ্ন রাখা দরকার। তাহলে হয়তো ও অচল দুর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। একদিকে বিরক্তিতৃষ্ণায় আহরাজ চৌধুরী অস্থির, অন্যদিকে সমস্যা সমাধানের নানা চিন্তা তার মাথায় কিলবিল করছে।

এ সময় সে দেখতে পেল একটি পতাকা লাগানো সুন্দর জিপ গাড়ি তার পেছন দিক থেকে উল্টো রাস্তায় ঢুকে যাচ্ছে। সে রাস্তা তখন খালি। জিপ গাড়ির পেছনে পুলিশের গাড়ি ছাড়াও আরো দু-তিনটি গাড়ি রয়েছে। এগুলো হয়তো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্টাফ বা মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের গাড়ি। সে গাড়িগুলোও মন্ত্রীর গাড়ির পেছনে উল্টো পথে ঢোকার চেষ্টা করছে। আহরাজ চৌধুরী মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে গাড়ির বহরে তার গাড়িও ঢুকিয়ে দেবে। যেই চিন্তা, সেই কাজ। তার গাড়িটিও এ বহরে ঢুকে উল্টো পথে চলতে লাগল। মহা আরামে দ্রুতগতিতে গাড়ি এগিয়ে চলল। অন্যপাশে ট্রাফিক জ্যামে আটকাপড়া যাত্রীরা কোনো ধরনের প্রতিবাদী আওয়াজ তুলল না। বরং তারা সপ্রশংস দৃষ্টিতে মন্ত্রীর গাড়িবহরের দিকে তাকিয়ে রইল। এ সুযোগে বীরের মতো আহরাজ চৌধুরী শেরাটনের মোড় পেরিয়ে সোজা পরিবাগের কাছে এয়ারপোর্ট রোডে এসে পড়ল। এরপর মন্ত্রীর গাড়িবহরকে আর অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়েনি। ট্রাফিক জ্যাম থাকলেও তা দুর্বিষহ নয়। ধীরগতিতে হলেও এয়ারপোর্ট রোড ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল। বাসায় পৌঁছতে হয়তো আরো ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে।

বেশ কিছু অস্বচ্ছ চিন্তা আহরাজ চৌধুরীকে পেয়ে বসল। মন্ত্রীদের গাড়ির বহরে মিশে নির্বিঘ্নে অতি অল্প সময়ে শেরাটন পার হয়ে সে যে শারীরিক আরাম পেয়েছে ও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ব্যাপারটি কত দূর নৈতিক হয়েছে সে ব্যাপারে তার সন্দেহ রয়েছে। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা লোকদের এই এক অসুবিধা। বাস্তব জীবনে এসে বৈষয়িক সুবিধা হাতছাড়া করতে মন চায় না, আবার সুবিধা পাওয়ার পর নৈতিকতা-অনৈতিকতার প্রশ্ন তুলে নিজেকে ভারাক্রান্ত করতে বারবার ইচ্ছা জাগে। আহরাজের মনও এখন আনন্দ-বিষাদে ভারাক্রান্ত। তার চিন্তা হচ্ছে, মন্ত্রীর গাড়িবহরের সঙ্গে সে না হয় অল্প সময়ে এই ঝামেলাজনক পথটি পার হয়ে গেল। কিন্তু পেছনে বসে থাকা শত শত গাড়ির যাত্রীদের কী হবে? কত ঘণ্টা পরে তারা শেরাটন পার হবে? তাদের কী দোষ? তারা কেন রাস্তায় বেরিয়ে এত কষ্ট পাবে? এই পুরো পথে তো কোনো রিকশা নেই, ঠেলাগাড়ি নেই, ভ্যান নেই; তবু কেন গাড়ি আটকে থাকে? টেলিভিশনের টক শোতে এক পদস্থ কর্মকর্তাকে বলতে শুনেছে যে রিকশা তুলে দিলে আধাঘণ্টার মধ্যে যানজট নিরসন করা সম্ভব হবে। তা হলে কাকরাইল-বাংলামোটর রাস্তার যানজট কেন তিনি নিরসন করতে পারছেন না?

আহরাজ বুঝতে পারে, এখানে কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকার প্রয়োজন নেই। কথার জন্যই কথা বলতে হয়। কথা হচ্ছে সামনে বসা ও আশপাশের মানুষকে চমক লাগানোর জন্য। আরো কিছু বলা হয় তাৎক্ষণিক ঝামেলা এড়ানোর লক্ষ্যে। সে কথাগুলোর বেশির ভাগ মিথ্যা, আপাতত কাজ চলে যায়। এ নিয়ে জনগণ যে খুব একটা উচ্চবাচ্য করে তা নয়। মানুষ বোধ হয় ধরেই নেয় যে সব কথা সত্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটু বানিয়ে, একটু বিকৃত করে বর্ণনা দেওয়া বুদ্ধির পরিচয় বহন করে। এটা মেনে নিতে সে রাজি নয়। ছোটবেলায় পড়েছে সদা সত্য কথা বলবে। মা-বাবা, শিক্ষক-গুরুজন তাই শিখিয়েছেন। সে নিজেও বিশ্বাস করে যে সত্যের একটা বিশাল শক্তি আছে, সত্য বলার মধ্যে এক ধরনের অনাবিল আনন্দ আছে। সব সময় মিথ্যা বলার প্রয়োজনও নেই। অতি প্রয়োজন, যেমন জীবন বাঁচানো, জাতীয় বা সাংগঠনিক স্বার্থ সুরক্ষণের প্রয়োজন ছাড়া সে মিথ্যা কথা বলে না। সোজাসাপটা উত্তর দেয়, এতে লাভ কিছুটা কম হলেও দুঃখ নেই। তার আশঙ্কা যে এ অভ্যাসের ফলে বৈষয়িক উন্নতির ক্ষেত্রে সে কিছুটা পিছিয়ে পড়বে।

এখনো পর্যন্ত সে স্পষ্টভাবে কোনো দুর্নীতিমূলক কাজ করেনি। কোনো দুই নম্বরী কাজও সে করেনি। তবে হালকা অনিয়ম বা সোয়া নম্বরী কাজ দু-এক সময় করেছে। যেমন—বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় লাইন টপকে সামনে দাঁড়িয়েছে, পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যে অফিসের বড় কর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে, অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেশ সমীহ করে তার কাজগুলো করে দিয়েছে, সে তাদের সৌজন্যমূলক সহযোগিতা সানন্দে গ্রহণ করেছে। কোনো কোনো সময়ে নিচের দিকের কর্মচারীদের আশাতুর চাহনি তার মনে করুণার উদ্রেক করায় সে তাদের সামান্য সাহায্য করেছে। তার সংগঠনের কাজে কয়েকবার সে বিভিন্ন জেলায় সফরে গিয়েছিল। সে সময় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সৌজন্যের নামে তার সাময়িক আবাসন ও চলাফেরার ব্যাপারে কিছুটা সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল। এই সৌজন্যতা সম্পূর্ণরূপে নিয়মানুগ হয়েছিল কি না সেই পরিবেশে তা পর্যালোচনা করার অবকাশ ছিল না। এ ধরনের ছোটখাটো অনিয়ম মেনে নিয়ে সে পথ চলেছে। মাঝেমধ্যে এ জন্য তার অস্বস্তি হলেও এসব অনিয়ম বর্জন করবে—এ রকম প্রতিজ্ঞা এখনো পর্যন্ত করেনি।

ছোটখাটো দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আহরাজ মোটামুটিভাবে নীতিনিষ্ঠ থাকতে সচেষ্ট ছিল। অর্থনৈতিকভাবে সে পরিবারের সমর্থন পেয়েছে। থাকা-খাওয়ার চিন্তা করতে হয় না। নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। সরকারের উচ্চপর্যায়ে সীমিত হলেও যোগাযোগ সুবিধা রয়েছে, যদিও অত্যাবশ্যকীয় না হলে কখনো সে এ সুবিধা ব্যবহার করে না। নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা, শ্রম ও উদ্যোগের ওপর নির্ভর করতে পছন্দ করে। তার আশপাশের লোক ও পরিচিত লোকজন সেভাবে কাজ করে না। তারা সুযোগের সন্ধানে থাকে কখন কিভাবে নিয়ম ভেঙে চোরাপথে পেছনের দরজা দিয়ে কাজ সারা যায়। এ জন্য তারা ছোটখাটো জালজালিয়াতির আশ্রয় নিতে পিছপা হয় না। সাধারণত তারা তালাফি-তদবির, তাঁবেদারি-মোসাহেবিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। নৈতিক-অনৈতিক বিভিন্ন পন্থায় তারা ক্ষমতাধরদের কাছে যেতে চেষ্টা করে, সফল হলে ক্ষমতাধরদের আশপাশে ঘুরঘুর করে সময় কাটায়। এতে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। এ দেশে ‘পায়ে ধরা পাওয়ার’ বলে একটি কথা আছে। সে পাওয়ার বা ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন থেকে নানা ধরনের বৈষয়িক সুবিধা আদায় করে নেয়। নিজ পছন্দের ভালো পদ-পদবি দখল করে নেয়, নিজ সংগঠনের অনুকূলে, সুযোগ পেলে নিজের অনুকূলে সম্পদ বরাদ্দের ব্যবস্থা করে। প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে নিজের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।

এই তো জয়েন উদ্দিনের কথা ধরা যাক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে তাকে বরাবর পিছনের বেঞ্চেই দেখা গেছে। মফস্বলের এক কলেজ থেকে পাস করে প্রথমে ইসলামের ইতিহাসে ভর্তি হয়েছিল। তারপর একে-ওকে ধরে বিভাগ বদলি করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্থান করে নিয়েছিল। পড়াশোনায় ভালো ছিল না। নেতা গোছের ছাত্রও নয়। তবে বড় বড় ছাত্রনেতা আর ভালো ছাত্রদের আশপাশে সব সময় ঘুরঘুর করত। সুযোগ পেলেই গেঁয়ো ভাষায় অশুদ্ধ উচ্চারণে বড় নেতা ও ভালো ছাত্রদের সম্পর্কে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে নানা গল্প করত। কলেজজীবনের বন্ধুরা বলে সে নাকি শুদ্ধ কথা বলার প্রয়াসে হোটেলকে ‘ফোটেল’ ও হ্যারিকেনকে ‘স্যারিকেন’ বলত। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও সে রিকশাকে রিশকা, বিছানাকে বিচানা ও ছাত্রীদেরকে ছেমরি বলত। সমস্যাকে এখনো সে ‘গেদারিং’ বলে এবং বেসরকারি ব্যক্তিকে ‘পাবলিক পারসন’ বলে। এই জয়েনউদ্দিন তালাফি-তদবির, তাঁবেদারি-মোসাহেবি ও দেড় নম্বরী কাজের মাধ্যমে কামাই-রুজি ভালোই করেছে। এখন সে অনেক সম্পদের মালিক। লালমাটিয়ায় ফ্ল্যাট কিনেছে, নিজের গাড়ি রয়েছে, মাঝারি সাইজের নিজস্ব অফিস রয়েছে; ভালো পরিবারে বিএ পাস মেয়ে বিয়ে করেছে, ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমের দামি স্কুলে পড়াশোনা করে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর এখানে সেখানে অল্প বেতনে চাকরি করে স্বভাবজাত উদ্যোগে মুরব্বি ধরে ফেলেছে। তাদের ওপর ভর করে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করে। তারপর সোয়া নম্বরী, দেড় নম্বরী ও দুই নম্বরী ব্যবসা-বাণিজ্য করে টাকা বানিয়েছে। দু-একবার অসুবিধায় পড়লেও পিছপা হয়নি। মুরব্বিরা তাকে রক্ষা করেছে। অর্থবিত্ত ব্যবহার করে, হাতে-পায়ে ধরে মুরব্বিদের সে খুশি রেখেছে। এখনো রাখছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরই মধ্যে সে কোনো এক অখ্যাত উৎস থেকে পিএইচডির সার্টিফিকেট জোগাড় করেছে। এখন সে নামের আগে ডক্টর (ড.) লেখে। বন্ধুরা বলে, সে এখনো দুই বাক্য বাংলা বা ইংরেজিতে শুদ্ধ করে লিখতে পারে না। তবে চালিয়ে যাচ্ছে।

আহরাজের বন্ধুরা প্রায় সবাই ভালো ছাত্র। তাদের পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো। দুজন বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি পেয়েছে। কয়েকজন বিসিএস দিয়ে সরকারি ক্যাডারে যোগ দিয়েছে। অনেকেই ব্যাংকে, বহুজাতিক কম্পানি কিংবা দেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। দু-একজন পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে, মুরব্বিদের তত্ত্বাবধানে ব্যবসা চালাচ্ছে। নিজের উদ্যোগে নিজস্ব বাণিজ্যিক সংগঠন গড়ে তুলেছে এমন বন্ধুর সংখ্যা খুবই নগণ্য। হাতে গোনা তিন-চারজন মাত্র। এ কজনই আহরাজের কাছের মানুষ। নিজেদের মধ্যে তারা আলাপ-আলোচনা করে, বুদ্ধি-পরামর্শ করে। দেশ উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে আসর গুলজার করে এবং ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে কর্তৃপক্ষের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে। সব বন্ধু অনেক খাটাখাটনি করে, দিনরাত পড়াশোনা করে চাকরি পেয়েছে অথবা টাকা উপার্জন করছে। এক কথায় তারা কষ্ট করছে এবং সীমিত আয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় পাসের পর দুই বন্ধুর কাছে পিএসসির এক সদস্যের ড্রাইভার এসে ঘুষের প্রস্তাব দিয়েছিল। গ্যারান্টি দিয়ে বলেছিল তাদের অ্যাডমিন ক্যাডার নিয়ে দেবে। প্রস্তাব শুনে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল যে পিএসসির মতো সাংবিধানিক সংগঠনে কী করে ঘুষের বিনিময়ে চাকরি হয়! তাও আবার সদস্যের ড্রাইভারের মাধ্যমে! প্রস্তাবে তারা রাজি হয়নি। ফল হলো একজন পরীক্ষায় ফেল করেছে, আর একজন ফ্যামিলি প্ল্যানিং ক্যাডারে চাকরি পেয়েছে। তাদের ভাগ্য ভালো। অল্প দিনের মধ্যে পুরো কমিশন প্রায় সম্পূর্ণ রূপে নতুনভাবে গঠন করা হয়। তারা পরের বছর আবার পরীক্ষা দেয় এবং কোনো রকম তালাফি-তদবির-অনৈতিক প্রস্তাবের নামগন্ধ ছাড়াই একজন অ্যাডমিন ক্যাডারে ও অন্যজন অর্থনৈতিক ক্যাডারে চাকরি পেয়ে যায়। এখনো তারা সততার সঙ্গে চাকরি করছে। সৎপথে সোজা রাস্তায় চলা তো সহজ ব্যাপার নয়। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের সব আবদার রক্ষা করতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আহরাজ ও তার বন্ধুরা জেনেছিল, Property is theft. বাক্যটির মর্মকথা বুঝতে তাদের কষ্ট হচ্ছিল। নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে তারা অনেক আলাপ-আলোচনা করেছে। এখন তারা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে, এ দেশে হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা সবার জানা থাকলেও দুর্বৃত্তরা বহাল তবিয়তে লুট করা সম্পদ ভোগ করে চলছে। শেষ পর্যন্ত তাদের কিছু হবে বলে মনে হয় না। যারা সরল পথে চলতে চেয়েছে তারাই বরং কষ্ট পেয়েছে। সরল পথে দূরত্ব কম, তবে বন্ধুর এ পথ পেরোতে অনেক বেশি সময় লাগে।

এসব ভাবনায় মশগুল থেকে আহরাজ যখন তার বাড়ির কাছে এলো তখন দেখতে পেল রোড ডিভাইডারের কাটা অংশটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দড়ি-চোঙায় পেঁচিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। তাকে আরো অন্তত আধা কিলোমিটার ঘুরে ইউটার্ন নিয়ে আসতে হবে। খবরের কাগজের একটি হেডিং আহরাজের মনে পড়ে গেল : ‘দড়ি-চোঙায় পেঁচানো পথ, কেমনে যাবে আমার রথ’! আহরাজের গাড়ি ততক্ষণে ইউটার্ন নেওয়ার জন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। হিসাব করে দেখল মন্ত্রীর গাড়ির বদৌলতে আজ সে প্রায় এক ঘণ্টা আগেই বাসায় পৌঁছে যাবে।

 

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও

পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

 


মন্তব্য